বর্তমানে আমরা একাদশ সংসদ নির্বাচন করছি। অর্থাত্ এর আগে দেশে দশটি নির্বাচন হয়েছে। আমরা যদি বিগত দিনের নির্বাচনী সহিংসতার দিকে তাকাই, তাহলে দেখা যাবে, এবার নির্বাচনী সহিংসতা তুলনামূলকভাবে একেবারে কম। নির্বাচনের প্রায় ৪০ দিন অতিক্রম হয়েছে। এই কয়েক দিনে একেবারে মিনিমাম পর্যায়ে ভায়োলেন্স হয়েছে। এর পরিসংখ্যান ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের চেয়েও কম। পোস্টার না লাগাতে দেওয়া, প্রচারে বাধা দেওয়ার বিষয়গুলো এখন কমে আসছে। শুরুর দিকে খানিকটা উত্তেজনা বিরাজ করে, পরে কমে যায়। বর্তমানে বিজিবি টহল দিচ্ছে। সেনাবাহিনীও মাঠে নেমেছে, এতে পরিস্থিতি আরও স্বাভাবিক হবে। আমরা আশা করি, দেশে একটি সুষ্ঠু, সুন্দর এবং অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন হবে। এর মাধ্যমে আমরা একটি ভালো বিরোধী দল পাবো।
এবার নির্বাচনে দল বদলের বিষয়টিও লক্ষণীয়। রেজা কিবরিয়া প্রথমে গণফোরামে যোগদান করেন, পরে ধানের শীষ নিয়ে নির্বাচন করছেন। অনেকে দল ত্যাগ করে ধানের শীষ প্রতীক নিয়েছেন। কিন্তু জামায়াতের ২২ জন প্রার্থী দল ত্যাগ করেনি। তারা দলের বহাল পদবিতে এখনো রয়েছে। তাদের পোস্টারে জামায়াতের পদপদবি লেখা আছে। সারা পৃথিবীতে নির্বাচন হয় মূলত সরকার পরিবর্তনের জন্য। বিপ্লব বা এক্সট্রা জুডিশিয়াল, সামরিক উত্থানের মাধ্যমেও সরকার পরিবর্তন হয়। কিন্তু আমাদের দেশের অভিজ্ঞতা হচ্ছে, বিগত দিনে নির্বাচনের মাধ্যমে বা অন্য উপায়ে সরকার পরিবর্তন হয়নি, পরিবর্তন হয়েছে রাষ্ট্র। এইটি মূল শঙ্কার কারণ। আমাদের দেশে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট রাষ্ট্র পরিবর্তন করা হয়। বাংলাদেশকে ফের পাকিস্তানি ভাবধারায় নিয়ে যাওয়া হয়। ২০০১ সালের নির্বাচনের পর রাষ্ট্র নতুন আরেকটি চরিত্র পায়। আমরা যুদ্ধ করে স্বাধীন, সার্বভৌম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করি, কিন্তু তখন রাষ্ট্রের দর্শন ছিল ভিন্নতর। জামায়াত যুদ্ধাপরাধীদের মন্ত্রিত্ব দেওয়া হয়। দেশবিরোধীরা রাষ্ট্রের চরিত্র হরণ করে। প্রবীণ রাজনীতিবিদ তোফায়েল আহমেদ সাহেবরা সে সময়ে নানা নির্যাতনের শিকার হয়েছেন।
২০০১ সালের নির্বাচনের পর ভোলা জেলা থেকে প্রায় ২০ হাজার লোককে বের করে দেওয়া হয়েছিল। প্রায় চার থেকে পাঁচ বছর ওই সমস্ত মানুষ ভোলায় যেতে পারেননি। তাদেরকে পালতে হয়েছে তোফায়েল সাহেবকে। সে সময় যারা ভোলা কলেজে পড়ত, তাদেরকে ঢাকায় থাকতে হয়েছে। এইসব অভিজ্ঞতা আমাদের রয়েছে। পুরো দক্ষিণ অঞ্চল, সাতক্ষীরা বাগেরহাট থেকে শুরু করে সারাদেশে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর ব্যাপক হামলা হয়েছে। এ সংক্রান্ত দুই হাজার চারশ’ পঞ্চাশটি মামলা বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটি শনাক্ত করেছে। সত্য যে ঘটনাগুলো ঘটেছে। কিন্তু এই সব সমস্যা হতো না, যদি নির্বাচনের মাধ্যমে কেবল সরকার বদল হতো। সরকার বদল হওয়া মানে বিভিন্ন কর্মসূচির বদল হওয়া। সরকারের একেবারে ভালো কর্মসূচি যেমন-ড়্গ্রামের ক্লিনিক ব্যবস্থার মতো এমন অনেক কল্যাণময় বিষয়গুলোও বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার পরিবর্তন হলে কোনো সমস্যা ছিল না। কিন্তু রাষ্ট্র বদলে যায়, রাষ্ট্র চলে যায় পাকিস্তানি ভাবাদর্শে। এটাই আসলে আমাদের মূল সমস্যা।
বর্তমানে নির্বাচন কমিশনকে আরও কঠোর হতে হবে। তাদের কর্তৃত্ব আরও জোরদার করতে হবে। নির্বাচন কমিশনকে দৃঢ় ভাষায় আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে যথাযথভাবে দায়িত্ব পালন করার নির্দেশ দিতে হবে। কারণ নির্বাচন সুষ্ঠু রাখার দায়িত্ব আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর। তবে যারা নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন, তারা যদি মনে করেন, আমরা ভালোভাবে নির্বাচন করবো, সবাই কেন্দ্রে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করবে, তাহলে অবশ্যই নির্বাচন ভালো হবে।
n লেখক : উপাচার্য, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়
