‘অবৈধ’ মোবাইল কোর্টে চলছে বিচার। তিন বছর আগে হাইকোর্ট ভ্রাম্যমাণ আদালত (মোবাইল কোর্ট) আইনটি অবৈধ এবং সংবিধান পরিপন্থি বলে ঘোষণা দিয়েছিল। সরকার রমজান মাস উপলক্ষ্যে ভেজালবিরোধী অভিযান চালানোর অজুহাত দেখিয়ে হাইকোর্টের ওই রায়ের ওপর স্থগিতাদেশ নেয়। আপিল বিভাগ ২০১৭ সালের ২ জুলাই পর্যন্ত হাইকোর্টের আদেশের ওপর স্থগিতাদেশ দেন। পরবর্তীকালে সরকার আপিল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত স্থগিতাদেশ নেয়। এ সময়ের মধ্যে অসংখ্য মামলা নিষ্পত্তি হলেও জনগুরুত্বপূর্ণ এবং সংবিধানের মৌলিক প্রশ্ন জড়িত এ মামলাটির শুনানির সুযোগ হয়নি। ফলে তিন বছর ধরে শুনানির অপেক্ষায় পড়ে রয়েছে। নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের ক্ষমতার অপব্যবহারের কারণে ইতিমধ্যেই আইনটি বিতর্কিত হয়েছে। বেআইনি আচরণের কারণে একজন ম্যাজিস্ট্রেটের বিচারিক ক্ষমতা প্রত্যাহারে রুল জারি করেছে হাইকোর্ট। এছাড়া অসংখ্য মামলার দণ্ড বাতিলসহ সম্প্রতি ১২১ শিশুকে মোবাইল কোর্টে দেওয়া দণ্ড অবৈধ ঘোষণা করা হয়েছে ।
এদিকে আইন বিশেষজ্ঞরা অভিমত দিয়েছেন, উচ্চ আদালতে আইনটি অবৈধ ঘোষণার পর সরকারের উচিত ছিল এর কার্যক্রম সীমিত এবং বিচারিক ম্যাজিস্ট্রেট দিয়ে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা। তারা বলেছেন, যেহেতু হাইকোর্ট এর কয়েকটি ধারা সংবিধানের বেশ কয়েকটি অনুচ্ছেদের পরিপন্থি বলে ঘোষণা করেছেন, সেহেতু সংবিধানের প্রতি সম্মান দেখানো রাষ্ট্রের পবিত্র দায়িত্ব।
নির্বাহী বিভাগ থেকে বিচার বিভাগ পৃথকীকরণের পর বিসিএস (প্রশাসন) ক্যাডারদের দাবির মুখে ২০০৭ সালে ৫৪টি ক্ষেত্রে বিচারিক ক্ষমতা দিয়ে সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ভ্রাম্যমাণ আদালত অধ্যাদেশ জারি করেছিল। পরবর্তীকালে ২০০৯ সালে বর্তমান সরকার কিছু সংশোধনীসহ ভ্রাম্যমাণ আদালত আইন প্রণয়ন করে। এতে প্রশাসনের কর্মে নিয়োজিত হাকিমদের প্রায় ৮০টি ক্ষেত্রে সীমিত বিচারিক ক্ষমতা দেওয়া হয়। আইনটি জারি হওয়ার পর ভেজালবিরোধী অভিযান এবং পরিবেশ সুরক্ষা সংক্রান্ত বিষয়ে মোবাইল কোর্ট পরিচালনাকে অনেকেই স্বাগত জানান। অন্যদিকে কিছু নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ক্ষমতার অপব্যবহারসহ আইনটির বেআইনি প্রয়োগ শুরু করেন। ফলে আইন প্রণয়নের দুই বছরের মাথায় এর বৈধতা চ্যালেঞ্জ হয়। ২০১৭ সালের ১১ মে হাইকোর্ট এর নয়টি ধারা অবৈধ ঘোষণা করে এক ঐতিহাসিক রায় দেয়। একই সঙ্গে ২০০৯ সালের ভ্রাম্যমাণ আদালত আইনকে সংবিধান পরিপন্থি ও এখতিয়ারবহির্ভূত হিসেবে ঘোষণা করা হয়।
রায়ে বলা হয়, সরকারনিয়ন্ত্রিত নির্বাহী অফিসার দিয়ে মানুষকে সাজা দেওয়ার বিধান করে সংসদ সংবিধানের বিরুদ্ধাচরণ করেছে। তারা বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও ক্ষমতা পৃথক্করণের মতো দুটি মৌলিক কাঠামোকে আঘাত দিয়েছে। বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরী ও বিচারপতি আশীষ রঞ্জন দাসের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ কামরুজ্জামান খান বনাম বাংলাদেশ মামলায় ৬৪ পৃষ্ঠার রায়ে এ আইনের ত্রুটি-বিচ্যুতি সবিস্তারে তুলে ধরা হয়। আদালতের সামনে সরকারের পক্ষ থেকে যখন যুক্তি দেওয়া হয় নির্বাহী হাকিমেরা শুধুই দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় ভূমিকা পালন করবেন, তখন হাইকোর্ট তাকে ‘গ্রহণযোগ্য’ বলেছেন। কিন্তু কোনো সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে ঘটনাস্থলেই তাত্ক্ষণিক শাস্তি দেওয়ার ক্ষমতাকে বিচার বিভাগ পৃথক্?করণের ধারণার ওপর আঘাত হানবে বলে উল্লেখ করেছেন।
ভারতের উদাহরণ দিয়ে বিচারপতি মঈনুল ইসলাম চৌধুরী লিখেছেন, ‘ভারতের ভ্রাম্যমাণ আদালত দরিদ্র এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবনে ন্যায্যবিচার নিশ্চিত করে থাকে। ভারতীয় ভ্রাম্যমাণ আদালত প্রকল্পের আওতায় গ্রামে গ্রামে ভ্রাম্যমাণ আদালত বাস সার্ভিস চালু করা হয়েছে। ভারতীয় বিচারপতি এবং মুখ্যমন্ত্রীগণ বলেছেন, মানুষ সাধারণত আদালতে যায়। কিন্তু আজ ভারতে জনগণের কাছে এসেছে আদালত। পূর্বনির্ধারিত পরিকল্পনা অনুযায়ী ভ্রাম্যমাণ আদালতের বাস বিভিন্ন জনপদে বিচারকার্য সম্পাদন করে চলেছে। কিন্তু এই আদালতের বিচারকার্য নির্বাহী হাকিম নন, বিচারকেরাই পালন করছেন।’
আদালত বাংলাদেশের ভ্রাম্যমাণ আদালত আইনের ৬(১) ধারা উল্লেখ করে বলেন, নির্বাহী কর্মকর্তারা কোনো অবস্থাতেই বিচারিক ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারেন না। উপরন্তু রাষ্ট্রপক্ষের স্বীকৃতিমতে, ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি গ্রহণ ও রেকর্ড করার ক্ষেত্রে যে প্রক্রিয়াগত বাধানিষেধ রয়েছে, তা ভ্রাম্যমাণ আদালত আইন নাকচ করেছে। তার থেকেও বড়ো যুক্তি হলো, নির্বাহী হাকিম তার উপস্থিতিতেই অপরাধ ঘটেছে বলে বিচার করতে পারেন না। তিনি বড়োজোর প্রসিকিউশনের পক্ষে সাক্ষ্য দিতে পারেন। সুতরাং যিনি সাক্ষী হবেন তিনি বিচারক হয়ে শাস্তি দেবেন, সেটা আইন সমর্থন করে না।
আদালত বলে, এই আইনের আওতায় সরকার এখনো কোনো বিধিগত প্রক্রিয়া তৈরি করে দেয়নি। আইনের ৯ ধারা বলেছে, কোনো অভিযুক্ত তার জরিমানার অর্থ তাত্ক্ষণিকভাবে দিতে ব্যর্থ হলে তাকে তিন মাস জেল খাটতে হবে। এখন কোনো ব্যক্তিকে যদি সন্ধ্যা সাতটায় ব্যাংক বন্ধ হওয়ার পরে ২০ লাখ টাকা জরিমানা দিতে হয়, তাহলে তার পক্ষে সেটা তাত্ক্ষণিক জোগাড় করা সম্ভব না-ও হতে পারে। জেলা প্রশাসকরা প্রতিটি জেলায় নির্বাহী হাকিমদের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি কখনো শাস্তিদাতা আবার কখনো শাস্তির বিরুদ্ধে আপিল শ্রবণকারী। এ অবস্থাটি (১৩ ধারা) সংবিধানের ২৭, ৩১ ও ৩৫(৩) অনুচ্ছেদের লঙ্ঘন।
হাইকোর্ট বিভাগ রায়ের উপসংহারে যুক্তি দিয়েছেন, “আমরা ভ্রাম্যমাণ আদালতের ধারণার বিরোধী নই বরং সমর্থক। সন্দেহাতীতভাবে ভ্রাম্যমাণ আদালত ‘ফাস্ট ট্র্যাক’ আদালত হিসেবে পরিচিত। বাংলাদেশের সামাজিক প্রেক্ষাপটে এবং তৃণমূল পর্যায়ে বিচারের সুবিধা দিতে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মতো ব্যবস্থার প্রবর্তন অপরিহার্য। কিন্তু বিদ্যমান আইনের আওতায় যেভাবে ভ্রাম্যমাণ আদালতের কার্যক্রম চলছে, তা আইনের শাসন এবং সংবিধানের ওপর একটি আক্রমণ।”
হাইকোর্টের রায়ে সংবিধানের সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা এবং আইনের এই ত্রুটিবিচ্যুতি তুলে ধরা সত্ত্বেও ক্ষমতার দাপটে চলছে মোবাইল কোর্ট। গত শুক্রবার রাতে কুড়িগ্রামে মাদকবিরোধী অভিযানের নামে এক সাংবাদিককে বাড়ি থেকে ধরে এনে গভীর রাতে ডিসি অফিসে মোবাইল কোর্ট বসিয়ে দেওয়া হয় এক বছরের দণ্ড। এ নিয়ে বিভিন্ন মহলে আবারও মোবাইল কোর্ট পরিচালনার যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
এ প্রসঙ্গে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ড. শাহদীন মালিক ইত্তেফাককে বলেন, মোবাইল কোর্টের ওপর সুপ্রিম কোর্টের নিয়ন্ত্রণ নেই, এজন্য হাইকোর্ট অবৈধ ঘোষণা করেছিল। নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট দিয়ে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করছে নির্বাহী বিভাগ। আমি মনেকরি মোবাইল কোর্টের ওপর সুপ্রিম কোর্টের নিয়ন্ত্রণ থাকা উচিত। এক জনকে জেল-জরিমানা দিয়ে কারাগারে পাঠানো তো বিচারিক ক্ষমতার প্রয়োগ। বিচারিক ক্ষমতা তো সুপ্রিম কোর্টের তত্ত্বাবধান ছাড়া হতে পারে না। এভাবে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা আইনের মূলনীতির পরিপন্থি। সুপ্রিম কোর্টের নিয়ন্ত্রণের বাইরে গিয়ে মোবাইল কোর্ট কর্তৃক বিচার পরিচালনা করা বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও পৃথকীকরণের পরিপন্থি। তাই সুপ্রিম কোর্টের তত্ত্বাবধানে ও নিয়ন্ত্রণে থেকে কীভাবে মোবাইল কোর্ট কাজ করতে পারে সেটা খুঁজে বের করতে হবে। ড . শাহদীন মালিক সংবিধানের গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন জড়িত এরকম একটি মামলা শুনানি না করে ফেলে রাখাকে দুঃখজনক বলে অভিহিত করেছেন।
রিটকারী পক্ষের আইনজীবী ব্যারিস্টার হাসান এম এস আজিম বলেন, এখনো আপিল শুনানির জন্য প্রস্তুত হয়নি। রাষ্ট্রপক্ষ আপিলের সারসংক্ষেপ দাখিল করলে মামলাটি শুনানির জন্য প্রস্তুত হবে। অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম ইত্তেফাককে বলেন, যখন শুনানির জন্য মামলাটি কার্যতালিকায় আসবে তখনই উদ্যোগ নেওয়া হবে। এ প্রসঙ্গে ড. শাহদীন মালিক বলেন, দুই পক্ষকেই মামলার শুনানির উদ্যোগ নিতে হয়। আমাদের বিচার ব্যবস্থায় দুই পক্ষকে এক সঙ্গে করে মামলা শুনানির দিন ধার্য করার ক্ষেত্রে সুব্যবস্থা তৈরি করা যায়নি। তিনি বলেন, অন্যান্য দেশে ছয় মাস বা এক বছর আগে থেকেই মামলার শুনানির দিন নির্ধারণ করা হয়ে থাকে। কোনো অবস্থাতেই ঐ তারিখ পরিবর্তন করা হয় না। ফলে এভাবে মামলা দীর্ঘদিন পড়ে থাকে না। উভয় পক্ষের সম্মতি নিয়ে শুনানির দিন ঠিক করার যে ব্যবস্থাপনা সেটার দিকে আমাদের নজর দেওয়া উচিত।
