আবাসনসংকট মাত্রা ছাড়াইয়াছে

আপডেট : ১৮ মার্চ ২০২০, ২১:৫২

আমরা জানি, পড়াশোনার জন্য প্রয়োজন নিরিবিলি ও শান্ত পরিবেশ। পড়াশোনায় যে মনোযোগ ও একাগ্রতা প্রদান করিতে হয় তাহার জন্যই ইহা প্রয়োজন। লাইব্রেরিগুলির পরিবেশ যেমন হইয়া থাকে। পাশাপাশি উচ্চশিক্ষার প্রতিষ্ঠান যেমন বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসনব্যবস্থা আশা করা হয় এমন হইবে যাহাতে নিরুপদ্রপ পড়াশোনা চালাইয়া যাওয়া যায়। তবে জানা যাইতেছে, দেশের একমাত্র পূর্ণাঙ্গ আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসনসংকটে সেই পরিবেশ হইতে বঞ্চিত হইতেছেন শিক্ষার্থীরা। গাদাগাদি করিয়া গণরুমে থাকিতে হইতেছে তাহাদের। ইহাতে পড়াশোনার মারাত্মক ক্ষতি হইতেছে। ১৯৭৩ সালের অধ্যাদেশের ৪০ ধারা অনুযায়ী দেশের এই আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি শিক্ষার্থী হলে অবস্থান করিবেন। এমনকি বিশেষ কোনো কারণ ছাড়া বা বিশ্ববিদ্যালয় সিন্ডিকেটের অনুমোদন ছাড়া কোনো শিক্ষার্থী ক্যাম্পাসের বাহিরে অবস্থান করিতে পারিবেন না। অর্থাত্ বিশ্ববিদ্যালয়টি সকল শিক্ষার্থীর আবাসনব্যবস্থা প্রদান করিতে আইনানুসারে বাধ্য। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে তাহা নিশ্চিত করা সম্ভব হইতেছে না। বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো উচ্চশিক্ষার প্রতিষ্ঠানে প্রতিটি শিক্ষার্থীর পূর্ণ বিকাশ ঘটাইতে যে পরিবেশ প্রয়োজন তাহা দেওয়া যাইতেছে না। পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয় ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য বিকাশের জায়গা; কিন্তু যেইরূপ গাদাগাদি করিয়া শিক্ষার্থীদের থাকিতে হয় তাহাতে ব্যক্তিগত গোপনীয়তা বলিতে কিছু থাকে না। পরিবেশ মানুষের মনস্তাত্ত্বিক গড়নের উপরেও প্রভাব ফেলিয়া থাকে। একত্রে গাদাগাদি করিয়া থাকার ফলে ব্যক্তিমানসের বিকাশ না ঘটিয়া সকলের মধ্যে একই রকম মানসের বিকাশ ঘটে, যাহা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার উদ্দেশ্যকে ব্যর্থ করিয়া থাকে। বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্দেশ্য মানুষের মধ্যে স্বতন্ত্র সত্তার বিকাশ, গড় মানুষ সৃষ্টি নহে।

জানা গিয়াছে, বিশ্ববিদ্যালয়টিতে শিক্ষার্থীদের জন্য আবাসিক হলগুলিতে আসন রহিয়াছে ৮ হাজার ২৭৮টি, আর ইহার বিপরীতে ১৩ হাজার ৯১০ শিক্ষার্থী। ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষের স্নাতক প্রথম বর্ষের ২ হাজার ১৩১ জন শিক্ষার্থীকে হল বরাদ্দ দেওয়া হইয়াছে। ফলে ৮ হাজার ২৭৮টি আসনের বিপরীতে হলে অবস্থান করিতেছেন ১৬ হাজার ৪১ শিক্ষার্থী। এমনকি নবাগত ছাত্রীদের হলে জায়গা দিতে না পারিয়া শিক্ষক ও কর্মচারীদের ছয়টি বাসা খালি করিয়া সেইখানে প্রায় ২৫০ জন রাখা হইয়াছে। ইহা ছাড়া হলের কমন রুম, রিডিং রুম, সংসদ রুম, নামাজের রুম, সাইবার রুমে স্থান নিয়াছে শিক্ষার্থীরা। এইগুলিই গণরুম নামে পরিচিত। এই সকল স্থানে এক শিক্ষার্থীর পরিবর্তে তিন-চার জন করিয়া থাকিতেছেন। ইহাতে ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যসুরক্ষাও বিপন্ন হইয়া পড়ে। সংক্রামক রোগ হইলে তাহা ছড়াইয়া পড়িতে পারে একজন হইতে বহুজনের মধ্যে। বর্তমানে আমরা আছি করোনা ভাইরাসের হুমকির মধ্যে। গণরুমগুলিতে অবস্থান করা এই মুহূর্তে অধিক ঝুঁকিপূর্ণ। তবে এই সংকট কেবল জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নহে, আবাসনসমস্যা বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার প্রতিষ্ঠানে দীর্ঘদিন ধরিয়াই বিরাজ করিতেছে। উচ্চ শিক্ষার মানোন্নয়নে যত দ্রুত সম্ভব এই সংকট কাটাইয়া উঠিতে হইবে এবং সরকারকে উচ্চশিক্ষায় বরাদ্দ বাড়াইয়া শিক্ষার্থীদের আবাসন নির্মাণ করিতে হইবে।