পৃথিবীর, বিশেষ করিয়া উন্নত দেশগুলিতে সরকারের কিছু তথ্য থাকে যাহা রাষ্ট্রীয় স্বার্থের বিবেচনায় গোপন রাখা হয়। উহাকে বলা হয় ক্লাসিফায়েড ডকুমেন্ট। ঐ সমস্ত সরকারি নথিপত্রে কেবল সংশ্লিষ্ট উচ্চপর্যায়ের সীমিত সংখ্যকের প্রবেশাধিকার থাকে। কোনোক্রমেই উহা যাহাতে উন্মুক্ত না হয়, সেই জন্য সকল ধরনের নিরাপত্তার ব্যবস্থা গ্রহণ করা হইয়া থাকে। আবার ঐ একই তথ্য বা ডকুমেন্টের গোপনীয়তার প্রয়োজন যখন ফুরাইয়া যায় তখন তাহা উন্মুক্ত করিয়া দেওয়া হয়, যাহাকে ইংরেজিতে বলা হয় ডিক্লাসিফায়েড ডকুমেন্ট। ইহা ছাড়া সরকারের সাধারণ কর্মকাণ্ডের সমস্ত তথ্যই জনগণের যেমন পাইবার অধিকার থাকে, তেমনি সরকারগুলিও জনগণকে অথবা প্রচারমাধ্যমে জিজ্ঞাসা অনুসারে স্বতঃস্ফূর্তভাবে জানাইয়া দেয়। লক্ষ করা যায়, ঐ সকল ক্ষেত্রে সরকারগুলি মিথ্যার আশ্রয় নেয় না। তাহার কারণ, প্রায় অযথা মিথ্যার আশ্রয় নিলে ঐ সকল দেশে প্রায় সরকার পতনের মতো অবস্থা তৈরি হইয়া যায়।
কিন্তু উন্নয়নশীল দেশগুলির চিত্র ভিন্ন। যে কোনো ধরনের তথ্য জানাইতেই সরকারের মধ্যে অনীহা লক্ষ করা যায়, যেন ‘ঘরের কথা পরে’ জানিয়া ফেলিল। আরো লক্ষ করা যায়, সরকারগুলি এমনকি জনগণের নিকট মিথ্যা তথ্য দিয়া থাকে হামেশা। এই প্রবণতার প্রধান একটি কারণ হইল, তাহা লইয়া সরকারগুলিকেও বিশেষ চাপে পড়িতে হয় না। কারণ সরকারের নিকট হইতে যাহারা তথ্য আনিতে যান, যাহাদের তথ্য সঠিকভাবে সংগ্রহ করিয়া জনসম্মুখে তুলিয়া ধরিবার কথা, তাহারা অধিকাংশই তৈল মর্দনে ব্যস্ত থাকেন। আর যাহারা তৈল মর্দনের সুযোগ পান না অথবা গ্রহণ করেন না তাহারা সঠিকভাবে স্টাডি করিয়া আসল তথ্যটি বাহির করিয়া আনিবার কৌশলটি অবলম্বন করেন না। ফলে সাধারণ জনগণ অনেকটা অন্ধকারেই থাকিয়া যায়; কখনো-বা সরকারের প্রদত্ত ভুল বা মিথ্যা তথ্যই মস্তিষ্কে ধারণ করিয়া থাকে। উন্নত বিশ্বে আমরা লক্ষ করি, পরাক্রমশালী প্রেসিডেন্টও প্রচারমাধ্যমের সম্মুখে প্রশ্নের জবাব দিতে গিয়া হিমশিম খাইয়া যান; কিন্তু তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলির নেতাদের এই সমস্যা হয় না। কারণ তাহারা যাহা বলেন, শুনিয়া সম্মুখে উপস্থিত প্রচারমাধ্যমকর্মীরা কেবল মাথা দুলাইয়া থাকেন। ইহার ফলে না হয় জবাবদিহিতার সৃষ্টি, আর না জনগণ পায় সঠিক চিত্র। ফলে উন্নয়নশীল দেশে তৈরি হয় না শক্তিশালী, স্বচ্ছ সরকার পরিচালনা। একটি শক্তিশালী গণতন্ত্রের জন্য সরকার ও জনগণের হাতে হাত রাখিয়া অগ্রসর হইতে হয়। আর এই হাতে হাত রাখিবার কাজটিতে বড়ো অবদান রাখে প্রচারমাধ্যম। পাশাপাশি জনগণ এবং সরকার দুই সত্তার দিকেই প্রচারমাধ্যমেরই নিবিড় চোখ রাখিতে হয়। ইহা সত্য যে, উন্নয়নশীল দেশে জনগণের কাছে সত্য প্রকাশ করা একটি চ্যালেঞ্জ। সেই কারণে দেশ যাহারা পরিচালনা করেন তাহারা এই চ্যালেঞ্জটি প্রশ্নের সম্মুখীন না হইলে নিতে চাহেন না; কিন্তু এই চ্যালেঞ্জ গ্রহণ না করিলে শক্তিশালী সরকার তৈরি হয় না। এই সকল বুঝিয়াই দেশ ও জনগণের বৃহত্তর স্বার্থে গণমাধ্যমেরই সরকারকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলিতে হয়।
