লোক চিত্রকর একজন স্বশিক্ষিত শিল্পী যে চল্লিশ বছর ধরে নেপালের নিজস্ব শিল্পধারা পাউভার অনুশীলন করছেন। এক শিল্পীপরিবার থেকে বেড়ে ওঠা চিত্রকর গত ১২ বছর ধরে টোকিওর কানজৌউন মিউজিয়ামে কাজ করে আসছেন। আর নেপালে গিয়ে সেখানকার আরেক লোক চিত্রশিল্পী মিথিলা আর্ট গ্যালারির স্বত্বাধিকারী শ্যাম সুন্দর যাদবের সুবাদে ললিতপুরে লোক চিত্রকরের স্টুডিওতে যাবার সৌভাগ্য হয়।
পাউভার শিল্প হচ্ছে নেপালের একটি ঐতিহ্যবাহী ধর্মীয় চিত্র। যা তিব্বতি সমতুল্য থংকা নামে পরিচিত। বেশিরভাগ পাউভায় চিত্রকর্মে বৌদ্ধধর্মের দেখা গেলেও, তবে তাতে হিন্দু থিমও রয়েছে। মুলত পাউভা পেইন্টিং নেপালের কাঠমান্ডু উপত্যকার আদিবাসী নেওয়ারি সম্প্রদায়ের সমৃদ্ধ প্রাচীন সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের প্রতিনিধিত্ব করে। পাউভা শিল্প হিন্দু ও বৌদ্ধ দর্শনের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা এক প্রাচীন শিল্প। হিন্দু ও বৌদ্ধ ঐতিহ্যতে পাউভার চিত্রশিল্প হিন্দু ও বৌদ্ধ দেবদেবীর মূর্তি হিসেবে একই পবিত্র স্থান রাখা হয়, ভক্তদের উপাসনার জন্য। আর তাই নেপালের জনগণের কাছে পাউভা চিত্রকলা একটি পবিত্র শিল্প বলে সমাদৃত এবং যে ব্যক্তিকে চিত্রিত করা হয় তাকে আধ্যাত্মিক ব্যক্তি বলে মনে করা হয়। এটি একটি বস্তুগত বিষয় হলেও, আধ্যাত্মিকতায় পরিপূর্ণ। নেওয়ারির অনন্য ঐতিহ্য পাউভা চিত্রশিল্প কাঠমান্ডু উপত্যকা নামে তিনটি গতিশীল শহর পাটান, ভক্তপুর ও কাঠমান্ডু শতাব্দীর প্রাচীন সংস্কৃতির অংশ হিসেবে গড়ে উঠেছিল। শিল্প ইতিহাসবিদগণের গবেষণায় সপ্তম শতাব্দীতেও পাউভা পরিচিত শিল্প।
চল্লিশ বছর ধরে এই পাউভা শিল্পচর্চা করে আসছেন নেপালের বিখ্যাত চিত্রাচার্য লোক চিত্রকর। পরিবার ও সম্প্রদায়ের প্রভাবে লোক চিত্রকর, স্বশিক্ষিত শিল্পী। তার শিল্পচর্চা ভক্তিমূলক শিল্পী রূপে পরিবেষ্টিত। যা নতুন চীনা শৈলী থেকে আলাদা করা যায়। ২০০০ সালে এক জাপানি শিল্পক্রেতার জন্য লোক চিত্রকর একটি মন্দিরে কাজ করেছিলেন, এবং এটি সম্পূর্ণ করার জন্য জাপানি কৌশল শিখতে হয়েছিল তাকে। চিত্রকর ব্যবহূত রং, পাথর এবং নীলমতো উদ্ভিদের সঙ্গে মিশিয়ে নিজস্ব রং তৈরি করেন, যাতে কখনো কখনো রৌপ্য এবং স্বর্ণধুলো মিশ্রিত থাকে। প্রদর্শনীর জন্য ফ্রেম তৈরি করা হয় ভিন্ন কায়দায়। একটা বোর্ডে আটকানো শিল্পকর্মটি শেষ করার পর এর চতুর্প্রান্তে সেলাই করা হয়। আজ এসব পেইন্টিং সারা বিশ্বে বিখ্যাত।
পাউভার উত্থানের কথা বলতে গিয়ে চিত্রকর বলেন, ‘পাউভা চিত্রগুলো যা আমরা এখন দেখতে পাচ্ছি তা বিভিন্ন সংশোধন ও সংস্কারের মধ্য দিয়ে এসেছে। প্রাচীন সংস্কৃতির মূল ভিত্তি থাকার কারণে এটি তিব্বত যাওয়ার পথে চলে গেছে এবং তিব্বতের মঠগুলোতে পাউভা পেইন্টিংয়ের প্রমাণ আমরা এখনো দেখতে পাচ্ছি। এখানে যে চিত্রগুলো আমরা দেখি তাও তিব্বতের শৈলী থেকে বেশ প্রভাবিত।’
লোক চিত্রকর চার দশকেরও বেশি সময় ধরে শিল্পচর্চা করে আসছেন। এখনো আন্তর্জাতিক বিভিন্ন প্রদর্শনীতে অংশ নিয়ে থাকেন। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় বা জাপানের শিকাগো শহরে ঐতিহাসিক মিউজিয়ামে তার ছবি স্থান পেয়েছে। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে নেপালের আসল বৌদ্ধ শিল্পের প্রতিনিধিত্বের বিষয়ে গর্বিত কি না প্রশ্ন করলে বলেন, ‘আমি এই শিল্পের একজন শিল্পী হতে পেরে গর্বিত।’
তার বিখ্যাত পাউভার চিত্রকর্ম জাপান, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ফিনল্যান্ড, জার্মানি, ডেনমার্ক, কানাডা, সাউথ কোরিয়া, ইংল্যান্ড, ভারত, সিঙ্গাপুর, সুইজারল্যান্ড, রাশিয়া, চীন এবং সম্প্রতি সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় থেকে জাতীয় প্রতিভা পুরস্কার প্রদান করেছে। তিনি নেপাল অ্যাকাডেমি অব ফাইন আর্টস-এর সদস্য। এছাড়া কাঠমান্ডু বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্ট ও ডিজাইনের বিভাগে ভিজিটিং ফ্যাকাল্টি এবং ফিনল্যান্ডের ওরিভেসি ইনস্টিটিউটের প্রশিক্ষক। এ পর্যন্ত তিনি নেপাল ছাড়াও ভারত, আমেরিকা, যুক্তরাজ্য, জাপান, ডেনমার্ক, কানাডা, নেদারল্যান্ডস, ফ্রান্স, কেনিয়া, সুইজারল্যান্ড, ইতালি, রাশিয়া, মিশর, কোরিয়াতে তার কাজ প্রদর্শন করেছেন।
