এক যুগের হাসি

আপডেট : ১৪ মার্চ ২০২০, ১৮:৩৭

রম্য গল্প

/ অয়েজুল হক

 

ফরিদ সাহেব পেপার হাতে ‘কক কক’ করছেন। এটা তার হাসি। প্রায় এক যুগ ধরে বেচারা অনেকটা মুরগির মতো ‘কক কক’ শব্দ করে হাসছেন। সেই বারো বছর আগে ঠাট্টায় কেউ একজন লিখেছিল,

চেহারা তার ঝকমক

হাসির শব্দ কক কক।

সেই থেকে তিনি ‘কক কক’ শব্দ করে হাসেন। ফরিদ সাহেবের স্ত্রী সালমা বেশ কয়েকবার কারণ জানতে চেয়েও সদুত্তর পাননি। ফরিদ সাহেব শুধু ‘কক কক’ করে হেসেছেন। কাজের মেয়ে বানু একদিন ঝাড়ু নিয়ে দৌড়ে রুমে এসে বলে, ‘মুরগি ঘরে ঢুকলো কীভাবে? মুরগি কই?’

ফরিদ সাহেব বানুর দিকে তাকিয়ে হাসেন, ‘কক কক’।

ফরিদ সাহেবকে দেখে মেয়েটা লজ্জায় নতুন বউয়ের মতো জড়োসড়ো হয়ে বিদায় নেয়। বানুর বিয়ে হয়েছে আরো ছয় বছর আগে। বানুর বিয়ের পর নতুন কাজের মেয়ে হিসাবে যোগদান করেছে তার বোন ঝানু। এ বাড়িতে কাজ করলে একটা সুবিধা—ভালো ছেলে দেখে বিয়ে দিয়ে দেওয়া হয়। সম্ভবত সে আশায় বানুর বিয়ের পর তার বাবা মা ঝানুকে কাজের মেয়ে হিসেবে এ বাড়িতে রেখে গেছেন। ভালো ঘরে বিয়ে হবে, খাওয়া পরার কষ্ট থাকবে না।

প্রথম দিন কাজে এসেই ঝানু কিছুটা অবাক হয়ে ছুটে যায় সালমা বেগমের কাছে। বলে, আচ্ছা মুরগির মতো ‘কক কক’ করছেন ওই লোকটা কে?

‘তোমার আঙ্কেল।’

‘ও, আঙ্কেল। তা কক কক করছেন কেন?’

‘কক কক করছেন না, হাসছেন।’

‘এটা আবার কেমন হাসি?’

‘কক কক হাসি। ক’দিন পর হবে হক হক হাসি। তারপর বক বক হাসি।’

এতো বছরেও ফরিদ সাহেবের হাসির পরিবর্তন হয়নি।

আর কতো? সালমা বেগম আর সহ্য করতে পারেন না। গত বছর ডেঙ্গু সারাদেশে ছড়িয়েছিল। বছরের শুরু থেকে টুকটাক বৃষ্টি হচ্ছে। লার্ভা থেকে বেরিয়ে আসতে পারে এডিস মশা। আরেক দিকে করোনা ভাইরাস নিয়ে বিরাট দুশ্চিন্তা। দুই ছেলে আমেরিকা। চীনের পর ইরান, ইতালি, আমেরিকায় করোনা মহামারী। বাংলাদেশ যে বাদ পড়ছে তাও নয়। কিছুটা বাতাস এসেছে। সন্তানের চিন্তা, নিজের চিন্তা। কিছুটা রাগের সাথে স্বামীর দিকে ধেয়ে যান—দেশে করোনা ভাইরাস। সে খবর রাখো?

‘রাখি তো। মানুষের কোয়ারেন্টাইন, আইসুলেশন হচ্ছে। মেডিকেল মাস্ক সহ সকল প্রকার মাস্ক সাত গুন দামে বিক্রি হচ্ছে। হ্যান্ড ওয়াশ থেকে শুরু করে বেড়েছে সকল জীবাণুনাশকের দাম। মনে হচ্ছে রীতিমতো উত্সব। ব্যবসায়ী ভাইয়েরা এ দিনের অপেক্ষায় ছিল। তাদের চোখে মুখে টিপটাপ ঝিলিক বাতি... কক কক।’

‘তুমি কী মানুষ?’

‘মানুষ তো বটেই, অতি উচ্চ মর্গের মানুষ বলতে পারো।’

সালমা বেগমের চোখে মুখে বিতৃষ্ণা প্রকাশ পায়। ‘আর তোমার সাথে থাকতে ইচ্ছা করছে না।’

‘থাকবে না তো। সিদ্ধান্ত ফাইনাল?’

‘মানে!’

‘সেটা আপাতত বলা যাবে না।’

মহূর্তে সালমা বেগম ভোল পাল্টিয়ে বলেন, ‘এই বয়সে নতুন করে সংসার করার স্বপ্ন! আজ ঝেটিয়ে তোমার ভাড়ামি ছোটাব। বুড়ো ভাম...’

‘ঘটনা তা নয়। আমি আসলে ঠাট্টার এক যুগ পূর্তিতে অফিসে যাব। বি.স.’র সঙ্গে কোলাকুলি করে হাসির নতুন স্টাইল নিয়ে আসব।

‘যেখানেই যাও, তোমার সঙ্গে আমার ভাই যাবে। পুরুষ মানুষ বিশ্বাস নাই।’

 

ফরিদ সাহেবের একমাত্র শ্যালক মিতুল। বয়সে তার চেয়ে বেশ ছোটো। তরুণ বলা যায়। নির্ধারিত সময়ে যাত্রা শুরু। রেল স্টেশনে গিয়ে ফরিদ সাহেব বলেন, ‘ট্রেনে উঠার আগে কিছু ভারী খাবার খেতে হবে।’

‘খাবারের আবার ভারী হালকা আছে?’

‘আছে তো, এক প্যাকেট চিপস আর এক প্যাকেট বিরিয়ানি ওজন দিয়ে দেখ।’

মিতুল জবাব দেয় না। তার স্বভাবই এমন। খাবার হোটেলে ঢুকে বিরিয়ানির অর্ডার দেবে ঠিক সে সময় দেখা যায় বিরিয়ানির বড় পাতিলের উপর পুরানো ঠাট্টা সংখ্যা। কে জানে ঠাট্টার ভারী খাবার খাওয়া প্রয়োজন কি-না। ফরিদ সাহেবের ইদানীং আরেক স্বভাব হয়েছে। আগে ঠাট্টা পড়ে হাসতেন, এখন পড়ার আগেও হাসেন। ঠাট্টা চোখের সামনে পড়লেই হেসে ওঠেন। পাতিলের উপর ঠাট্টা দেখে হেসে ওঠেন, ‘কক কক।’

কক কক শব্দে ক্ষেপে ওঠেন হোটেল ম্যানেজার, ‘এই মিয়া মুরগির মতো কক কক করেন কেন?’

রেল স্টেশন, লঞ্চঘাট, বাসস্ট্যান্ডের হোটেল ম্যানেজাররা সম্ভবত একটু রাগী টাইপ হয়। এর একটা কারণ বের করেছেন ফরিদ সাহেব। তার গবেষণা— এসব জায়গার অধিকাংশ ক্রেতা ভিন্ন ভিন্ন অঞ্চলের। নিতান্ত জরুরি প্রয়োজনে মানুষ এসব দোকানে যায়। প্রয়োজনের তাগিদে ছুটেচলা ব্যস্ত মানুষ কড়া কথায় প্রতিবাদ করে না।

ফরিদ সাহেব গাল মুখ বড় করে আবার শব্দ করে হাসেন, ‘কক কক।’

দাঁত মুখ খিচিয়ে হোটেল ম্যানেজার বলেন, ‘খবরদার কক কক বন্ধ করেন! পোল্ট্রি আছে, কক নাই। দোকানের সামনে আরেকবার কক কক করলে একেবারে কক বানায়ে পাতিলে চড়ায় দেব।’

মিতুল হোটেল ম্যানেজারকে ঠান্ডা করে, ‘দেখুন তিনি ঠাট্টাভক্ত। ঠাট্টা পড়ে বারো বছর ধরে কক কক করে হাসছেন।’

হোটেল ম্যানেজার এন্টার্কটিকার বরফ গলার মতো গলেপড়া সুরে বলেন, ‘আমিও ঠাট্টাভক্ত। হাসতে হাসতে কেমনে বারো বছর গেলো টেরই পাইলাম না।’