শরদিন্দু ভট্টাচার্য্য টুটুল
বাঙালি নব উদ্দীপনায় উজ্জীবিত হয়ে মুজিববর্ষ উদযাপনের জন্য প্রস্তুত হচ্ছে। ঘরে ঘরে এখন একটাই কলরব—বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবর্ষ উদ্যাপনের মাধ্যমে বাঙালি নতুন করে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় আগামী দিনের যাত্রা শুরু করবে। সেই যাত্রায় নতুন প্রজন্মের প্রগতিশীল যাত্রীরা বঙ্গবন্ধুকে নতুন করে আবিষ্কার করবে। বাঙালির চেতনায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান শুধু একটি নামই নয়—তিনি হলেন সেই বটবৃক্ষের ছায়া, যার ছায়ায় গ্রাম-গঞ্জের সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে সকল শ্রেণি-পেশার মানুষ আশ্রয় নিয়ে শান্তি লাভ করে। বটবৃক্ষ যতই পুরোনো হয়, ততই তার পত্রপল্লব সবুজের সমারোহে ঝিলমিল করে ওঠে। বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে অনেক কিছু বলা যায়। কবি শামসুর রাহমানের কবিতার লাইন ধার করে বলি, বঙ্গবন্ধু হলেন বয়সী বটের ঝিলমিলি পাতা।
এদেশের সাধারণ মানুষ আজো নীরবে নিরালায় বঙ্গবন্ধুর কথা ভেবে চোখের জল বিসর্জন করে থাকে। সচেতন মানুষ মনে করে বঙ্গবন্ধু যদি আজকের দিন পর্যন্ত বেঁচে থাকতেন, তাহলে যারা অন্ধকারে লুকিয়ে থেকে সাধারণ মানুষের প্রাপ্তিটুকু কেড়ে নিতে চায়, তারা কখনো সাহস পেত না বাঙালির মহাকাব্যিক মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় আঘাত হানতে।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টে শুধু বঙ্গবন্ধুকেই পরিবারসহ হত্যা করা হয়নি। সেইদিন হত্যা করা হয়েছিল আমাদের মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জন করা সকল আদর্শকে। আঘাত হানা হয়েছিল আমাদের চেতনায়, আমাদের চিন্তায়, আমাদের সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার শুভ্র বাস্তব কল্পনায়। এদেশের মুক্তিপাগল মানুষ হারিয়েছিল সকল গণতান্ত্রিক অধিকার। দেশের জন্য যারা যুদ্ধ করেছিল, সেইসব বীর মুক্তিযোদ্ধার জীবন দুর্বিষহ করে তোলা হয়। বাঙালি জাতীয়তাবাদের চেতনায় শাণিত হয়ে এ দেশের মানুষ প্রতিক্রিয়াশীলদের এসব কার্যকলাপ মেনে নেয়নি। তার প্রমাণ বঙ্গবন্ধু-কন্যা শেখ হাসিনা যেদিন দেশে আসেন, সেদিন এদেশের সাধারণ মানুষ সকল বাধা-বিপত্তি অতিক্রম করে তাঁকে এক নজর দেখার জন্য উপস্থিত হয়েছিল। মানুষের বাধভাঙা জাগরণ দেখে সেদিন প্রতিক্রিয়াশীলরা ঠিকই বুঝেছিল, জীবিত মুজিব থেকে মৃত মুজিব অনেক শক্তিশালী।
বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার অনেক দেরিতে হলেও বাঙালি তা করেছে। অনেক আসামির সাজা কার্যকর হয়েছে। অনেক অপরাধী দেশের বাইরে লুকিয়ে আছে। সরকার আপ্রাণ চেষ্টা করছে দেশের বাইরে লুকিয়ে থাকা বঙ্গবন্ধুর সাজাপ্রাপ্ত খুনিদের দেশে ফিরিয়ে এনে সাজা কার্যকর করতে। আজ দেশের সর্বত্র একটা কথাই আলোচিত হচ্ছে, বঙ্গবন্ধুর হত্যার পিছনে যারা ছিল, যারা কখনো সামনে আসেনি কিংবা যারা পর্দার আড়ালে থেকে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার নীল নকশার পথ মসৃণ করেছিল, তাদের কি বিচার হবে না? তাদের মুখোশ কি দেশের মানুষের সামনে উন্মোচিত হবে না? আজ দেশের মাঠে-ঘাটে গ্রাম-গঞ্জের বাজারে চা স্টলে, কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের বারান্দায়, দেশের মানুষের সুস্থ আড্ডায় একটি কথাই উচ্চারিত হচ্ছে— ষড়যন্ত্রকারীদের বিচার হোক। যদি পর্দার অন্তরালে থাকা বঙ্গবন্ধু হত্যার ষড়যন্ত্রকারীদের বিচার না করা হয়, তাহলে বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার অসম্পূর্ণ থেকে যাবে।
হবিগঞ্জ
