আবু জাফর ওবায়দুল্লাহর কবিতা ও জিজ্ঞাসা

আপডেট : ১৯ মার্চ ২০২০, ১৯:৪৪

মননে মা আর মাতৃভূমি ধারণ করে বাংলাদেশের বাংলা কাব্যাঙ্গনকে যিনি অনেক দূরে এগিয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন, সাতচল্লিশোত্তর কবিতাকে নতুন গতি দিয়েছেন অনেকেরই মতো, তিনি আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ। কর্মে আমলা, মর্মে সংবেদনশীল কবি তিনি। কাব্যাঙ্গনে সবার দৃষ্টি কেড়েছিলেন ১৯৫৩ সালে—হাসান হাফিজুর রহমান সম্পাদিত ‘একুশে ফেব্রুয়ারী’ সংকলনে ‘কুমড়ো ফুলে ফুলে / নুয়ে পড়েছে লতাটা’ দিয়ে শুরু করা কবিতা লিখে। সে কবিতার কোনো নাম ছিল না। আসলে সংকলনেই কারো কবিতার নাম ছিল না। শামসুর রাহমান, আলাউদ্দিন আল আজাদ, সৈয়দ শামসুল হক, হাসান হাফিজুর রহমানসহ অনেকেই কবিতা লিখেছিলেন। সবার কবিতাই ‘একুশের কবিতা’ শিরোনামে প্রকাশ পেয়েছিল। পরে আবু জাফর ওবায়দুল্লাহর এই কবিতাটি ‘কোনো এক মাকে’ এবং ‘মাগো, ওরা বলে’ দুই নামেই পত্রস্থ হতে দেখা গেছে। বেলাল চৌধুরী সম্পাদিত বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত ‘রচনাসংগ্রহে’ (২০১৪) গৃহীত হয়েছে দ্বিতীয় শিরোনামটি। এই কবিতা আজো প্রতিটি সংবেদনশীল মানুষকে স্পর্শ করে। একজন ভাষাশহিদের পকেটে পাওয়া যায় তার মায়ের লেখা চিঠি, বাড়ি ফিরে আসার তাগিদ—আর এই প্রেক্ষাপটেই কবিতায় উঠে আসে গ্রামীণ অনুষঙ্গ, মা-সন্তানের কথোপকথন, অপত্যস্নেহের ফল্গুধারা আর শেষ অবধি মাতৃদৃষ্টি থেকে জ্বলে ওঠা আগুনে শকুনির প্রতীকে প্রতিপক্ষকে ভস্ম করে দেওয়ার রূপকল্প। এই মাতৃপ্রতিমা ভারতবর্ষীয় প্রত্নসংস্কৃতির উত্তরাধিকার, বাংলার চিরায়ত মাতাসন্তান সম্পর্কে ঈশ্বরী পাটনীর প্রবহমানতা।

এ কবিতাটি স্থান পেয়েছিল কবির প্রথম প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ ‘সাতনরী হার’-এ, ১৯৫৫ সালে। প্রথম কাব্যগ্রন্থে আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ প্রকাশ্য-বৈপ্লবিক কর্মে হয়তো রত সেভাবে ছিলেন না, কিন্তু তিনি ছড়ার ছন্দকে গদ্যছন্দের প্রবহমানতায় গীতল শব্দবন্ধে সারস্বত উচ্চারণে যে কথামুখের বিস্তার করলেন, বাংলাদেশের বাংলা কবিতায় সেটি একটি বিশেষ ধারা হিসেবেই চিহ্নিত হলো। এই ‘সাতনরী হার’ কাব্যগ্রন্থে তিনি সংযুক্ত করলেন সিরিয়ায় জন্মগ্রহণকারী আরবীয় কবি ও দার্শনিক আবুল আলা আল মারি, মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপে যিনি ইবনে সিনা বা অভিসিনা নামে পরিচিত সেই জ্ঞানী, ইংরেজ কবি উইলিয়াম শেক্সপিয়র, ফরাসি কবি ফ্রাঁসোয়া ভিয়োঁ, ইংরেজ কবি এ ই হাউসম্যান-এর কবিতা থেকে প্রাণিত হয়ে লেখা কয়েকটি কবিতাও। ফলে একদিকে বাংলার লোকায়ত ‘কুঁচবরন কন্যা তোমার / মেঘবরন চুল’ যেমন স্থান পেল, তেমনি এল ‘ভেনিসের মেয়ে মধুর-ভাষিণী জানি / রোমের রমণী রমণীয় নাকি আরো’। এভাবেই গ্রামবাংলার কুঁচেরঙের নারী আর প্যারিসের রমণীয় নারী মিলে যায় আকর্ষণের অত্যুঙ্গ চূড়ায়—স্বদেশ থেকে বিশ্বময় কবিদৃষ্টির সম্প্রসারণতা পরিদৃষ্ট হয়। এ সবই মুক্তিযুদ্ধের আগে। মুক্তিযুদ্ধের পরে ‘কমলের চোখ’ (১৯৭৪) কাব্যগ্রন্থে আবু জাফর ওবায়দুল্লাহর কাব্যধারার আরেকটি পর্বের ইঙ্গিত মেলে। ১৯৭১-এর সম্মুখসমরে গুলিতে ডান চোখ হারানো বন্ধু মুক্তিযোদ্ধা কমল সিদ্দিকীকে উপলক্ষ করে লেখা নাম-কবিতায় আশাভঙ্গের বেদনা আছে এবং মধ্যমপুরুষের কাছে বিনীত প্রশ্নের মধ্যেই আছে নীরব দ্রোহের বীজ : ‘কমলের চোখ / রক্ত হূদপিণ্ড / ওরা কেন দিল? / সে প্রশ্ন তোমার নিকট।’ তবে হ্যাঁ, এই পর্বেও আছে মা, মাটি, বৃক্ষ, প্রকৃতির প্রতি কবির চিরায়ত প্রণতি ও অনুরাগ, যে অনুভবটি আবু জাফর ওরায়দুল্লাহর কাব্যদেহে ধমনির মতো ছিল সদাবিস্তৃত।

প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থের নিরিখে বললে বলতে হয়, আবু জাফর ওবায়দুল্লাহর কাব্যসৌধের চূড়া নির্মিত হয়েছিল গত শতকের আশির দশকের সূচনা থেকেই। ‘আমি কিংবদন্তীর কথা বলছি’ (১৯৮১), ‘সহিষ্ণু প্রতীক্ষা’ (১৯৮২), ‘বৃষ্টি ও সাহসী পুরুষের জন্য প্রার্থনা’ (১৯৮৩) এর দৃষ্টান্ত। কিন্তু কাব্য-প্রকাশের কথা সরিয়ে রাখলে বলতে হয়, সত্তরের দশকের মাঝামাঝি থেকেই এই সৌধচূড়ার সার্বিকতা প্রস্তুত। কারণ, আশির দশকের শুরুর তিন বছরে যে তিনটি গ্রন্থ বের হয়েছে তাঁর, অনুমান করি, এ কবিতাগুলোর অনেকটাই সত্তরের দশকের শেষ দিকে লেখা। কারণ, আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ কাব্যকলায় দ্রুতস্রষ্টা নন। বরং কম কিন্তু আরো ভালো, আরো লক্ষ্যভেদী নীতি তাঁর। প্রথম জীবনে কাব্যগ্রন্থ প্রকাশে তাই তিনি সময় নিয়েছেন অনেক বেশি। এ পর্বে আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ আস্থা রেখেছেন বাঙালির সংগ্রামে। তিনি লিখেছেন :‘এখানে শব্দ ক্ষুব্ধ কৃষ্ণচূড়া / বুলেটে বিদ্ধ উষ্ণ রক্তে বোনা / জননী কান্না আমার তোমার ঘৃণা / মিছিলে আগুন এবং সম্ভাবনা :’। এই সম্ভাবনার সূত্রেই কবি ফিরে গেছেন বাঙালির সংগ্রামী অতীতে, যে অতীতে ‘সহিষ্ণু প্রতীক্ষা’ ছিল। কবি সেই সহিষ্ণু প্রতীক্ষা ছিন্ন করে বলেছেন :‘জোয়ান পুরুষেরা কাঁদে কেন? / কান্না পুড়িয়ে ফেলে হিংস্র থাবায় / ছিঁড়তে পারে না কেন রাজার হূদয়?’ কবি তাই সাহসী পুরুষ প্রার্থনা করেছেন এবং চেয়েছেন বৃষ্টি। নিজে প্রাচীনপিতা হিসেবে পূর্বপ্রজন্মের নির্যাতনসহ্যের চিহ্ন এবং সংগ্রামের কথা উল্লেখ করে কবি সকল শুভকে কবিতার সৌন্দর্যে বাঙ্ময় করে তুলে ধরেছেন পরবর্তী প্রজন্মের কাছে। তাই সশস্ত্র সুন্দরের অনিবার্য অভ্যুত্থান তাঁর কামনা, রক্তজবার মতো প্রতিরোধের উচ্চারণে তাঁর আগ্রহ। চারিদিকে যখন ঊষরতা বিরাজিত ছিল, সেই সময় তিনি কামনা করেছেন জননীর কোলে স্তন্যপানরত শিশু আর বৃষ্টির আদরে গর্ভবতী বসুন্ধরার।

আবু জাফর ওবায়দুল্লাহর কবিতার শেষ বাঁকটি বোঝা যায় ‘খাঁচার ভিতর অচিন পাখি’তে (১৯৯৯)। অবশ্য কাব্যগ্রন্থের নামে মনে হতে পারে মরমিধারায় তিনি স্থিতধী। আসলে তা নয়, এটি সত্তরের শেষ ও আশির ধারারই সূক্ষ্ম কিন্তু গগনভেদী প্রকাশ। এর শেষ রেশটা রয়েছে তাঁর মৃত্যুর পরে প্রকাশিত ‘মসৃণ কৃষ্ণ গোলাপ’ (২০০২) কাব্যগ্রন্থের মধ্যে। পাঠকদের অবাক করে দিয়ে কবি ‘ঝাপসা চোখে মা তাকায়’সহ কয়েকটি পঙিক্ত প্রথম কাব্যগ্রন্থ থেকে চয়ন করে শেষ কাব্যগ্রন্থের শেষ কবিতায় (‘গোধূলির জিজ্ঞাসা’) সংস্থাপন করে নিজের কাব্য-মহাপত্রে যেন নিজেই সমাপনী দাগ টেনে গেছেন। শেষে খানিকটা হতাশাই তাঁর চোখেমুখে : বিহঙ্গ তিনি দেখেন না, দেখেন শকুনির অবাধ ওড়াউড়ি!

গদ্য রচনাতেও আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ কবিতাক্রান্ত। স্বল্পাবয়ব তাঁর রচনা কিন্তু আবেগ ও জিজ্ঞাসা সেখানে ভরপুর। স্বদেশের সম্মান আর ঐতিহ্যের সংরক্ষণ তিনি সব সময় চেয়েছেন। নবান্ন, উত্সব, রাখিবন্ধন, দারিদ্র্য, আনন্দ, সংস্কৃতি, সুন্দরবন ইত্যাদি অনুষঙ্গ নিয়ে তিনি লিখেছেন। কিন্তু এগুলো উপলক্ষমাত্র—তাঁর লক্ষ্য সম্প্রীতি, উন্নতি, অগ্রগতি। তাই ঋগ্বেদ থেকে যেমন তিনি উদ্ধৃতি দিয়েছেন, তেমনি তিনি বক্তব্য গ্রহণ করেছেন খলিল জিবরান থেকেও। আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ সেদিন যে জিজ্ঞাসা রেখে গিয়েছিলেন, আজো বোধ করি সে জিজ্ঞাসা আমরা রাখতে পারি, এর উত্তর খুঁজতে পারি এবং এখানেই তাঁর সমকালীন প্রাসঙ্গিকতা :‘আজকে যখন সাম্প্রতিক দ্বেষ-বিদ্বেষে, বিকার-জীর্ণতায় পৃথিবীর মানুষ সন্ত্রস্ত, সেখানে একটিই জিজ্ঞাসা। আমাদের ভবিষ্যতের বিমূর্ত আবাহনী কোন সুরে বাজবে? হূদয়ের অভিষিক্ত সমষ্টির মননের ঐক্যতানে, না দম্ভ, অকারণ তৃষ্ণার অশালীন ব্যক্তি-রসনায়?’

আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ (১৯৩৪—১৯ মার্চ ২০০১)