ফরিদা ইয়াসমিন
জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নারী মুক্তির যে স্বপ্ন দেখেছিলেন, তা বাস্তবায়নের প্রথম ধাপ ১৯৭২-এর সংবিধান। সদ্য স্বাধীন দেশের সংবিধানে তিনি নারী-পুরুষের সমতার দিকে বিশেষ নজর দেন। আর এই সংবিধানের ওপর ভিত্তি করেই নারীর ক্ষমতায়নের নানা ক্ষেত্র তৈরি হয়। তবে এর আগে থেকেই বঙ্গবন্ধুর রাজনীতিতে নারীরা গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করেছিলেন। বদরুন্নেসা আহমেদ, আমেনা বেগম, জোহরা তাজউদ্দীন—এই নামগুলো উল্লেখযোগ্য, যারা সরাসরি বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে রাজনীতি করেছেন। ১৯৭২ সালে সংবিধানে নারীর ক্ষমতায়নের ভিত রচিত হয়। অনুচ্ছেদ ২৭-এ বলা আছে, ‘সকল নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান এবং আইনের সমান আশ্রয়লাভের অধিকারী।’
সমাজে নারীর অংশগ্রহণ এবং সুযোগ বাড়ানোর জন্য ’৭২ সালেই বঙ্গবন্ধু সরকার সরকারি চাকরির ক্ষেত্রে ১০ ভাগ কোটা সংরক্ষণ করেন। বঙ্গবন্ধু সরকারের আমলে নারীর রাজনৈতিক নেতৃত্ব বিকাশের জন্য সংবিধানের ৬৫(৩) অনুচ্ছেদে নারীর জন্য জাতীয় সংসদের আসন সংরক্ষিত রাখা হয়েছে। এই সংরক্ষিত আসনে প্রথমে ১৫ জন নারী সদস্য নিয়ে যাত্রা শুরু করলেও বর্তমানে পর্যায়ক্রমে তা বৃদ্ধি পেয়ে ৫০ জনে উন্নীত হয়েছে। সংরক্ষিত আসনের ব্যবস্থা থাকলেও ৬৫(২) অনুচ্ছেদের অধীনে প্রত্যক্ষভাবে নির্বাচিত ৩০০ আসনেও নারীর অংশগ্রহণে সমান সুযোগ রয়েছে। মুক্তিযুদ্ধে নির্যাতিত নারীদের মর্যাদার আসনে বসান বঙ্গবন্ধু। পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ও তাদের এদেশীয় দোসরদের হাতে পাশবিকতার শিকার নারীদের যুদ্ধের পর এই সমাজ, পরিবার গ্রহণ করতে চাইল না। বঙ্গবন্ধু তাদের সম্মানিত করলেন ‘বীরাঙ্গনা’ উপাধি দিয়ে। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি বর্বর সেনাবাহিনী ও তাদের এদেশীয় দোসরদের হাতে নির্যাতিত নারীর গর্ভে অনেক যুদ্ধশিশুর জন্ম হলো। তাদের পরিচয় দেওয়ার মতো কোনো কিছু ছিল না। সমাজ গ্রহণ করতে চাইল না। বিশাল হূদয়ের বঙ্গবন্ধু বললেন, তাদের পিতার নাম শেখ মুজিব। জাতীয় মহিলা সংস্থায় এক ভাষণে বঙ্গবন্ধু বললেন, ‘আজ থেকে ধর্ষিতা মেয়ের বাবার নামের জায়গায় লিখে দাও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। আর ঠিকানা লেখো ধানমন্ডি ৩২। মুক্তিযুদ্ধে আমার মেয়েরা যা দিয়েছে, সেই ঋণ আমি কীভাবে শোধ করব?’ তিনি ঐ সব নির্যাতিত নারীর পুনর্বাসনের জন্য ১৯৭২ সালেই গঠন করেন ‘নারী পুনর্বাসন বোর্ড’।এই সময়ে বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিবের প্রচেষ্টায় ১০ জন বীরাঙ্গনা নারীকে বিয়ে দেওয়া হয়েছিল। জাতির পিতা নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে ভেবেছেন। ১৯৭৩ সালে তিনি মন্ত্রিসভায় দুই জন নারীকে অন্তর্ভুক্ত করেন। তারা ছিলেন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে অধ্যক্ষ বদরুন্নেসা আহমেদ এবং সমাজকল্যাণে বেগম নূরজাহান মুরশীদ। সে সময় বঙ্গবন্ধু বললেন, ‘নারীদেরও পুরুষদের মতো সমান অধিকার এবং তা রাজনীতির ক্ষেত্রেও। আওয়ামী লীগ যেমন অসাম্প্রদায়িকতায় বিশ্বাস করে, তেমনি নর-নারীর সমান অধিকারেও বিশ্বাস করে। আওয়ামী লীগেও নারী নেতৃত্ব গড়ে তোলা দরকার।’ ১৯৭৪ সালে নারী উন্নয়ন বোর্ডকে পুনর্গঠন করে সংসদে অ্যাক্টের মাধ্যমে নারী পুনর্বাসন ও কল্যাণ ফাউন্ডেশনে রূপান্তর করা হয়। এই ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের পথটি তৈরি হয়। ক্ষতিগ্রস্ত নারীদের চিকিত্সাসেবা চালু এবং তাদের ছেলেমেয়েদের লেখাপড়ার জন্য বৃত্তিপ্রথা চালু করেন। এটি বর্তমানে মহিলাবিষয়ক অধিদপ্তরের আওতায় ‘দুস্থ’ মহিলা ও শিশুকল্যাণ তহবিল’ নামে পরিচালিত হচ্ছে।
বঙ্গবন্ধু উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন নারীর সামাজিক সম্মান ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠার গুরুত্ব। ব্যক্তিজীবনেও তিনি বেগম মুজিবকে অত্যন্ত সম্মানের চোখে দেখতেন। বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিবের নানা পরামর্শ অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতেন। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ২৬ মার্চ ১৯৭২, রাজধানীর আজিমপুর বালিকা বিদ্যালয়ে মহিলা ক্রীড়া সংস্থার অনুষ্ঠানে বলেন, ‘আমার জীবনেও আমি দেখেছি যে গুলির সামনে আমি এগিয়ে গেলেও কোনো দিন আমার স্ত্রী আমাকে বাধা দেয় নাই। এমনও আমি দেখেছি যে অনেকবার আমার জীবনের ১০-১১ বছর আমি জেল খেটেছি। জীবনে কোনো দিন মুখ খুলে আমার ওপর প্রতিবাদ করে নাই। তাহলে বোধ হয় জীবনে অনেক বাধা আমার আসত। এমন সময়ও আমি দেখেছি যে আমি যখন জেলে চলে গেছি, আমি এক আনা পয়সা দিয়ে যেতে পারি নাই আমার ছেলেমেয়ের কাছে। আমার সংগ্রামে তার দান যথেষ্ট রয়েছে। পুরুষের নাম ইতিহাসে লেখা হয়। মহিলার নাম বেশি ইতিহাসে লেখা হয় না। সে জন্য আজকে আপনাদের কাছে কিছু ব্যক্তিগত কথা বললাম। যাতে পুরুষ ভাইয়েরা আমার, যখন কোনো রকমের সংগ্রাম করে নেতা হন বা দেশের কর্ণধার হন, তাদের মনে রাখা উচিত, তাদের মহিলাদেরও যথেষ্ট দান রয়েছে এবং তাদের স্থান তাদের দিতে হবে।’ তিনি বাংলাদেশে প্রথম নারী সংগঠন জাতীয় মহিলা সংস্থার ভিত্তি রচনা করেন। বঙ্গবন্ধু নারীর সার্বিক উন্নয়ন ও তাদের অবস্থার পরিবর্তনের লক্ষ্যে একটি সাংগঠনিক কাঠামো তৈরির জন্য সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়কে নির্দেশ দেন। এরই পরিপ্রেক্ষিতে গঠিত হয় জাতীয় মহিলা সংস্থা। বঙ্গবন্ধু নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের ওপর জোর দিয়ে বলতেন, নারীর নিজস্ব আয় থাকলে পরিবারেও সম্মান বাড়ে। যদি তার সামান্য কিছু টাকাও থাকে, পরিবারে তার গুরুত্ব বাড়ে এবং পরিবার তাকে সম্মানের চোখে দেখে। জাতির পিতা ১৯৭২ সালের সংবিধানেই নারীকে শিক্ষিত ও দক্ষ মানবসম্পদ হিসেবে গড়ে তোলার যে উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলেন, তারই ধারাবাহিকতা চলছে। সরকারের জাতীয় উন্নয়ন কর্মকাণ্ড বাস্তবায়নে নারীর সক্রিয় অংশগ্রহণ এবং নারীর রাজনৈতিক, সামাজিক, প্রশাসনিক, অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করার কাজ এগিয়ে চলেছে। বাংলাদেশে সব ক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ বাড়ছে।
স্থানীয় সরকারব্যবস্থায় নারীর রাজনৈতিক নেতৃত্ব বিকাশে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা, উপজেলা, জেলা পরিষদ ও সিটি করপোরেশনের আইনগুলো যুগোপযোগী করে সরাসরি নির্বাচনের ব্যবস্থা করা হয়েছে। ১৯৯৭ সালে স্থানীয় সরকার আইনে সাধারণ আসনে নারী প্রার্থীর অধিকার ঠিক রেখে প্রতি ইউনিয়নে তিনটি সংরক্ষিত আসনে সরাসরি নির্বাচনের বিধান করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এর ফলে তৃণমূলে নারীর ক্ষমতায়নের পথ সুগম হয়। উপজেলা পরিষদে নারী ভাইস চেয়ারম্যানের পদ সৃষ্টি করা হয়। সেখানে তারা সরাসরি ভোটে নির্বাচিত হয়ে আসেন। ২০১৩ সালে ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী স্পিকার হিসেবে নির্বাচিত হয়ে পরপর তৃতীয়বারের মতো স্পিকারের দায়িত্ব পালন করছেন।
নারীর উন্নয়নে, ক্ষমতায়নে বাংলাদেশ সরকার ভালো ভালো উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। দৃশ্যমান অনেক পরিবর্তন হয়েছে। এত কিছুর পরও কথা থেকে যায়। বন্ধ হয়নি নারীর প্রতি সহিংসতা। এখনো নারী ঘরে-বাইরে নির্যাতিত হচ্ছে। বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলায় এখনো নারী ধর্ষণের শিকার হচ্ছে। কর্মক্ষেত্রে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে, গণপরিবহনে এমনকি রাস্তাঘাটে নারী যৌন হয়রানির শিকার হচ্ছে। নারীর প্রতি সমাজের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন হয় নাই। এখনো নারীকে দেখা হয় পুরুষের অধস্তন হিসেবে। এখনো সব ক্ষেত্রে অর্জিত হয়নি নারী-পুরুষের সমতা। জাতির পিতার স্বপ্ন সেদিন সার্থক হবে, যেদিন জীবনের সর্বক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত হবে নারী-পুরুষের সমতা, সেদিন আর একটিও নারী নির্যাতনের ঘটনা ঘটবে না। নারীর ক্ষমতায়নে আমাদের যেতে হবে আরো বহু দূর।
n লেখক :সাধারণ সম্পাদক, জাতীয় প্রেসক্লাব
