শ্রীহীন হয়ে পড়ছে সুন্দরবনের মনোরম পর্যটন কেন্দ্রগুলি

আপডেট : ১৮ মার্চ ২০২০, ২০:৪৩

বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাতে সুন্দরবনের আকর্ষণীয় ও দৃষ্টিনন্দন পর্যটন ক্ষেত্রগুলি শ্রীহীন হয়ে পড়েছে। বন অধিদপ্তরের আন্তঃবিভাগীয় সমন্বয়হীনতা ও অর্থাভাবে  বিভিন্ন পর্যটন ক্ষেত্রের অবকাঠামো রক্ষা করা যাচ্ছে না। রেস্টহাউসগুলো রাত যাপনের উপযোগী না হওয়ায় পর্যটকরা এখন ট্যুরিস্ট ভেসেল নির্ভর হয়ে পড়ছেন। 

সুন্দরবনের কটকা অভয়ারণ্যের রেস্টহাউসটি ছিলো পর্যটকদের কাছে অতি মোহনীয়। সুপার সাইক্লোন সিডরের তাণ্ডবে ২০০৭ সালে রেস্টহাউসসহ এ বন অফিস লণ্ডভণ্ড হয়ে যায়। পরে মেরামত করে কিছুটা পূর্বাবস্থায় ফেরানো হলেও গত মে মাসে বুলবুলের জলোচ্ছ্বাসে রেস্টহাউসটির সিঁড়িসহ সামনের রাস্তা, গোলঘর, বেঞ্চ ইত্যাদি বিধ্বস্ত হয়। 

গত ফেব্রুয়ারির শেষে কটকা পর্যটন কেন্দ্রের এই হত চেহারা দেখে এখানে অতীতে বিভিন্ন সময় বেড়াতে আসা পর্যটক ফৌজিয়া খোন্দকার অবাক বিস্ময়ে বললেন, ‘কটকার একি হাল।’ এ স্টেশনের ওসি সাইফুল ইসলাম এ সময় জানান, সামনের বর্ষা মৌসুমে সাগরের জোয়ার বা জলোচ্ছ্বাসের ছোবল থেকে কটকা রেস্টহাউসের সিঁড়িসহ পিলার রক্ষা করা অসম্ভব হয়ে পড়বে।

এদিকে ১৯৯৬-৯৭ সালে নির্মিত কঁচিখালীর রেস্টহাউসটিও সিডরের আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কয়েক বছর ধরে এই রেস্টহাউসটি পর্যটক বা বন বিভাগীয় কর্মকর্তাদের ব্যবহারের উপযোগী নেই। তারপরও জরাজীর্ণ অবস্থায় কোস্টগার্ডের সদস্যরা ব্যবহার করছেন।      

পূর্ব সুন্দরবনের পর্যটনকেন্দ্র কটকা অভয়ারণ্যে ২০১৬ সালে নির্মিত দ্বিতল রেস্টহাউস ভবনটি বন অধিদপ্তরের দু’বিভাগের টাগ অব ওয়ারে দীর্ঘ পাঁচ বছরেও ব্যবহার উপযোগী করা যায়নি। অপর দিকে ঘূর্ণিঝড় ‘বুলবুল’র আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত কঁচিখালী ও কটকা অভয়ারণ্যের বনরক্ষীদের ব্যারাকসহ অন্যান্য অবকাঠামো মেরামতের কাজ শুরু হচ্ছে না। 

সুন্দরবনে গিয়ে সরেজমিনে দেখা যায়, কটকায় বেড়াতে আসা দেশি-বিদেশি পর্যটকদের নিরাপদ অবস্থানের জন্য বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে বিশেষ প্রকল্পে বন অধিদপ্তরের বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ বিভাগের (ওয়াইল্ড লাইভ) ব্যবস্থাপনায় ২০১৬ সালে ৭৬ লাখ টাকা ব্যয়ে কটকায় উন্নত মানের দোতলা একটি রেস্টহাউসের নির্মাণ কাজ শেষ হয়। কিন্তু দীর্ঘ পাঁচ বছরেও রেস্টহাউসটি চালু করা হয়নি। রেস্টহাউসের নির্মাণ কাজের মান নিয়ে তখনই অধিদপ্তরের দু’টি বিভাগের মধ্যে দেখা দিয়ে ছিলো প্রচণ্ড মতবিরোধ। 

সুন্দরবন পূর্ব বিভাগের বর্তমান ও সাবেক দুই জন ডিএফও ইত্তেফাককে বলেন, ‘নির্মাণ ক্রটির কারণে সুন্দরবন বিভাগের পক্ষে ভবনটি দীর্ঘ দিনেও বুঝে নেওয়া সম্ভব হয়নি।বর্তমানে বান্দরবনে কর্মরত এবং ২০১৬ সালে সুন্দরবন পূর্ব বিভাগের ডিএফও সাইদুল ইসলাম ইত্তেফাককে বলেন, ‘কটকার রেস্টহাউজটি নির্মাণে এক ধরণের বাটপারি করা হয়েছে। ভবনটি নির্মাণে যেন বিবেকহীন আচরণ করেছেন।’

বর্তমানে সংশ্লিষ্ট বন অধিদপ্তরের প্রধান কার্যালয়ে কর্মরত উপ-বনসংরক্ষক এবং ২০১৭-১৯ সাল মেয়াদকালে কর্মরত সুন্দরবনের (পূর্ব) বিভাগের তৎকালীন ডিএফও মাহমুদুল হাসান বলেন, ‘নির্মিত রেস্টহাউজটির প্লান, ডিজাইন, নকশা, টেন্ডার ডকুমেন্টস ইত্যাদি নির্মাতারা সুন্দরবন বিভাগকে কখনওই হস্তান্তর করেন নি। যে কারণে বনবিভাগের বিল্ডিং রেজিস্টারে অর্ন্তভূক্ত করা সম্ভব হয়নি। তারপরও এ বিভাগ নিজস্ব অর্থায়নে রেস্টহাউজে যাওয়ার এপ্রোচ সড়ক তৈরি করে রেখেছেন। রেস্টহাউজ ভবনের বৈদ্যুতিককরণ, পানি সরবরাহ ব্যবস্থাসহ আনুষঙ্গিক অনেক কিছুর অভাব থাকায় ওয়াইল্ড লাইফ বিভাগ থেকে সুন্দরবন (পূর্ব) বিভাগ ভবনটি গ্রহণে অসম্মতি জানায়।’

তিনি আরও বলেন, ‘প্রয়োজনীয় অর্থের উৎসের অভাবে রেস্টহাউসটি ভবিষ্যতও অনিশ্চিত এবং রক্ষণাবেক্ষণ করা যাচ্ছে না।’ সুন্দরবন পূর্ব বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মো. বেলায়েত হোসেন বলেন, ‘কটকার নির্মিত রেস্টহাউসটি সুন্দরবন বিভাগের কাছে আজও বুঝিয়ে না দেওয়ায় সেটি চালু করা সম্ভব হচ্ছে না।’

পাশাপাশি নির্মাণ কাজ নিম্নমানের বলে ভবনের ছাদ চুইয়ে পানি পড়ে। সুন্দরবন বন বিভাগের সাবেক ও বর্তমান বিভাগীয় কর্মকর্তাদের এই অভিযোগ সম্পর্কে ভিন্নমত পোষণ করে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ বিভাগ খুলনার ডিএফও মদিনুল আহসান বলেন, ‘কটকায় নির্মিত রেস্টহাউসটি ২০১৬ সালে সুন্দরবন পূর্ব বিভাগের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। সুন্দরবন বিভাগ রেস্টহাউসে ফার্নিচার না দেওয়ায় তাদের কাছে রেস্টহাউসের জন্য কেনা লেপতোশক সরবরাহ করা হয়নি।’

ভবনটি নির্মাণকালে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ বিভাগের সুন্দরবনের ডিএফও এবং বর্তমানে অধিদপ্তরের প্রধান কার্যালয়ের বন সংরক্ষক জাহিদুল কবির জানান, কটকার রেস্টহাউসটি যে প্রকল্পের আওতায় নির্মিত হওয়ায় তার প্রকল্প পরিচালক ছিলেন তৎকালীন বন সংরক্ষক তপন কুমার দে। রেস্টহাউসটির অর্থায়ন বিশ্বব্যাংকের হওয়ায় তার ব্যয়, ঠিকাদার নিয়োগ, কাজের তদারকি ইত্যাদি সম্পাদন করা হতো প্রকল্প পরিচালকের দপ্তর থেকে। এ বিভাগের খুলনার ডিএফও হিসাবে তিনি শুধু কাজের অগ্রগতি সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে প্রতিবেদন পাঠাতেন মাত্র। বন অধিদপ্তর থেকে অবসরে যাওয়া উক্ত প্রকল্প পরিচালক তপন কুমার দেকে এ ব্যাপারে প্রশ্ন করা হলে তিনি বিষয়টি এড়িয়ে যান। 

অপরদিকে ঘূর্ণিঝড় বুলবুলে কঁচিখালী ও কটকার ক্ষতিগ্রস্ত ব্যারাকে বনরক্ষীদের মানবেতর জীবন যাপন করতে হচ্ছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন বনরক্ষী আক্ষেপ করে বলেন, ‘জীবনের ঝুঁকি নিয়ে আমরা এখানে থাকি আমাদের দুর্দশা দেখার কেউ নেই।’  

পূর্ব সুন্দরবনের শরণখোলা রেঞ্জ কর্মকর্তা (এসিএফ) মো. জয়নাল আবেদীন জানান, বুলবুলের ঘূর্ণিঝড়ে সুন্দরবনের শরণখোলা রেঞ্জের ১৪টি ক্যাম্প ফরেস্ট টহল ফাঁড়ির টিনের চাল, রান্নাঘর, বাথরুম, জেটিসহ অবকাঠামোর ব্যপক ক্ষতি হয়েছে। 

ইত্তেফাক/এএএম