আরিফুলের শরীরে নির্মম নির্যাতনের ক্ষত

আপডেট : ১৫ মার্চ ২০২০, ২২:০৭

 ‘পুরো সন্ত্রাসী কায়দায় দরোজা ভেঙে বাসায় ঢোকে। হাত-পা বেঁধে মারধর শুরু করে। এরপর চোখ বেঁধে জোর করে গাড়িতে তুলে নিয়ে ক্রসফায়ারে হত্যার হুমকি দেয়।’ গতকাল রবিবার জামিনে ছাড়া পাওয়ার পর হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে শরীরের ক্ষতগুলো দেখিয়ে নির্মম নির্যাতনের বর্ণনা দিলেন অনলাইন সংবাদমাধ্যম বাংলা ট্রিবিউনের কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি আরিফুল ইসলাম রিগ্যান। আরিফুল বলছিলেন, জেলা প্রশাসনের সিনিয়র সহকারী কমিশনার (আরডিসি) নাজিম উদ্দীন এই হামলার নেতৃত্ব দেন। নিজে হাতে পিটিয়েছেন। কুড়িগ্রাম সদর হাসপাতালের মেডিক্যাল অফিসার ডা. রেদওয়ান ফেরদৌস সজীব সাংবাদিকদের বলেন, আরিফুলের সারা  শরীরে নির্মম নির্যাতনের অসংখ্য ক্ষত রয়েছে। তিনি পর্যবেক্ষণে আছেন।

জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন গতকাল সচিবালয়ে সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, ‘রংপুরের অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনারকে দিয়ে যে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছিল, সেই তদন্তের প্রাথমিক রিপোর্ট আমাদের কাছে এসেছে। এখানে আইনের ব্যত্যয় ঘটেছে। প্রধানমন্ত্রী গতকালই তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন। আমরা জেলা প্রশাসককে প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নিয়েছি, পাশাপাশি তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থাও নেওয়া হবে।’ এদিকে গতকাল তার জামিন হলেও কীভাবে কে জামিন চাইল, তার কিছুই জানে না পরিবার।

গত শুক্রবার মধ্যরাতে আরিফুল ইসলাম রিগ্যানকে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে এক বছরের বিনাশ্রম কারাদণ্ড দেয় ভ্রাম্যমাণ আদালত। কুড়িগ্রাম জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়, মাদকবিরোধী অভিযানে তাকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তার কাছ থেকে ৪৫০ গ্রাম দেশি মদ ও ১০০ গ্রাম গাঁজা উদ্ধার করা হয়েছে বলে দাবি টাস্কফোর্সের। তবে এ ঘটনার পর আরিফুলের স্ত্রী ও সাংবাদিকেরা দাবি করেন, পুরো ঘটনাই সাজানো। জেলা প্রশাসক সুলতানা পারভীনের অনিয়মের বিরুদ্ধে রিপোর্ট করাই আরিফের কাল ছিল। আরিফকে তুলে নেওয়া ও সাজা দেওয়ার ঘটনায় দেশব্যাপী সমালোচনার ঝড় ওঠে। ডিসিকে প্রত্যাহারের কথাও বলেন সবাই। 

আরিফুলের মুখে নির্মম নির্যাতনের বর্ণনা :হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে আরিফুল বলেন, ‘শুক্রবার রাত ১২টার দিকে খেয়ে শুয়ে পড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। এ সময় দরজায় ধাক্কার শব্দ পাই। পরিচয় জানতে চাইলে ওপাশ থেকে বলা হয়, থানা  থেকে আসছি। এ সময় আমি সদর থানার ওসিকে ফোন দিই। ওসি বলেন, থানা থেকে কাউকে পাঠানো হয়নি। ফোন দেওয়ার কথা শুনে বাইরে থাকা আরডিসি নাজিম উদ্দিনের নেতৃত্বে একদল লোক দরজা ভেঙে বাসায় ঢোকে। এ সময় কুড়িগ্রামের জেলা প্রশাসনের সহকারী কমিশনার রিন্টু বিকাশ চাকমাও ছিলেন। তবে রিন্টু চাকমা কোনো আঘাত করেননি। ঘরে ঢুকেই আরডিসি নাজিম আমার মাথায় কিল-ঘুষি মারতে শুরু করেন। মারতে মারতে আমাকে টেনে-হিঁচড়ে গাড়িতে তুলে চোখ-হাত-পা বেঁধে ফেলা হয়। এরপর আমাকে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে এনকাউন্টার দিতে চায়। আমাকে বারবার বলে, আজ তোর জীবন শেষ। তুই কালেমা পড়ে ফেল, তোকে এনকাউন্টার দেওয়া হবে। আমি তাদের কাছে বারবার প্রাণভিক্ষার আবেদন করি।’

সেই রাতের ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে আরিফুল বলেন, ‘আমি কান্নাকাটি শুরু করি। অনেক অনুনয়-বিনয় করি। আমি প্রাণভিক্ষা চাই। বলি, আমার বাবা-মা নেই, আমার দুটি সন্তান আছে। আমাকে যেন না মেরে ফেলা হয়। তাহলে আমার বাচ্চা দুটি এতিম হয়ে যাবে। পরে তারা আমাকে গাড়িতে করে একটি ভবনে নিয়ে যায়। আমি চোখের কাপড় একটু খুলে বুঝতে পারি এটা ডিসির কার্যালয়। এবার আমি একটু আশ্বস্ত হই, অন্তত আমাকে এনকাউন্টারে দেওয়া হবে না।’ আরিফ বলেন, ‘নাজিম উদ্দিনের নেতৃত্বে আমাকে একটি কক্ষে নিয়ে বিবস্ত্র করে বেধড়ক মারধর করা হয়। নাজিম উদ্দিন বলেন, তোর ভিডিও করে রাখছি। এ সময় অকথ্য ভাষায় গালাগালি করা হয়। একপর্যায়ে নাজিম উদ্দিন বলেন, তোর বাবার নাম কী? আমি বলি, স্যার, আমার বাবা তো মারা গেছেন। তখন নাজিম উদ্দিন আবার পেটাতে পেটাতে বলেন, বল, ডিসি আমার বাবা, ডিসি আমার বাবা। আরডিসি বারবার আরেক জনকে বলছিলেন, ডিসি স্যারকে ফোন দাও, মেসেজ দাও। কী করব, সেটা বলতে বলো?।’ আরিফ বলেন, ‘মারধরের সময় আমি বারবার জানতে চেয়েছি, আমার অপরাধ কী? তখন নাজিম উদ্দিন বলেন, তুই আমাদের অনেক জ্বালাচ্ছিস। ডিসির বিরুদ্ধে লিখিস। তুই অনেক বড়ো সাংবাদিক হয়ে গেছিস। আজ তোর সাংবাদিকতা ছোটাব।’

শুক্রবার রাতেই চোখ বাঁধা অবস্থায় চারটি কাগজে আরিফুলের স্বাক্ষর নেওয়া হয়। ভোরের দিকে একটু তড়িঘড়ি করে কারাগারে পাঠিয়ে দেয়। নাজিম উদ্দিন একবার জিগ্যেস করেন, ‘তুই ওসিকে ফোন করছিলি কেন?’ এসব অভিযোগের ব্যাপারে আরডিসি নাজিম উদ্দিনের সঙ্গে কয়েকবার ফোন করেও তাকে পাওয়া যায়নি।

যেভাবে জামিনের আবেদন ও জামিন :গতকাল সকালে কুড়িগ্রাম জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে আপিল আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মো. সুজাউদ্দৌলা জামিন শুনানির মাধ্যমে তাকে জামিন দেন। এ সময় রাষ্ট্রপক্ষে আইনজীবী ছিলেন পাবলিক প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট আব্রাহাম লিংকন এবং আসামিপক্ষে ছিলেন অ্যাডভোকেট শাখাওয়াত হোসেন ও আহসান হাবীব নীলু। ২৫ হাজার টাকা জামানতে কুড়িগ্রাম প্রেসক্লাবের সভাপতি আহসান হাবীব নীলুর জিম্মায় তাকে জামিন দেওয়া হয়।

জামিন প্রসঙ্গে আরিফুল জানান, কারাগার কর্তৃপক্ষ তার কাছে একটি ওকালতনামা পাঠায়। পরিবার পাঠিয়েছে বলে স্বাক্ষর নেওয়া হয়। তবে পরিবারের কেউ ওকালতনামায় স্বাক্ষর নেওয়ার জন্য জেল কর্তৃপক্ষের কাছে কোনো কাগজ পাঠায়নি। শাখাওয়াত হোসেন বলেন, প্রেসক্লাবের সভাপতির আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে তিনি জামিনের জন্য আবেদন করেন। তবে আরিফুলের বোন রিমা আক্তার বলেন, ‘আমরা কোনো কাগজে স্বাক্ষর করিনি, আপিলও করিনি।’

আসক ও ব্লাস্টের উদ্বেগ, দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি :আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) মনে করে, যে প্রক্রিয়ায় আরিফুলকে আটক করে সাজা প্রদান করা হয়েছে, তা সংশ্লিষ্ট আইনের বরখেলাপ, মানবাধিকার ও সাংবিধানিক অধিবকারের চরম লঙ্ঘন।

নিন্দা জানিয়েছে বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্ট (ব্লাস্ট)। ব্লাস্ট মনে করে, আইন অনুযায়ী বাসা থেকে কোনো নাগরিককে জোর করে তুলে নিয়ে মোবাইল কোর্ট সাজা দিতে পারে না।