ড. শামসুল আলম
অগ্রগতির যাত্রায় আমরা আজকে অনেক দূর পেরিয়ে এসেছি। কৃষিক্ষেত্রে উত্পাদন বৃদ্ধি ও বৈচিত্র্যায়ণে আমাদের সাফল্য গর্ব করার মতো। মোট দেশজ উত্পাদন তথা জিডিপিতে কৃষি খাতের অবদান ১৩ দশমিক ৬০ শতাংশ (২০১৯)। শিল্পোন্নত অর্থনীতিতে রূপান্তর প্রক্রিয়ায় জিডিপিতে কৃষি খাতে তুলনামূলকভাবে অবদান কমেছে, শিল্প ও সেবা খাতের প্রবৃদ্ধি ঘটেছে। কিন্তু এখনো বাংলাদেশের প্রায় ৬০ শতাংশ মানুষের জীবন-জীবিকা কোনো না কোনোভাবে কৃষির ওপর নির্ভরশীল। শ্রমশক্তি জরিপ (২০১৬)-এর হিসাবমতে, দেশের মোট শ্রমশক্তির ৪০ দশমিক ৬ শতাংশ এখনো কৃষিতে নিয়োজিত আছে।
সাম্প্রতিক সময়ে কৃষি খাতে উন্নয়নের কারণে বাংলাদেশের গ্রামীণ অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে। গত পাঁচ বছরে দেশে অতিদারিদ্র্যের হার ১০ শতাংশে কমানোর ক্ষেত্রেও কৃষি উত্পাদন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে বলে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা, আন্তর্জাতিক খাদ্যনীতি গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং বিশ্বব্যাংকের বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। খাদ্যশস্য (চাল, গম) উত্পাদন এখন পৌঁছেছে প্রায় ৩ কোটি ৭৪ লাখ মেট্রিক টনে, ১৯৭২ সালে যা ছিল প্রায় ১ কোটি মেট্রিক টন। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষিবিষয়ক সংস্থা এফএওর ‘দ্য স্টেট অব ফিশ অ্যান্ড অ্যাকুয়াকালচার-২০১৮’ শীর্ষক প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রাকৃতিক উত্স থেকে মাছ উত্পাদনে বাংলাদেশ বিশ্বে তৃতীয় অবস্থানে উঠে এসেছে। জাতিসংঘের কৃষি ও খাদ্য সংস্থার তথ্যমতে, সবজি উত্পাদনে বাংলাদেশ এখন বিশ্বে তৃতীয়। আগে শাক-সবজির উত্পাদন শীত মৌসুমে ব্যাপ্ত ছিল (মোট উত্পাদনের ৭০ শতাংশ), যা এখন বছরব্যাপী প্রসারিত হয়েছে। পোলট্রি ও ডিম ১৬ কোটি মানুষের চাহিদা মিটাচ্ছে। ১ হাজার ৭০০ কোটি পিস এখন আমাদের বার্ষিক (২০১৮-১৯) ডিম উত্পাদন। ছাগল উত্পাদনে বাংলাদেশের অবস্থান বিশ্বে চতুর্থ আর ছাগলের মাংস উত্পাদনে পঞ্চম। কলা চাষে আমরা স্বয়ংসম্পূর্ণ। বিখ্যাত দার্শনিক রুশো বলেছিলেন, ‘পৃথিবীর সবচেয়ে বড়ো ও গৌরবমণ্ডিত শিল্প হচ্ছে কৃষি।’ স্বাধীনতার পর থেকে গত প্রায় পাঁচ দশকে কৃষিজমি আশঙ্কাজনকভাবে হ্রাস পেলেও শস্য উত্পাদন বৃদ্ধি পেয়েছে প্রায় চার গুণ। বাংলাদেশের কৃষি খাতে আজকের যে সাফল্য, তার ভিত্তিটাই স্থাপন করেছিলেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। গ্রামের কৃষি ও কৃষকের ভাগ্য উন্নয়নের ভাবনায় তাড়িত হয়েই বঙ্গবন্ধু আপন খেয়ালে রাজনীতির পথে পা বাড়িয়েছিলেন।
মুক্তিযুদ্ধের অব্যবহিত পরের অবস্থা : ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী সরকারি খাদ্যগুদাম থেকে সমস্ত খাদ্যশস্য সেনানিবাসে স্থানান্তরিত করেছিল পরিকল্পিতভাবে। ৯ মাস যুদ্ধের সময় বাংলাদেশের জনগণের জন্য খাদ্য আমদানি সম্পূর্ণ বন্ধ রাখা হয়েছিল। যুদ্ধের জন্য অনেক খেতে ফসল বোনা সম্ভব হয়নি। তাই স্বাধীনতার পরপরই দেখা গেল সরকারি খাদ্যগুদাম শূন্য। জনযুদ্ধের কারণে কৃষি উত্পাদনব্যবস্থা ব্যাহত হয়েছিল। বিশ্বব্যাংকের প্রাথমিক জরিপে উল্লেখ আছে, শুধু খাদ্যশস্য আমদানি নয়, আগামী ফসল আবাদের জন্য কৃষকের হাতে তিন ভাগের এক ভাগ বীজধানও ছিল না তখন। সার, কীটনাশক ঔষধ, হালের বলদ, পাওয়ার পাম্প, গভীর নলকূপ—সবকিছুই নতুন করে সংগ্রহ করতে হবে বলে উল্লেখ করা হয়। জরিপে আরো উল্লেখ করা হয়, বাহাত্তরের কৃষি মৌসুমেই ৩ হাজার মণ গমবীজ, বোরো ধানবীজ ২ হাজার মণ, ৩২০ হাজার টন সার, আলুবীজ ১৫০০ হাজার টন, ২০ হাজার পাওয়ার পাম্প তাত্ক্ষণিকভাবে প্রয়োজন। অথচ বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে যা আছে, তার পরিমাণ এতই নগণ্য যে তাতে ১০০ ভাগের ১০ ভাগ চাহিদাও মিটবে না। বিশ্বব্যাংক জরিপে কৃষি আবাদের ১ লাখ বলদ ছাড়াও দুগ্ধবতী গাভির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে আবাদে যেমন বিঘ্ন ঘটবে, তেমনি সারা দেশে শিশুরা দুধের অভাবে অপুষ্টিতে ভুগবে। বিশ্বব্যাংকের জরিপে বসতবাড়িসহ সরকারি-বেসরকারি যেসব অফিস-আদালত, খাদ্যকেন্দ্র, হাসপাতাল, গুদামঘর, স্কুল পুড়িয়ে দেওয়া হয়, তার বিবরণে শুধু গ্রামাঞ্চলেই ৪৩ লাখ বাড়ি পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছিল। উল্লেখ করা হয়েছিল, যারা ফিরে এসেছে তাদের জন্য কমপক্ষে ১০ লাখ বসতবাড়ি নির্মাণের প্রয়োজন তাত্ক্ষণিকভাবে। ৩০ লাখ টন খাদ্য ঘাটতির কথা ঐ জরিপে উল্লেখ করা হয়েছে। পাকিস্তানিরা চট্টগ্রাম বন্দরটি সম্পূর্ণভাবে শুধু ধ্বংসই করেনি, বন্দর থেকে বহুদূর পর্যন্ত সমুদ্রপথে মাইন পেতে রেখেছিল, ফলে খাদ্যশস্য নিয়ে জরুরি ভিত্তিতে কোনো জাহাজ এসে যে আউটারে নোঙর করবে, সে উপায় ছিল না। তাছাড়া স্থলপথের রেলযোগাযোগ প্রায় সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছিল। সড়কযোগাযোগও ধ্বংস করা হয়েছিল সেতুগুলো উড়িয়ে দিয়ে। খাদ্য পরিবহনকারী ট্রাক ও রেল বগিগুলো ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছিল। বাংলাদেশে রেলওয়ের প্রাথমিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয় যে ৪৫ মাইল রেলপথ পুনঃস্থাপন না করা গেলে রেলযোগাযোগ বিশেষ পর্যায়ে আনা যাবে না। রেল ইঞ্জিন মেরামতের কারখানাটি সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছিল ডিনামাইট দিয়ে। সড়ক বিভাগের রিপোর্টে (১৯৭২) উল্লেখ করা হয়েছিল, তাত্ক্ষণিকভাবে ১৩০টি বড়ো ও মধ্যম ধরনের সেতু সম্পূর্ণ নতুন করে নির্মাণ করতে হবে। ১৫০টি ইঞ্জিনচালিত ফেরির প্রয়োজন বলে উল্লেখ করা হয়েছিল, যতদিন সেতু নির্মাণ না করা হয়। অভ্যন্তরীণ নদীপথের সংস্কার এবং কমপক্ষে ১ হাজার ৫০০ খাদ্যবাহী কার্গোর প্রয়োজন বলে উল্লেখ করা হয়েছিল। অর্থাত্, এতসব অভাব পূরণ হলে তবেই সুষ্ঠু খাদ্যশস্য পরিবহন সম্ভব। ২৩৭টি মাঝারি ও বড়ো আকারের শিল্পকারখানার ১৯৫টি কারখানাই আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত, এগুলো সংস্কারের জন্য যন্ত্রাংশ ও কারিগরিভাবে দক্ষ জনশক্তির প্রয়োজন। দক্ষ শ্রমিকের প্রয়োজন। প্রায় সব মিলকারখানারই মালিক ছিল অবাঙালি; ব্যবস্থাপনা পরিচালকগণও। ৬৬৩টি ছোটো ধরনের কারখানার প্রায় সব কটিই বন্ধ। বিশ্বব্যাংকের মন্তব্য ছিল, শুধু ছোটো কারখানাগুলো চালু করার জন্যই প্রায় ১ কোটি ডলার প্রয়োজন বিদেশ থেকে কাঁচামাল খরিদের জন্য। ঐ প্রতিবেদনে আরো মন্তব্য করা হয়েছিল, কলকারখানা পরিচালনার জন্য বাংলাদেশে আপাতত কোনো দক্ষ পরিচালক নেই। ৯০০ কলেজ, ৬ হাজার হাই স্কুল কম-বেশি ক্ষতিগ্রস্ত। সব মিলিয়ে নতুন ৩ কোটি পাঠ্যপুস্তকের প্রয়োজন। কাগজ নেই। কাগজের কলসহ অন্যান্য কলকারখানায় শতকরা ৬৫ ভাগ বিহারি শ্রমিক ছিল। তারা ১৬ ডিসেম্বরের পর পালিয়েছে। খুলনা ও চন্দ্রঘোনা দুটি কাগজকল নতুন করে চালু করতে কমপক্ষে ছয় মাস সময় প্রয়োজন। বাংলাদেশ সরকারের প্রাথমিক জরিপ হিসাবে বলা হয়েছিল, স্কুল-কলেজগুলোর জন্য তাত্ক্ষণিকভাবে প্রয়োজন ১০ হাজার শিক্ষক। সারাদেশে বিদ্যুত্ বিচ্ছিন্ন। স্থানীয়ভাবে কোনো রকমে কিছু বিদ্যুত্ব্যবস্থা টিকে ছিল। শিল্পের জন্যও বিদ্যুতের ব্যাপক অভাব ছিল। তবে তাত্ক্ষণিকভাবে প্রয়োজন ছিল ১১ হাজার বিদ্যুতের খুঁটি। ১৬ ডিসেম্বর সকালে স্টেট ব্যাংকের টাকা ব্যাংকের সামনে চত্বরে এনে পুড়িয়ে ফেলা হয়েছিল। এক কথায়, ৩০ লাখ শহিদের আত্মোত্সর্গের বিনিময়ে ১৯৭১ সালে যখন স্বাধীনতা পেলাম, তখন বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ভিত্তি বলতে কিছুই ছিল না। প্রতিটি গ্রাম ছিল যোগাযোগবিচ্ছিন্ন, বৃহত্তর অর্থনীতির সঙ্গে প্রায় সংযোগবিহীন। পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধুর প্রত্যাগমন হয় ১০ জানুয়ারি ১৯৭২ সালে। সেদিন লাখ লাখ জনতার আনন্দ-উল্লাস-উচ্ছ্বাসে ঢাকা উদ্বেলিত ছিল। লাখ লাখ জনতা সেই সময়ের রেসকোর্সে স্বাগত জানায়। তেজগাঁও বিমানবন্দর থেকে রেসকোর্স ময়দান পর্যন্ত পাঁচ কিলোমিটার পথ গাড়িবিহীন জনারণ্য পেরিয়ে বঙ্গবন্ধুর মোটর শোভযাত্রার সময় লেগেছিল দুই ঘণ্টা। সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের সামনে প্রধান করণীয় ছিল ছিন্নমূল বিপর্যস্ত কোটি মানুষের পুনর্বাসন আর যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের পুনর্গঠনের বিষয়টি। ১৮ জানুয়ারি ১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধু প্রথম আনুষ্ঠানিক সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য রাখেন, সেখানে অন্য সব বিষয়ের ওপর যে বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে আসে তা হলো :‘অর্থনীতিকে অবশ্যই পুনর্গঠন করতে হবে। খাদ্য, আশ্রয় ও বস্ত্র অবশ্যই দিতে হবে মানুষকে।’ বঙ্গবন্ধু নিজেই বলেছিলেন, ‘এই স্বাধীনতা আমার কাছে সেদিনই প্রকৃত স্বাধীনতা হয়ে উঠবে, যেদিন বাংলাদেশ কৃষক, মজুর ও দুঃখী মানুষের সকল দুঃখের অবসান হবে।’
বাংলাদেশ সরকার দেশের খাদ্য নিরাপত্তা ও পুষ্টি নিশ্চিতকরণ, দারিদ্র্যবিমোচন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির উদ্দেশ্যে কৃষি উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দিয়েছে। এক্ষেত্রে সরকারের মূল লক্ষ্য হচ্ছে সামগ্রিকভাবে কৃষি উত্পাদন ও উত্পাদনশীলতা বৃদ্ধিকরণ, কৃষক ও সমপ্রসারণ জনবলের দক্ষতা বৃদ্ধি, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রেক্ষিতে বিশেষায়িত সেবা প্রদান, রপ্তানি উপযোগী কৃষি বাণিজ্যিকীকরণ ও চুক্তিবদ্ধ চাষাবাদ পদ্ধতি প্রচলনসহ কৃষি কার্যক্রম বহুমুখীকরণ এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির মাধ্যমে সবার জন্য খাদ্য ও পুষ্টির নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়ন করা।
কৃষির জন্য অন্তঃপ্রাণ এক মহান নেতার সবচেয়ে বড়ো অর্জন হচ্ছে কৃষিক্ষেত্রে সবুজ বিপ্লবের সূচনা করা। গবেষণার ফলে আবিষ্কৃত নতুন নতুন কৃষিজ প্রযুক্তি কৃষকের মাঠে প্রয়োগের ফলে দানা শস্যসহ অন্যান্য কৃষিখাদ্যের উত্পাদন আজকে প্রায় তিন গুণ বেড়েছে। আর কৃষিক্ষেত্রে এই বিপ্লবের সূচনা করেছিলেন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু। তিনি যথার্থই অনুভব করেছিলেন, সোনার বাংলা রূপায়ণে কৃষি উন্নয়নের বিকল্প নেই। স্বাধীনতা-পরবর্তী এক ভাষণে তিনি বলেছেন, ‘বর্তমান সরকার অতীতের সরকারগুলোর মতো নয়। এ সরকার জনগণের সরকার। এ সরকার বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের সরকার। আমাদের এমন একটি সমাজ গড়ে তুলতে হবে, যে সমাজে এই কৃষকেরা, এই শ্রমিকেরা, এই ক্ষুধার্ত জনগণ আবার হাসতে পারবে। জনগণের প্রাণ ধারণের অন্যতম চাহিদা পূরণের নিশ্চয়তা বিধান করা না গেলে স্বাধীনতা অর্থহীন হয়ে পড়বে। কাজেই সংগ্রাম এখনো শেষ হয়নি, মূলত সংগ্রাম মাত্র শুরু হয়েছে। এবারের সংগ্রাম সোনার বাংলা গড়ে তোলার সংগ্রাম।’
n লেখক : মুজিববর্ষে অর্থনীতিতে
একুশে পদকপ্রাপ্ত অর্থনীতিবিদ
