১৯৭১ সালের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের মাধ্যমে জাতির পিতার হাত ধরে আমরা একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র পেয়েছি। শহীদদের আত্মত্যাগ যেন বৃথা না যায়—সেই লক্ষ্যে যুদ্ধ-বিধ্বস্ত এই দেশটিকে ‘সোনার বাংলা’য় রূপান্তরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আজীবন চেষ্টা করে গিয়েছেন। ’৭৫-এ ইতিহাসের জঘন্যতম হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে তাঁর এই প্রচেষ্টাকে স্বাধীনতাবিরোধী গোষ্ঠী রুখে দিয়েছিল। দীর্ঘ ২১ বছর দেশটি সামরিক-অসামরিক স্বৈরাচারী অপশাসনের হাতে নিষ্পেষিত হয়েছে। ১৯৮১ সালে দেশে আসার পর থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত সুদীর্ঘ পনের বছরের সংগ্রামের পর বঙ্গবন্ধু কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনা’র হাত ধরে গ্রিক পুরাণের ফিনিক্স পাখির মতো বাংলাদেশ আবারও পুনরুজ্জীবিত হয়েছিল।
১৯৯৬-২০০১ মেয়াদে আওয়ামী লীগের অর্জন
১৯৯৬ সালে রাষ্ট্র ক্ষমতায় আসে আওয়ামী লীগ। ’৭৫ সালে হোঁচট খাওয়ার পর আবারো বাংলাদেশের উন্নয়নের ইতিহাসে শুরু গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়ের। আওয়ামী লীগ সরকারের ১৯৯৬-২০০১ এর সময়কালে অনেক গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য অর্জিত হয়। তার মধ্যে ছিল অর্থনৈতিক অচলাবস্থা কাটিয়ে উঠা— বিশেষ করে কৃষিতে প্রবৃদ্ধি অর্জন, মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, স্বয়ম্ভর বিদ্যুত্ উত্পাদনকারীদের মাধ্যমে এই সেক্টরে ব্যক্তিখাতের বিনিয়োগ চালু করা এবং ১৯৯৮ সালে সাফল্যের সঙ্গে শতাব্দীর ভয়াবহতম বন্যা মোকাবিলা।
রাজনৈতিক ক্ষেত্রে ভারতের সঙ্গে গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তি, পার্বত্য চট্টগ্রামের শান্তি চুক্তি, ২১ ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের স্বীকৃতি, জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে নির্বাচন বিশ্ব আঙ্গিনায় বাংলাদেশকে মর্যাদা ও গুরুত্বের সঙ্গে নতুনভাবে উপস্থাপন করে। ১৯৯৮ সালে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ‘ইউনেস্কো পুরস্কার’-এ ভূষিত করা হয়। যেই হেনরি কিসিঞ্জার বাংলাদেশের স্বাধীনতাবিরোধী ভূমিকা গ্রহণ করেছিল, তিনিই পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ ও জননেত্রী শেখ হাসিনা’র সাফল্যের স্তুতি বর্ণনা করে বক্তব্য রেখেছিলেন।
২০০৮-এর দিন বদলের সংগ্রাম :সম্ভাবনার ভিত্তি স্থাপন
অভূতপূর্ব গণসমর্থন নিয়ে ২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ আবার দেশ পরিচালনার দায়িত্ব লাভ করে— চার দলীয় জোট সরকারের দুঃশাসনের অবসান হয়। শেখ হাসিনার সরকার বিগত দশটি বছরে অর্থনীতি ও উন্নয়ন, সমাজনীতি, সংস্কৃতি, আইন-শৃঙ্খলা, পররাষ্ট্রনীতিসহ প্রতিটি ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে ইতিহাসের সর্বোচ্চ পর্যায়ে নিয়ে এসেছে। এক্ষেত্রে ২০১৪ সালের নির্বাচনে পুনরায় বিজয় অর্জন ছিল বাংলাদেশের জন্য একটি মাহেন্দ্রক্ষণ। ২০০৯ সালে আমাদের মূল লক্ষ্য ছিল বিশ্বমন্দা পরিস্থিতি সঠিকভাবে মোকাবিলা করে প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা। মূল্যস্ফীতিকে সহনীয় পর্যায়ে রেখে সাধারণ মানুষকে স্বস্তি দেওয়া। বিদ্যুত্ ও জ্বালানি সংকট মোকাবিলা করে দেশে বিনিয়োগের সুষ্ঠু পরিবেশ সৃষ্টি করা। সর্বোপরি ‘রূপকল্প ২০২১’ অনুযায়ী ডিজিটাল বাংলাদেশ রূপায়ণের মাধ্যমে স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তীতে, অর্থাত্ ২০২১ সালের মধ্যে একটি সমৃদ্ধশালী মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত করা। আজ আমরা এ সকল উদ্দেশ্যই সফলতার সঙ্গে পূরণ করতে সক্ষম হয়েছি।
আমরা মানুষের ঘরে ঘরে বিদ্যুত্ পৌঁছে দিয়েছি। আট শতাংশের কাছাকাছি প্রবৃদ্ধি অর্জন করেও মূল্যস্ফীতিকে ৬ শতাংশের নিচে ধরে রেখেছি। গত দশ বছরে আমাদের অর্থনীতির গড় বার্ষিক প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৬.৭ শতাংশ হারে, সরকারি বিনিয়োগ জিডিপি’র ৫.৬ শতাংশ থেকে ৮.০ শতাংশে উন্নীত হয়েছে, বিদ্যুত্ উত্পাদন সক্ষমতা বেড়েছে সাড়ে ৩ গুণ, মাথাপিছু আয় বেড়েছে তিন গুণেরও বেশি, রাজস্ব-জিডিপি’র অনুপাত ৯.১ শতাংশ থেকে ১০.৮ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, আমদানি, রপ্তানি ও প্রবাস আয় বেড়েছে ৩ গুণ। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বেড়েছে ৯ গুণেরও বেশি। শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও স্যানিটেশন ব্যবস্থায় হয়েছে ব্যাপক উন্নয়ন। শিশুমৃত্যু ও মাতৃমৃত্যু উচ্চহারে কমেছে। প্রত্যাশিত গড় আয়ু ৬৬.৫ বছর থেকে বেড়ে হয়েছে ৭২.০ বছর। বিবিএস-এর সর্বশেষ প্রাক্কলন অনুযায়ী, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে দারিদ্র্যের হার ২০০৫ সালের ৪০.০ শতাংশ থেকে ২২.৮ শতাংশে এবং অতি-দারিদ্র্যের হার ২৫.১ শতাংশ থেকে ১১.৩ শতাংশে নেমে এসেছে। আর্থ-সামাজিক ক্ষেত্রে সকল পরিসংখ্যানই আমাদের সাফল্যের কথা বয়ান করে। প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার দূরদর্শী ও বিচক্ষণ Statemenship-এর কারণেই আজ আমরা সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার একটি সম্ভাবনাময় ভিত রচনা করতে পেরেছি।
বর্তমান বাংলাদেশের উন্নয়ন সম্পর্কে আন্তর্জাতিক মূল্যায়ন
গত দশটি বছর আমাদের উন্নয়ন অর্জন সারা বিশ্বে প্রশংসিত হয়েছে। পৃথিবীর অনেক আন্তর্জাতিক গবেষণা ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িত সংস্থা বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নকে বিস্ময়কর এবং অনুকরণীয় বলে স্বীকৃতি দিয়েছে। Citigroup-এর বিবেচনায় ২০১০ থেকে ২০৫০ সালের মধ্যবর্তী সময়ে বিশ্বে সম্ভাব্য প্রবৃদ্ধি সঞ্চালক “3G (Global Grotwh Generator) Countries” তালিকায় স্থান পেয়েছে বাংলাদেশ। Price Waterhouse Coopers (PwC)-এর ২০১৭-এর “The World in 2050” শীর্ষক প্রতিবেদনে বাংলাদেশ, ভারত ও ভিয়েতনামকে আগামী দিনে ২০৫০ সাল পর্যন্ত বিশ্বে সবচেয়ে দ্রুতগতির অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনকারী দেশ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। তাঁদের প্রতিবেদন অনুযায়ী বাংলাদেশ ২০৫০ সালের মধ্যেই পরিণত হবে পৃথিবীর ২৩তম বৃহত্তর অর্থনীতিতে এবং পেছনে ফেলবে মালয়েশিয়া ও অস্ট্রেলিয়াকে। যুক্তরাষ্ট্রের বিখ্যাত প্রতিষ্ঠান ব্লুমবার্গ-ও বিশ্ব অর্থনীতির গতি-প্রকৃতি বিশ্লেষণ করে বিভিন্ন দেশের প্রবৃদ্ধি অর্জনের হার নিয়ে তৈরি প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে, বাংলাদেশ হবে বিশ্বের দ্বিতীয় শীর্ষ প্রবৃদ্ধির দেশ। বিনিয়োগের আকর্ষণীয় গন্তব্য হিসেবে JP Morgan এর 'Frontier Five' তালিকায় স্থান পেয়েছে বাংলাদেশ। জাপান এক্সটার্নাল ট্রেড অরগানাইজেশনের (জেটরো) মতে, বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ জাপানিদের কাছে দ্বিতীয় পছন্দের তালিকায় রয়েছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) বলছে, ২০২১ সালের মধ্যে এটি ৩২ হাজার ২০০ কোটি ডলারের বাজারে পরিণত হবে। ২০১৭ সালে যুক্তরাজ্য ভিত্তিক Business Insider পত্রিকার নিবন্ধে সিংগাপুর, দক্ষিণ কোরিয়া, হংকং ও তাইওয়ানের পরে বাংলাদেশকে ভবিষ্যতের পঞ্চম এশিয়ান টাইগার হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। অতি সম্প্রতি অস্ট্রেলিয়ার একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠান Lowy Institute তাঁদের গবেষণায় এই বক্তব্যের সপক্ষে বলেছে যে, বাংলাদেশ ২০৩০ সালের মধ্যে তাইওয়ানকে ছাড়িয়ে যাবে।
যুক্তরাজ্যভিত্তিক বৈশ্বিক ব্র্যান্ড মূল্যায়নকারী প্রতিষ্ঠান ‘ব্র্যান্ড ফ্রিল্যান্স’ কর্তৃক প্রকাশিত “Nation Brands 2017” শীর্ষক প্রতিবেদন অনুযায়ী বাংলাদেশের অবস্থান ১০০টি দেশের মধ্যে ৩৯তম যা গত বছরও ছিল ৪৪তম। প্রথমবারের মতো ২০০৯-১০ অর্থবছরে Standard and Poor’s Ges Moody’s বাংলাদেশের ওপর সভরেন ক্রেডিট রেটিং প্রণয়ন করে। তাঁদের ২০১৭-এর একটি প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে যে, বাংলাদেশের ক্রেডিট রেটিং-এর পরিমাণ Ba3 stable। সম্প্রতি World Economic Forum (WEF) বিশ্বের ৭৪টি সম্ভাবনাময় অর্থনীতির উপর সমীক্ষা করে, যেখানে অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন বিষয়ক Inclusive Development Index অনুযায়ী পৃথিবীতে বাংলাদেশের অবস্থান ৩৪তম এবং ভারতের অবস্থান ৬২তম, পাকিস্তান ৪৭তম, শ্রীলঙ্কা ৪০তম এবং চীন ২৬তম। একই ফোরামে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় সক্ষমতা সূচকেও বাংলাদেশ ১৮০টি দেশের মধ্যে আগের বছরের চেয়ে ৭ ধাপ এগিয়ে ৯৯তম অবস্থানে এসেছে। তাছাড়া অর্থনৈতিক স্বাধীনতা সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান ১৮০টি দেশের মধ্যে আগের বছরের চেয়ে ৯ ধাপ এগিয়ে ১২৮তম অবস্থানে রয়েছে। বৈশ্বিক মানব উন্নয়ন সূচকে (HDI) ১৮৯টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১৩৬তম। লিঙ্গ সমতার দিক থেকে ১৪৪টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ৪৭তম এবং টানা তিন বছর দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর তালিকায় বাংলাদেশ শীর্ষে রয়েছে।
উপমহাদেশের নোবেলবিজয়ী বাঙালি অর্থনীতিবিদ ড. অমর্ত্য সেনও বাংলাদেশের সামাজিক ক্ষেত্রে, বিশেষত শিক্ষা ও স্বাস্থ্যক্ষেত্রের সফলতার বিষয়টি তাঁর বইসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরামে উল্লেখ করেছেন। বিশ্বব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ কৌশিক বসুর মতে, বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন উড়ন্ত সূচনার পর্যায়ে রয়েছে। তাঁর ভাষায় প্রবৃদ্ধি ‘তরতর’ করে বাড়ছে। তিনি আরও মন্তব্য করেছেন, ‘আজকের বাংলাদেশ পুরোটাই সাফল্যের গল্প, যা বিশ্বের অনেক দেশের জন্যই দৃষ্টান্ত’। জাতিসংঘ মহাসচিব বান কি মুন মন্তব্য করেছিলেন, “বাংলাদেশ পারে, বাংলাদেশ হচ্ছে অর্থনীতির এলাকায় একটি রোল মডেল।” বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট কিম ইয়ং জিমও বাংলাদেশের প্রশংসায় পিছিয়ে থাকেননি। ২০১৬ সালে বাংলাদেশ সফরে এসে বাংলাদেশ সম্পর্কে তিনি বলেছিলেন, “বাংলাদেশের অগ্রগতি সারা বিশ্বের জন্য অনুকরণীয়”। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক রাষ্ট্রপতি বারাক ওবামা ২০১৫ সালে কেনিয়া সফরে গিয়ে বাংলাদেশের আইসিটি খাতের ভূয়সী প্রশংসা করে বলেছিলেন, “সকল দেশের উচিত্ বাংলাদেশকে অনুসরণ করা, তারা কিভাবে উদ্যোক্তা তৈরি করছে তা শেখা উচিত্।”
বাংলাদেশকে নিয়ে সারা বিশ্বের আজকে যে উচ্ছ্বাস এবং বাংলাদেশের ভবিষ্যত্ সম্ভাবনা নিয়ে তাঁদের আগ্রহ প্রমাণ করে আমরা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রাজ্ঞ ও হিরন্ময় নেতৃত্বে বাংলাদেশকে কোথায় নিয়ে আসতে পেরেছি। বঙ্গবন্ধুর পরে দ্বিতীয় ব্যক্তি হিসেবে শেখ হাসিনা’র নামে সবাই বাংলাদেশকে চিনতে শুরু করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের টাইম করপোরেশনের বাণিজ্যবিষয়ক ম্যাগাজিন ফরচুনের ২০১৬ সালের মার্চের জরিপে বিশ্বের শীর্ষ নেতাদের তালিকায় দশম স্থানে রয়েছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। গত দশ বছরে তাঁর কাজের স্বীকৃতি স্বরূপ তিনি নিজে পুরস্কৃত হয়েছেন অসংখ্য ভূষণে। একই সঙ্গে বাংলাদেশের জন্যও বয়ে এনেছেন অনেক সম্মাননা।
রূপকল্প ২০২১-এর প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী
বাংলাদেশ এখন মধ্যম আয়ের দেশ
প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা ২০০৯ সালে দেশ পরিচালনার দায়িত্ব লাভের পর দেশবাসীর কাছে অঙ্গীকার করেছিলেন যে, ২০২১ সালে বাংলাদেশ মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হবে। ২০১৫ সালের জুলাই হতে বাংলাদেশ এখন বিশ্ব ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী নিম্ন আয়ের দেশ থেকে নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হয়েছে। অন্যদিকে, জাতিসংঘ গত মার্চ, ২০১৮-এ জানিয়েছে— আমরা তথাকথিত স্বল্পোন্নত দেশ বা এলডিসি থেকে বের হয়ে উন্নয়নশীল দেশে রূপান্তরিত হয়েছি। এ ক্ষেত্রে নির্ধারণী তিনটি সূচকেই বাংলাদেশ এখন স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা হতে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের জন্য যোগ্য। বিশ্বব্যাংক বা জাতিসংঘের হিসাবে মধ্যম আয়ের দেশ হিসেবে পৃথক কোনো শ্রেণি নেই। আমরা এখন নিম্ন-মধ্য আয়ের দেশ এবং একই সঙ্গে একটি উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃতি পেয়েছি। বাংলাদেশ এখন উন্নয়নশীল দেশ ভারত, চীন, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, ব্রাজিলের কাতারে অবস্থান করছে। ২০১০ সালেও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)-এর ওয়ার্ল্ড ইকনমিক আউটলুক অনুযায়ী বাংলাদেশের অর্থনীতির আকার ছিল বিশ্বে ৫৮তম। সে অবস্থান থেকে ১৫টি ধাপ এগিয়ে এখন বাংলাদেশের অবস্থান ৪৩তম। অন্যদিকে ক্রয়ক্ষমতা বিচারে ৩২তম বড় অর্থনীতির দেশ হিসেবে স্থান করে নিয়েছে। বাংলাদেশ গত আট বছরে অর্থনীতির আকারে ১৫টি দেশকে পেছনে ফেলেছে।
উন্নয়নের ধারাবাহিকতার আবশ্যকতা
বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ-এর নেতৃত্বে ১৯৯৬-২০০১ মেয়াদে বাংলাদেশ দীর্ঘ ২১ বছর পর প্রকৃত উন্নয়নের ছোঁয়া পেয়েছিল। বাংলাদেশ বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের ‘সোনার বাংলা’য় রূপান্তরিত হওয়ার পথে অনেকাংশে বঙ্গবন্ধুকন্যার হাত ধরে এগিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু দেশের জনগণকে বিভ্রান্ত করে এবং ২০০১ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সহযোগিতায় স্বাধীনতাবিরোধী ও নব্য জঙ্গিগোষ্ঠীর সঙ্গে মিলে বিএনপি’র নেতৃত্বে চার-দলীয় জোট ২০০১ থেকে ২০০৬ মেয়াদে দেশকে আবার উল্টো রথে পরিচালিত করে। যার ফলশ্রুতিতে ২০০৭ সালে অগণতান্ত্রিক সরকার গঠিত হয় ও দেশের অগ্রগতি প্রায় থেমে যায়। আওয়ামী লীগ সরকারের ধারাবাহিকতার অভাবে ২০০২ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত দেশ আবারও দুষ্টচক্রে পতিত হয় এবং ১৯৯৬ সালের সকল উন্নয়ন অর্জন ব্যর্থতার পথে ধাবিত হয়। ২০০৯ সাল থেকে গত দশ বছর প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা বাংলাদেশকে নিয়ে স্বপ্ন দেখতে শিখিয়েছেন। দেশের জনগণ এখন অনেক বড় স্বপ্ন দেখেন। শেখ হাসিনা’র নেতৃত্বে আগামী কয়েক বছরের মধ্যে পদ্মা সেতুসহ মেগা প্রকল্পগুলো বাস্তবায়িত হলে ১০ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি কোনো শক্তিই আটকাতে পারবে না। এখন দেশের অর্থনীতি শুধু সামনে যাবে, আর পেছনে যাবে না। সামনে যাওয়ার জন্য যত অবয়ব, যত কম্পোন্যান্ট শক্তিশালী করার কথা তা করা হয়েছে। অবকাঠামো যত প্রয়োজন তা নির্মাণ হচ্ছে। অবকাঠামোগুলো নির্মাণ কাজ শেষ হয়ে গেলেই বিদেশি বিনিয়োগ আসবে কল্পনাতীতভাবে। এ উন্নয়ন যজ্ঞ থেমে যাবে যদি দেশ আবার ভুল নেতৃত্বের হাতে পড়ে।
শেষ কথা
আমাদের এগিয়ে যাওয়ার মূলমন্ত্রণা সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান। আমাদের সকল কাজে তিনি অনুপ্রেরণার উত্স। তাঁর মূলমন্ত্রকে ধারণ করেই আওয়ামী লীগ সরকার বাংলাদেশকে আজ মধ্যম আয়ের উন্নয়নশীল দেশে পরিণত করেছে। আজ আমরা বড় অর্থনীতির কাতারে চলে এসেছি। বৈশ্বিক প্রতিকূল বিষয়সমূহ প্রশমনের মাধ্যমে পূর্বের যেকোনো সময়ের তুলনায় বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অবস্থান সুসংহত। সাত শতাংশের ওপর প্রবৃদ্ধি টেকসই করতে হলে বাংলাদেশ পরিচালনার ভার পুনরায় জননেত্রীর হাতে তুলে দিতে হবে। তিনিই পারবেন ২০৪১ সালে উন্নত বিশ্বের কাতারে সামিল হওয়ার জন্য বাংলাদেশকে সত্যিকারের একটি ভিত্তি গড়ে দিতে।
“সময় এখন আমাদের, সময় এখন বাংলাদেশের”—এই শ্লোগানকে সামনে রেখে দেশরত্ন শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ, বাংলাদেশের জনগণকে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের ‘সোনার বাংলা’ উপহার দেবে, ইনশাআল্লাহ।
n লেখক: এফসিএ, এমপি এবং মন্ত্রী, পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়
