বঙ্গবন্ধু আমাদের মুক্তির দিশারি, স্বাধীনতার বাতিঘর। দু’শো বছরের ইংরেজ শাসনে আমরা ছিলাম নির্যাতিত। ১৯৪৭ সালের আগস্ট মাসে ইংরেজ পালালেও নতুন বর্গি হিসেবে আমাদের নির্যাতন শুরু করে পাকিস্তানিরা।
ইংরেজরা চলে যাওয়ার পর ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট যে এলাকা দুটিতে মুসলমানরা বেশি সেই এলাকা দুটি ভিন্ন দেশ না হয়ে পাকিস্তান নামে একটি দেশ এবং ১৫ আগস্ট বাকি অঞ্চলকে ভারত নামে একটি দেশে ভাগ করে দেওয়া হলো। পাকিস্তানের আবার দুটি অংশ। একটি পূর্ব পাকিস্তান অপরটি পশ্চিম পাকিস্তান। এই দুই অংশের মাঝখানের দূরত্ব প্রায় দুই হাজার কিলোমিটার। আর এই দুই হাজার কিলোমিটারে রয়েছে যে দেশটি তার নামই ভারত। আমরা ছিলাম পূর্ব পাকিস্তানে, যারা আমাদের নির্যাতন করত তারা ছিল পশ্চিম পাকিস্তানে। তারা কিছুতেই চায়নি আমরা আলাদা একটি স্বাধীন রাষ্ট্রে পরিণত হই। আমাদের আলাদা একটি আকাশ থাকবে, সেখানে আমরা নানা রংয়ের ঘুড়ি ওড়াবো, আমাদের একটি আলাদা নদী থাকবে, সেখানে আমরা ইচ্ছেমতো সাঁতার কাটব, আমাদের একটি নিজস্ব বাগান থাকবে, সেখানে আমরা লাল-নীল-হলুদ-সাদা ফুল ফোটাব, আমাদের একটি মাঠ থাকবে, সে মাঠে আমরা গোল্লাছুট খেলব, হা-ডু-ডু খেলব, দাড়িয়াবান্ধা খেলব। জোছনা রাতে আমাদের নিজস্ব আকাশ থেকে চাঁদের আলো গড়িয়ে পড়বে, আমরা কাজলা দিদির কথা মনে করব।—আমাদের এতকিছু চাওয়াতে তারা বাধা দিতে শুরু করল।
তারা চায়নি আমরা কোনোদিন মাথা উঁচু করে দাঁড়াই। দেশভাগের সময় পশ্চিম পাকিস্তানের জনসংখ্যা ছিল দুই কোটি, পূর্ব পাকিস্তানের জনসংখ্যা ছিল চার কোটি। অঙ্কের হিসেবে সবকিছুতেই আমাদের থাকবে ওদের চেয়ে দ্বিগুণ—এটাই তো স্বাভাবিক। ফুল ফুটলে ওরা নেবে একটি, আমরা নেব দুটি, আমাদের খেলার মাঠ থাকবে দুটি, ওদের থাকবে একটি। কিন্তু কিছুতেই এটা মানছিল না তারা।
এই যে পরাধীনতা! এই পরাধীনতার শৃঙ্খল থেকে মুক্তি দিতে বঙ্গবন্ধু এসেছিলেন আমাদের বাতিঘর হিসেবে। একটি স্বাধীন সার্বভৌম দেশের স্বপ্ন দেখতেন তিনি। সেই দেশটির জন্য আজীবন সংগ্রাম করেছেন। বেঁচেছেন ৫৫ বছর ৫ মাস, জেল খেটেছেন প্রায় ১৪ বছর। ভয়কে উপেক্ষা করে লক্ষ্যে অবিচল থেকেছেন। মানুষের অধিকার আদায়ে তিনি ছিলেন সদাসচেষ্ট। যেখানে অন্যায় দেখতেন সেখানেই তাঁর প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর প্রতিধ্বনিত হতো। মানুষের স্বাধীনতায় বিশ্বাসী একজন অসাম্প্রদায়িক মানুষ।
তাঁর স্বপ্নের দেশটির রাষ্ট্রভাষা বাংলা, সেই ভাষার সংগ্রামেও অবদান অনেক তাঁর। সেই ভাষার দাবির আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়ার জন্যও তাঁকে বন্দি করে রেখেছিল পশ্চিম পাকিস্তানের স্বৈরাচার সরকার।
তাঁর ২৬ শে মার্চের স্বাধীনতার ঘোষণা বাঙালিকে মুক্তিসংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়ার প্রেরণা জুগিয়েছিল। ওইদিনই তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়, পরে পাকিস্তানের কারাগারে বন্দি ছিলেন। পাকিস্তানিরা ভেবেছিল শেখ মুজিবকে বন্দি করলেই বুঝি সংগ্রামে ভাটা পড়বে। কিন্তু হিতে বিপরীত হয়েছিল। মুক্ত মুজিবের চেয়ে বন্দি মুজিব কতটা শক্তিশালী সেটা হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছিল পাকিস্তানি শাসক। কারণ তিনি কারাগারে বন্দি থাকলেও তাঁর মুখনিঃসৃত অমোঘ বাণী বাংলার আকাশ-বাতাসে ছড়িয়ে পড়েছিল। দীর্ঘ নয় মাস সেই অমোঘ বাণী মাথায় রেখে ঘর-সংসার, পরিবার-পরিজনের মায়া ছেড়ে যুদ্ধ করেছেন এদেশের বীর সন্তানেরা।
একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র উপহার দিলেন বাঙালি জাতিকে। শতাব্দী পরপর এরকম একজন রূপকথার রাজার জন্ম হয় বলেই পৃথিবীতে নির্যাতিত নিপীড়িত মানুষ মুক্তির স্বাদ পায়। একটা সময় ছিল যখন মায়েরা তাদের শিশুদের ঘুমপাড়ানোর জন্য রূপকথার রাজা-রানির গল্প শোনাতেন। রূপকথার সেই গল্প শুনে শিশুরা ঘুমিয়ে পড়ত। আর আমাদের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের গল্প শুনে শিশুরা নিজেদের ভেতর সাহস আর অনুপ্রেরণা পায়। নিজের অধিকারের ব্যাপারে সচেতন হতে শেখে। মানুষকে ভালোবাসতে শেখে। দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়।
হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে স্মরণে রেখেই আমাদের বাংলাদেশের ভবিষ্যত্ প্রজন্ম এগিয়ে যাবে। তাঁর চেতনাকে বাস্তবে রূপায়িত করলেই সোনার বাংলায় কৃষকের মুখে হাসি ফুটবে। কৃষকের মুখে হাসি থাকলেই ফসলে ভরে উঠবে খেত। দেশে থাকবে না কোনো অভাব। অর্থনীতির চাকা সচল থাকবে। তাঁর চেতনাকে বুকে লালন করলেই সমাজে শ্রেণিবৈষম্য থাকবে না। থাকবে না সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প।
বঙ্গবন্ধুর আদর্শ মনে রেখেই আমাদের প্রত্যেকটি ভোর হোক সুন্দর। সূর্যের আলোয় ভরে যাক আমাদের চারপাশ। শিশুর মুখে ফুটুক হাসি। আর আমরা গেয়ে উঠব—আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি।
