ত্রিয়েস্তে ও কপার :মধ্য ইউরোপের পানিপথে একদিন

আপডেট : ১৯ মার্চ ২০২০, ১৯:৪০

 ‘পানিপথ’। এ নামটির সঙ্গে পরিচয় নেই এমন কোনো শিক্ষিত মানুষ আমাদের উপমহাদেশে খুঁজে পাওয়া কঠিন। স্কুলে পড়ার সময় সামাজিক বিজ্ঞান বইতে পানিপথের প্রথম যুদ্ধ, পানিপথের দ্বিতীয় যুদ্ধ এবং পানিপথের তৃতীয় যুদ্ধ সম্পর্কে আমরা সকলে পড়েছি। এমনকি ইন্টারমিডিয়েটে আমাদের পাঠ্য ছিল বিখ্যাত নাট্যকার মুনীর চৌধুরী রচিত এক অমর সৃষ্টি ‘রক্তাক্ত প্রান্তর’—যার মূল পটভূমি ছিল পানিপথের তৃতীয় যুদ্ধকে কেন্দ্র করে।

ঠিক একইভাবে মধ্য ইউরোপে অবস্থিত ত্রিয়েস্তে এবং কপার এ দুইটি শহরকে মধ্য ইউরোপের পানিপথের সাঙ্গে তুলনা করলেও ভুল হবে না। কেন না এ দুটি শহরের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মানুষ কিংবা বিভিন্ন সাম্রাজ্যের উত্থান-পতনের ইতিহাস। অনেক ইতিহাসবিদ মনে করেন যে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তীকালে ফ্রান্সের ভার্সাইতে স্বাক্ষরিত চুক্তির ফলে আজকের ইউরোপের বিভিন্ন দেশের যে মানচিত্র রচিত হয়েছে তার কেন্দ্রবিন্দুতেও ছিল ত্রিয়েস্তে এবং কপার এ দুটি শহর ।

ঐতিহাসিক কিংবা ভৌগোলিক অবস্থান—যেকোনো দিক বিবেচনায় মধ্য ইউরোপের জাতিগোষ্ঠী মানুষের কাছে ত্রিয়েস্তে এবং কপার—এ দুটি শহর ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আড্রিয়াটিক সাগর তীরে অবস্থিত এবং বলকান পর্বতমালার প্রায় সঙ্গমস্থলে অবস্থিত ও শহর দু’টির শেষ করা যাবে না। ছবির মতো সুন্দর এ দুটি শহরে বছরের প্রায় সময়ই পর্যটকের আনাগোনা লেগে থাকে, বিশেষ করে এখানে ত্রিয়েস্তের ব্যাপারটা সবিশেষ।

আজকের পৃথিবীতে আমরা ‘গ্লোবালাইজেশন’ কিংবা ‘মাল্টিকালচারাল’—এ জাতীয় যে সকল শব্দ ব্যবহার করি তার সকল কিছুই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পূর্ব সময় পর্যন্ত এ শহরে নিহিত ছিল। এমনকি অস্ট্রো-হাঙ্গেরিয়ান সাম্রাজ্যের শাসনকালেও এ শহরটি স্লোভেনিয়ান, ইতালিয়ান, অস্ট্রিয়ান, জার্মান, হাঙ্গেরিয়ান, ক্রোয়েশিয়ানসহ ইউরোপের বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মানুষের পদচারণায় মুখর থাকত। ডিসেম্বর অথবা জানুয়ারি মাসে যখন পুরো ইউরোপ শীতের চাদরে ঢেকে যায় সেসময়ও ত্রিয়েস্তে উষ্ণ থাকে এবং এতটাই উষ্ণ যে শুধুমাত্র গায়ে টি-শার্ট জড়িয়ে অনায়াসে যে কেউ হেঁটে বেড়ানো সম্ভব। ধারণা করা হয়, খ্রিস্টপূর্ব দ্বিতীয় সহস্রাব্দে ইলিরীয় জাতিগোষ্ঠীর মানুষের দ্বারা এ শহরটির গোড়াপত্তন হয়। এরপর আনুমানিক ৫২ থেকে ৪৬ খ্রিস্টপূর্বাব্দের মাঝামাঝি কোনো সময়ে জুলিয়াস সিজার শহরটিকে রোম সাম্রাজ্যের কলোনি হিসেবে অধিষ্ঠিত করেন। এরপর ত্রয়োদশ কিংবা চতুর্দশ শতাব্দীর দিকে শহরটি তত্কালীন রিপাবলিকা ভেনেটার জলপথে বাণিজ্যের জন্য এক গুরুত্বপূর্ণ বন্দর হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৩৮২ সালে শহরটি অস্ট্রো-হাঙ্গেরিয়ান সাম্রাজ্য অর্থাত্ হাবসবুর্গ সাম্রাজ্যের অধীনে আসে এবং প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পূর্বকালীন সময় পর্যন্ত শহরটি হাবসবুর্গ সাম্রাজ্যের অধীনে ছিল। যদিও ১৫০৮ সাল থেকে ১৫১৬ সাল পর্যন্ত ত্রিয়েস্তে আবারও ভেনেটিয়ানদের দখলে চলে যায় এবং ১৮০৯ সালের দিকে নেপোলিয়ান বোনাপার্ট ত্রিয়েস্তে দখল করলে কিছু সময়ের জন্য এ শহরটি হাবসবুর্গ সাম্রাজ্যের থেকে হাতছাড়া হয়ে গিয়েছিল। আজকের দিনে আমরা যে অস্ট্রিয়া দেখতে পাই, বিশ্ব মানচিত্রে সেটি একটি ল্যান্ডলকড কান্ট্রি । তাই অস্ট্রিয়ানরা ত্রিয়েস্তেকে তাদের বাণিজ্যিক সমুদ্রবন্দর হিসেবে গড়ে তুলেছিল। আবার ভিপাভা উপত্যকার নিকটে অবস্থিত হওয়ায় মধ্যযুগ থেকেই ত্রিয়েস্তেতে স্লোভেনিয়ান এবং একইসঙ্গে অনেক ক্রোয়েশিয়ান জাতিগোষ্ঠীর মানুষেরও বসবাস ছিল। একই কারণে উত্তর-পূর্ব ইতালির গোরিজিয়া, মনফালকোন এবং উদিনেতেও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক স্লোভেনিয়ান জাতিগোষ্ঠীর মানুষের বসবাস ছিল। স্লোভেনিয়ার রাজধানী লুবলিয়ানা হলেও স্লোভেনিয়ার ইতিহাসে ত্রিয়েস্তে হলো সেই শহর—যেখানে সবচেয়ে বেশি স্লোভেনিয়ান জাতিগোষ্ঠীর মানুষের বসবাস ছিল অস্ট্রো-হাঙ্গেরিয়ান সাম্রাজ্যের অধীনস্থ চতুর্থ বৃহত্তম নগরীও ছিল  ত্রিয়েস্তে। ল্যাটিন, স্লাভিক, জার্মানি, ইউরেলিক—এ চারটি ভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মানুষের উপস্থিতি শহরটিকে সাংস্কৃতিক দিক থেকে অনেক সমৃদ্ধ করে তুলেছিল এবং আজও এ শহরটিতে একদিকে যেমন রোমানদের স্থাপত্যশৈলীর নিদর্শন খুঁজে পাওয়া যায় ঠিক তেমনি অস্ট্রিয়ান তথা জার্মান এবং স্লোভেনিয়ান ও ক্রোয়েশিয়ানদের স্থাপত্যশৈলীর নিদর্শনও রয়েছে এ শহরটিতে। বিভিন্ন ধরনের পণ্যের আদান-প্রদান, সাগরপথে বাণিজ্য, শিল্প এবং সাংস্কৃতিক আদান-প্রদান সব দিক থেকেই এ শহরটি হয়ে উঠেছিল চারটি ভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মানুষের মিলনমেলা।

ত্রিয়েস্তে থেকে মাত্র বাইশ কিলোমিটার দূরে কপারের অবস্থান। ত্রিয়েস্তের মতো কপার যদিও আড্রিয়াটিক সাগরের তীরবর্তী একটি শহর এবং বিভিন্ন ধরনের সুউচ্চ পর্বতমালা দ্বারা বেষ্টিত, তবে কপার ত্রিয়েস্তের মতো এতটা উষ্ণ নয়। শীতের সময় এ অঞ্চলে শক্তিশালী বাতাস প্রবাহিত হয় এবং এখানে বছরের প্রায় সময়ই বৃষ্টিপাত হয়। কপার বর্তমান স্লোভেনিয়ার একমাত্র বন্দর নগরী যেখানে সাগরপথে স্লোভেনিয়ার সঙ্গে পৃথিবীর অন্যান্য অনেক দেশের বাণিজ্যিক যোগসূত্র স্থাপিত হয়েছে। কপার, পিরান, পোর্তোরস, ইজোলা এ সকল জায়গা মূলত প্রসিদ্ধ ওল্ড টাউনের জন্য। যদিও জনসংখ্যার বিচারে এগুলো হয়তোবা খুব বেশি বড়ো শহর নয়। কোনো এক সুউচ্চ জায়গা থেকে দাঁড়িয়ে যখন আপনি আড্রিয়াটিক সাগরের তীরবর্তী কপার, পিরান, পোর্তোরস কিংবা ইজোলাকে দেখার চেষ্টা করবেন—প্রাকৃতিক সৌন্দর্য এবং মানবসৃষ্ট স্থাপত্যশৈলী দুই মিলিয়ে আপনার মনে এক অপার্থিব অনুভূতির সৃষ্টি করবে। যদিও আজকের দিনে কপার, পিরান, পোর্তোরস, ইজোলা এ সকল অঞ্চল স্লোভেনিয়ার মধ্যে পড়েছে, কিন্তু ঐতিহাসিকভাবে এগুলোকে ইতালিয়ানদের শহর বললেও ভুল হবে না। এ সকল জায়গার স্থাপত্যশৈলীও সেটি ইঙ্গিত করবে এবং ১৯০০ সালে করা এক জনগণনা অনুযায়ী কপারের ৭,৮৩০ জন অধিবাসীর মধ্যে ৭,২০৫ জনই ছিলেন ইতালিয়ান এবং অবশিষ্ট অংশের মানুষ ছিলেন স্লোভেনিয়ান, জার্মান ও ক্রোয়েশিয়ান। কপার থেকে শুরু করে ক্রোয়েশিয়ার পুলা অথবা পোরেচ এ সমগ্র অংশে এখনো উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ইতালিয়ান জনগোষ্ঠীা বসবাস রয়েছে। এ অঞ্চলে যারা বসবাস করেন তাদের প্রায় সবাই দ্বিভাষী। স্লোভেনিয়ান বা ক্রোয়েশিয়ানের পাশাপাশি সবাই এখানে ইতালিয়ান শিখে থাকেন এবং এ অঞ্চলের সমস্ত পরিসেবায় স্লোভেনিয়ান বা ক্রোয়েশিয়ান ভাষার পাশাপাশি ইতালিয়ান ভাষাও ব্যবহার করা হয়। কপারের সেন্টারের নাম করা হয়েছে কিংবদন্তি নেতা যিনি যুগোস্লাভিয়ার রাষ্ট্রনায়ক ছিলেন তার নামে, এ জায়গাটিকে মার্শাল টিটো স্কয়ার নামে ডাকা হয়। মার্শাল টিটো স্কয়ারে অবস্থিত ক্যাথিড্রালটি স্লোভেনিয়ার স্থানীয় ভাষায় ‘স্টোলনা চেরকেভ মারিয়েনিগা ভিনেবভজটিয়া’ নামে ডাকা হয় এবং দ্বাদশ শতাব্দীর মধ্যভাগে নির্মিত এ ক্যাথেড্রালটি মধ্যযুগীয় ইউরোপের স্থাপত্যশৈলীর এক অনন্য নিদর্শন। 

স্লোভেনিয়াতে পাবলিক ট্রান্সপোর্ট খুব বেশি একটা মানসম্মত নয়, মাথাপিছু প্রত্যেক ব্যক্তি হিসেবে সর্বাধিক সংখ্যক গাড়ির মালিকানায় থাকা দেশগুলোর তালিকায় তাই স্লোভেনিয়ার নাম আসবেই কেননা এখানে প্রায় সকলের নিজস্ব গাড়ি আছে এমনকি একটা পরিবারে যদি চার জন সদস্য থাকে তাহলে চার জনের জন্য চারটি গাড়ি থাকা অস্বাভাবিক কিছু নয়। এমনকি অনেক সময় ইউনিভার্সিটির ব্যাচেলর ফার্স্ট ইয়ারের স্টুডেন্টেরও নিজস্ব গাড়ি থাকা এখানে খুবই সাধারণ একটি ব্যাপার। আবার এখানে পাবলিক ট্রান্সপোর্ট সার্ভিস ‘নোমাগো’ নামক একটি কোম্পানির অধীনে এবং ইউরোপের অন্যান্য অনেক দেশের তুলনায় এখানে পাবলিক ট্রান্সপোর্ট বিশেষ করে ইন্টারসিটি ট্রান্সপোর্ট অনেক বেশি ব্যয়বহুল। আবার সব সময় যে পাবলিক ট্রান্সপোর্ট সেবা পাওয়া যাবে এমনটিও নয়। তাই সবাই এখানে নিজস্ব গাড়ি ব্যবহার করে এবং স্লোভেনিয়ার সরকারও পাবলিক ট্রান্সপোর্টের ব্যাপারে উদাসীন। তবে এখানে রাইড শেয়ারিং সার্ভিস (যা স্থানীয়দের কাছে  প্রিভোজি’ নামে পরিচিত) খুবই জনপ্রিয়। অপেক্ষাকৃত কম সময়ে এবং কম খরচে প্রিভোজির মাধ্যমে স্লোভেনিয়ার এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় কিংবা আশপাশের দেশগুলোতে ভ্রমণ করা যায়।

জানুয়ারিতে আমি মাল্টা ভ্রমণের পরিকল্পনা করি এবং আমার ফ্লাইট ছিল ত্রিয়েস্তের এয়ারপোর্ট থেকে। আমি লুবলিয়ানা থেকে ত্রিয়েস্তে যাওয়ার জন্য রাইডের সন্ধান করি এবং এভাবেই আমার সঙ্গে ইয়োজে নালের পরিচয় হয়। ইয়োজে নাল একটি ম্যানুফ্যাকচারিং কোম্পানিতে কাজ করেন এবং তিনি স্লোভেনিয়ার দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় একটি ছোটো শহর মেটলিকাতে বসবাস করেন। বয়স তার চল্লিশের ওপরে এবং তিনি খুব বেশি একটা সাংসারিক জীবনেও বিশ্বাস করেন না, ক্যাসিনো আর লটো খেলা তার নিয়মিত অভ্যাস। লটো হচ্ছে ইউরোপে প্রচলিত এক বিশেষ ধরনের খেলা যেখানে আপনাকে আপনার নিজের ইচ্ছেমতো কতগুলো নাম্বার নির্বাচন করতে বলা হবে এবং যদি আপনার দেওয়া নাম্বারগুলো ড্রয়ের সময় প্রদত্ত নাম্বারগুলোর সাথে মিলে যায় তাহলে আপনার জন্য রয়েছে বিভিন্ন ধরনের পুরস্কার। স্লোভেনিয়ার থেকে তিনি নিষিদ্ধও হয়েছেন তিন বছরের জন্য সকল ধরনের ক্যাসিনোভিত্তিক কার্যক্রম থেকে, কিন্তু তারপরও তিনি এতটাই আসক্ত হয়ে পড়েছেন যে স্লোভেনিয়াতে না পারলেও পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্র ক্রোয়েশিয়া বা অস্ট্রিয়াতে চলে যান ক্যাসিনো খেলতে এবং প্রায়ই তার অর্থ খোয়া যায়। তিনি চেষ্টা করছেন ক্যাসিনো থেকে বেরিয়ে আসতে, কিন্তু তিনি সেটি পারছেন না। নতুন যখন কারো সঙ্গে তার পরিচয় হয় তিনি তাদের পরামর্শ দেন—আর যা-ই করুক না কেন কেউ যেন ক্যাসিনোর ধারের কাছেও না যায়। যেদিনকে তার সঙ্গে আমার পরিচয় হয় তার আগের দিন রাতেও তিনি ক্রোয়েশিয়াতে গিয়ে ক্যাসিনো খেলে প্রায় ১,৫০০ ইউরোর মতো হারান এবং এজন্য তিনি মনের প্রশান্তি অর্জন করতে ত্রিয়েস্তে যাচ্ছিলেন। তার সঙ্গে কথা বলার একপর্যায়ে তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করলেন—কোনো একটি উপায় যদি আমি তাকে বলে দিতে পারি যার বদৌলতে তিনি এ ক্যাসিনোর নেশা থেকে বের হয়ে আসতে পারবেন। আমি নিজে খুবই ভ্রমণপ্রিয় মানুষ এবং আমি চেষ্টা করি প্রায় সময়েই কোথাও না কোথাও বেরিয়ে পড়তে, অজানা কিংবা নতুনকে সন্ধান করতে। আমিও তাকে এ পরামর্শটি দিলাম এবং তার কাছে এ পরামর্শটি ভালোও লেগে গেল। এজন্য যখন তিনি কোথাও ভ্রমণের পরিকল্পনা করেন আমাকে জানানোর চেষ্টা করেন এবং আমাকে বলেন তার সঙ্গে যাওয়ার জন্য।

স্বভাবে তিনি একটু পাগলাটে ধরনের এবং অনেকটা রসিক ধাঁচের মানুষ, তার মধ্যে আন্তরিকতার ঘাটতি নেই এক বিন্দুও। আমাকে তিনি সবসময় তার কাছের মানুষ হিসেবে বিবেচনা করেন এবং আমাদের চতুর্থ সেমিস্টার শুরুর আগের দিন নিজের থেকেই একটু প্রশান্তির জন্য কোথাও ঘোরার পরিকল্পনা নিচ্ছিলাম। এমন সময় ইয়োজের থেকে ত্রিয়েস্তে এবং কপার ভ্রমণের পরিকল্পনা পেয়ে নিজেকে আর সামলাতে পারলাম না। আমার বাসা ভিপাভা থেকে চলে গেলাম লুবলিয়ানাতে এবং লুবলিয়ানার সেন্ট্রাল রেলওয়ে স্টেশন থেকে তিনি আমাকে তার গাড়িতে তুললেন। শুরু হলো একদিনের জন্য মধ্য ইউরোপের পানিপথের সফর। ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি সময় এবং একইসঙ্গে শীতের শেষ ও বসন্তের আগমনের প্রাক্কাল হওয়ায় স্লোভেনিয়া, ক্রোয়েশিয়া এবং ইতালির উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় বিভিন্ন জায়গায় কার্নিভালের প্রস্তুতি চলছিল। স্লোভেনিয়া আর ক্রোয়েশিয়াতে সবাই এ সময় এক বিশেষ ধরনের ডোনাট ক্রফি খেয়ে থাকে এবং দোকানগুলোতে এ সময় ক্রফি বিক্রির ধুম পড়ে যায়। রাস্তাঘাট থেকে আরম্ভ করে সব জায়গা এ সময় আলোকসজ্জায় সাজানো হয়। ছোটো বাচ্চারা এ সময় কার্টুন কিংবা বিভিন্ন কমিক চরিত্রের আলোকে নিজেকে সজ্জিত করে। কি ত্রিয়েস্তে, কি কপার কোথাও আনুষ্ঠানিকতার কোনো কমতি ছিল না। তবে যেকোনো উত্সব বা অনুষ্ঠানের আয়োজনে ইউরোপের মধ্যে ইতালিয়ান কিংবা স্প্যানিশদের অথবা পর্তুগিজদের জুড়ি মেলা ভার। তারা আমাদের মতোই অনেকটা আবেগপ্রবণ এবং একইসঙ্গে কিছুটা বাচাল স্বভাবের তবে আন্তরিকও বটে। ত্রিয়েস্তের সেন্টারে যেতে না যেতেই দেখি হাজারো মানুষের সমাগম, সে তুলনায় কপার ছিল অনেকটা ফাঁকা। ইয়োজের বদৌলতে ত্রিয়েস্তে আর কপার ঘোরা হলো এবং এ দুটি জায়গার ইতিহাস নিয়েও একটি ধারণা পেলাম। ত্রিয়েস্তেতে তিনজন বাংলাদেশি ভাইয়ের সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল এবং তাদের পৈতৃক নিবাস বাংলাদেশের সিলেট জেলায়। তাদের আন্তরিকতাও ভুলে যাওয়ার মতো নয়।

কয়েকদিন আগে আবারও ইয়োজের সঙ্গে কথা হলো এবং তিনি আমাকে জানালেন যে তিনি এখন নাকি আর ক্যাসিনোতে যাচ্ছেন না এবং এর পরিবর্তে তিনি আশপাশের দেশগুলোতে ভ্রমণের পরিকল্পনা গ্রহণ করেছেন। তার এ কথা শুনে আমার খুবই ভালো লাগল যে অন্তত একটা মানুষকে একটু হলেও উপকার করতে পেরেছি। আশা করি সামনের দিন হয়তো বা ইয়োজের সঙ্গে আরো কয়েকটি জায়গায় ভ্রমণ করতে পারব এবং এভাবেই আমার সঙ্গে তার বন্ধুত্ব আরো বেশি দৃঢ়তা লাভ করবে।

তবে তৃতীয় সেমিস্টার শেষে চতুর্থ সেমিস্টার শুরুর আগে এরকম একটি ভ্রমণ ছিল সত্যি উপভোগ করার মতো এবং আক্ষরিক অর্থে আমার মন সেদিন নতুন উদ্যমে ভরে উঠেছিল। আসলেই নতুন কোনোকিছুকে জানার উদ্দেশে হোক কিংবা আমাদের মনের সংকীর্ণতাকে দূর করার জন্য হোক—মানুষের জীবনকে সুন্দরভাবে সাজাতে ভ্রমণের বিকল্প নেই। সত্যি এ পৃথিবী আসলেই অনেক সুন্দর এবং তার পরতে পরতে ছড়িয়ে রয়েছে অপার সৌন্দর্য, হয়তো ইউরোপে না এলে কিংবা বিশ্বভ্রমণে বের না হলে ব্যবহারিকভাবে তা কোনোদিন জানাই হতো না।