করোনায় আতঙ্ক অনর্থক!

আপডেট : ১৫ মার্চ ২০২০, ২১:৪৯

শিফারুল শেখ

 

ফ্লু রোগে সবচেয়ে বেশি মৃত্যু ঘটে ১৯১৮ সালে। তখন এটিকে মহামারি হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছিল। ইনফ্লুয়েঞ্জায় (‘স্প্যানিশ ফ্লু’ নামেও পরিচিত) আক্রান্ত রোগীর ১০ ভাগ মারা গিয়েছিল। ধারণা, বিশ্বের এক-তৃতীয়াংশ মানুষ আক্রান্ত হয় এবং মারা যায় ৫ কোটি। তবে ইতিহাসবিদরা মনে করেন, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের শেষ দিকে আক্রমণ করায় বিস্তার বেশি হয়। আর এখন করোনা ভাইরাস নিয়ে বিশ্ব জুড়ে আতঙ্ক। গতকাল পর্যন্ত প্রায় দেড় লাখ মানুষ আক্রান্ত হয়েছে। মারা গেছে সাড়ে ৫ হাজারের বেশি। এতে বিশ্ব অর্থনীতিতে মন্দা দেখা যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। বিজ্ঞানী ও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটা অনর্থক। হার্ট অ্যাটাক, স্ট্রোক ও সড়ক দুর্ঘটনায় এর চেয়ে অনেক বেশি মানুষের মৃত্যু ঘটে। তাই এ নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ারও কিছু নেই।

অধিক মৃত্যুর যত কারণ : বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যমতে, প্রতি বছর সড়ক দুর্ঘটনায় ১৩ লাখের বেশি মানুষ মারা যায়। হার্ট অ্যাটাকে প্রতি বছর মৃত্যু হয় ১ কোটি ৭০ লাখের বেশি মানুষের। স্ট্রোকে প্রতি বছর আক্রান্ত হয় ১ কোটি ৫০ লাখ মানুষ। এর মধ্যে ৫০ লাখের মৃত্যু ঘটে এবং ৫০ লাখ কর্মশক্তি হারিয়ে ফেলে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ওয়েবসাইটে ২০১৮ সালের ২৪ মে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে জানানো হয়, ২০১৬ সালে বিশ্বে ৫৬ কোটি ৯০ লাখ মানুষ মারা যায়। এর ৫৪ ভাগের বেশি মানুষের মৃত্যু ১০টি রোগে। সবচেয়ে বেশি মারা গেছে হার্ট অ্যাটাক ও স্ট্রোকে। ঐ বছর দেড় কোটির বেশি মানুষ মারা যায় এই দুই রোগে। ক্রোনিক অবস্ট্রাকটিভ পালমানারি রোগে ২০১৬ সালে ৩০ লাখ মানুষের প্রাণ যায়।

ফুসফুসের ক্যানসারে (শ্বাসনালি ও ব্রোঙ্কাসসহ) ১৭ লাখ ও ডায়াবেটিসে মারা গেছে ১৬ লাখ। স্মৃতিভ্রংশ সংক্রান্ত রোগে ২০০০ থেকে ২০১৬ সালে মৃত্যুর হার দ্বিগুণেরও বেশি ছিল। নিম্ন শ্বাসযন্ত্রের সংক্রমণে ৩০ লাখ মানুষের মৃত্যু ঘটে। ডায়রিয়ায় এখনো ১৪ লাখ মানুষের মৃত্যু ঘটাচ্ছে। যক্ষ্মায় মৃত্যু কমেও মারা গেছে ১৩ লাখ। এইডস সবচেয়ে বেশি মৃত্যুর ১০ কারণের মধ্যে নেই। তারপরও ২০১৬ সালে এতে ১০ লাখ মানুষের প্রাণ যায়। ২০০০ সালে যায় ১৫ লাখ মানুষ। সড়ক দুর্ঘটনায় ২০১৬ সালে মারা গিয়েছিল ১৪ লাখ মানুষ। এর মধ্যে ৭৪ শতাংশই নারী ও শিশু। বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির তথ্যমতে, দেশে প্রতিদিন গড়ে ২১ জন মারা যায় সড়ক দুর্ঘটনায়।

রোগের ষড়যন্ত্র তত্ত্ব : ১৪ শতকে ইউরোপে প্লেগ রোগের জন্য ইহুদিদের দায়ী করে নির্যাতন শুরু হয়। জার্মান সেনাবাহিনী অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের জন্য এই জীবাণু আবিষ্কার করে। ১৯১৮ থেকে ১৯২০ সালে আনুমানিক আড়াই থেকে ৫ কোটি মানুষের প্রাণ যায়। ১৯৮০র দশকে যুক্তরাষ্ট্রে এইডস ছড়িয়ে পড়ে। ১৯৮৩ সালে গুজব ছড়াতে শুরু করে সোভিয়েত গোয়েন্দা বাহিনী কেজিবি। বলা হয়, ফোর্ট ড্রেট্রিক-এ জীবাণু অস্ত্র হিসেবে মার্কিনিরা এইচআইভি উদ্ভাবন করেছিল। নব্বইর দশকে আফ্রিকায় ছড়ানো ইবোলার জন্য ষড়যন্ত্র তাত্ত্বিকরা যুক্তরাষ্ট্র এবং ব্রিটেনই দায়ী করে।

২০১৯ সালে রিপাবলিকান কংগ্রেসম্যান ক্রিস স্মিথ দাবি করেন পেন্টাগন এঁটেল পোকাসহ বিভিন্ন কীটের মাধ্যমে জীবাণু অস্ত্র তৈরির প্রকল্প চালিয়েছে। স্মিথ এ নিয়ে বইও লিখেছেন। ডিজিটাল যুগে যে কোনো ভুল তথ্য আগের চেয়েও দ্রুত ছড়ায়। ষড়যন্ত্র তত্ত্বপ্রেমীদের দাবি, নোভেল করোনা ভাইরাস চীনের গবেষণাগারে কৃত্রিম উপায়ে তৈরি। আবার চীনের দাবি যুক্তরাষ্ট্রই জীবাণুটি তৈরি করে চীনে পাঠিয়েছে।

আতঙ্কিত না হওয়ার ১০ কারণ : আতঙ্কিত না হতে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামকে বলেছেন, স্পেনের নাভারা বিশ্ববিদ্যালয়ের অণুজীব বিজ্ঞানী ইগ্নাসিও লোপেজ গনি। ১. তিনি জানান, প্রথম এইডস রোগী ধরা পড়েছিল ১৯৮১ সালের জুনে। সেই রোগের কারণ যে এইচআইভি ভাইরাস সেটা বুঝতে দুই বছরের বেশি সময় লাগে। মানবদেহে করোনা ভাইরাস সংক্রমণের প্রথম ঘটনাটি ঘটে গত বছরের ৩১ ডিসেম্বর, চীনে। সংক্রমণের ১০ দিনের মাথায় ভাইরাসটির ধরন, উত্পত্তিসহ প্রায় সব তথ্য জানা সম্ভব হয়। ২. ১৩ জানুয়ারি থেকে ভাইরাসটি শনাক্তের জন্য প্রয়োজনীয় টেস্ট সহজলভ্য হয়। ৩. চীনে প্রতিদিনই নতুন সংক্রমণের হার কমছে। এর সংক্রমণের পরিধি সীমিত রাখা সহজ। ৪. আশি শতাংশ সংক্রমণই হালকা ধরনের। ৫. আক্রান্ত মানুষের মৃত্যুর চেয়ে ১৩ গুণ বেশি মানুষ সুস্থ হচ্ছে। আক্রান্ত এবং মৃতের সংখ্যার মধ্যকার আনুপাতিক হার ক্রমশ বাড়ছে। ৬. আক্রান্তদের মধ্যে মাত্র তিন শতাংশের বয়স ২০ বছরের নিচে। ৪০ বছরের নিচে বয়সিদের মধ্যে মৃত্যুর হার মাত্র শূন্য দশমিক দুই শতাংশ। ৭. অ্যালকোহলযুক্ত জীবাণুনাশক ব্যবহার করে মাত্র এক মিনিটেই সার্ফেসে থাকা করোনা ভাইরাস নিষ্ক্রিয় করা যায়। সাবান ও পানি ব্যবহার করে কিছুক্ষণ পরপর হাত ধুয়ে এ ভাইরাস থেকে অনেকটাই নিরাপদে থাকা যায়। ৮. বিজ্ঞানীরা এ ভাইরাস মোকাবিলায় অনেক বেশি তত্পর। ৯. ভ্যাকসিন তৈরির জন্য অন্তত আটটি প্রকল্প কাজ করছে। অস্ট্রেলিয়ার একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল গবেষক ভাইরাস প্রতিরোধে সক্ষম ভ্যাকসিনের প্রোটোটাইপও তৈরি করেছেন। শিগিগরই মানবদেহে পরীক্ষা করা হবে। ১০. করোনা ভাইরাসের চিকিত্সায় ব্যবহারের উপযোগী হতে পারে—এমন ৮০টির বেশি অ্যান্টিভাইরালের ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল চলছে।

মহাকাশ ভ্রমণ সংস্থা স্পেসএক্স ও তেসলা মোটরসের সিইও করোনা ভাইরাস বা কোভিড-১৯কে গুরুত্বই দেননি। তিনি তার কর্মচারীদের পাঠানো এক ই-মেইল বার্তায় বলেছেন, কোভিড-১৯ নিয়ে দুশ্চিন্তার কিছু নেই। কারণ এর চেয়ে অনেক বেশি মারা যায় সড়ক দুর্ঘটনায়। যদিও তার এই মত বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও মার্কিন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতামতের বিপরীত। ডাব্লিউএইচও এটাকে মহামারি হিসেবে ঘোষণা করেছে। আর মার্কিন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, এতে ১৬০ মিলিয়ন থেকে ২১৪ মিলিয়ন মানুষ আক্রান্ত হতে পারে। নিউ ইয়র্ক টাইমস জানিয়েছে, এতে ১৭ লাখ মানুষের মৃত্যু হতে পারে।