দ্রুত শিল্পায়ন ব্যতীত ব্যাপকভিত্তিক কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি এবং দারিদ্র্য সম্ভব নয় এটা অর্থনীতিবিদগণ এক বাক্যে মেনে নিলেও উন্নয়নশীল দেশের জন্য কোন্ ধরনের শিল্পায়ন বেশি উপযোগী সে সম্পর্কে মতান্তর লক্ষ্য করা যায়। বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো জনবহুল এবং তুলনামূলক স্বল্প পুঁজি সংবলিত একটি দেশের শিল্পায়নে কোন পদ্ধতি বেশি কার্যকর তা নিয়ে বিস্তর বিতর্ক রয়েছে। বর্তমানে দেশের জিডিপিতে এসএমই খাতের অবদান ২৫ শতাংশ। ২০২৪ সালের মধ্যে জিডিপিতে এসএমই খাতের অবদান ৩২ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। কিন্তু যেভাবে এসএমই শিল্প খাতে অগ্রগতি সাধিত হচ্ছে তাতে নির্ধারিত এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা খুবই কঠিন হবে। তাই আমাদের বিকল্প চিন্তা করতে হবে। গত ৫ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে জারিকৃত এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে এসএমই খাতের সংজ্ঞায় ব্যাপক পরিবর্তন সাধন করা হয়েছে। কটেজ অ্যান্ড মাইক্রো শিল্পকে এসএমই খাতে অন্তর্ভুক্ত করে এই খাতের নতুন নামকরণ করা হয়েছে, ‘কটেজ, মাইক্রো, স্মল অ্যান্ড মিডিয়াম এন্ট্রারপ্রাইজ (সিএমএসএমই) খাত। এতে কুটির ও মাইক্রো শিল্পের উদ্যোক্তাদের পক্ষে এসএমই খাতের জন্য প্রদেয় সুবিধা ভোগ করার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। এদিকে মন্ত্রিপরিষদের এক সভার সম্প্রতি এসএমই খাতের জন্য জামানতবিহীন ঋণদানের প্রস্তাব অনুমোদিত হয়েছে। এসএমই খাতের সম্প্রসারণ এবং জামানতবিহীন ঋণদানের উদ্যোগ গ্রহণের ফলে এ খাতের উদ্যোক্তাদের সৃষ্টিশীলতায় আরো বেশি মাত্রায় মনোযোগী হওয়ার পথ সুগম হয়েছে। বাংলাদেশের উদ্যোক্তারা সৃষ্টিশীল এবং নতুন নতুন উদ্ভাবনী শক্তির অধিকারী। কিন্তু তারা প্রতিনিয়তই পুঁজি স্বল্পতায় ভোগে। বিশেষ করে ফরমাল সেক্টর থেকে আর্থিক সহায়তা প্রাপ্তির ক্ষেত্রে তারা দুর্ভোগের শিকার হয়ে ইনফরমাল সেক্টর থেকে উচ্চ সুদে ঋণ গ্রহণে বাধ্য হন। মন্ত্রী পরিষদের সভায় গৃহীত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হলে গ্রামীণ এলাকার ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের পুঁজি স্বল্পতার সমস্যা অনেকটাই উত্তরণ ঘটবে। চলতি অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে ‘স্টার্ট আপ বিজনেস’ নামে একটি নতুন খাত সৃষ্টি করে তাতে ১০০ কোটি টাকা প্রাথমিক বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। চাহিদার প্রেক্ষিতে এই বরাদ্দ আরো বাড়ানো হতে পারে।
এখন প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশের মতো অত্যধিক জনবহুল এবং স্বল্প উদ্বৃত্ত পুঁজির একটি দেশে কোন ধরনের শিল্পায়ন বেশি উপযোগী? অনেকেই মনে করেন, বাংলাদেশের মতো একটি দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন দ্রুততর করতে হলে সিএমএসএমই খাতের ওপরই বেশি জোর দিতে হবে। বাংলাদেশের চলমান অর্থনৈতিক টেকসই এবং কার্যকর করতে হলে এসএমই খাতের বিকাশে সবচেয়ে বেশি জোর দিতে হবে। গ্রাম পর্যায়ে সিএমএসএমই খাতের ব্যাপক বিস্তার ঘটাতে হবে। গ্রাম পর্যায়ে সিএমএসএমই খাতের ব্যাপক সম্প্রসারণ ঘটাতে হলে ‘ওয়ান ভিলেজ, ওয়ান প্রোডাক্ট’ (ওভিওপি) অত্যন্ত কার্যকর বলে বিবেচিত হতে পারে। ওয়ান ভিলেজ, ওয়ান প্রোডাক্ট বা ওভিওপি হচ্ছে ভৌগোলিক নির্দেশক পণ্যভিত্তিক শিল্পায়ন প্রচেষ্টা। প্রত্যেকটি এলাকা কোনো না কোনো পণ্যের জন্য বিখ্যাত। এমন অনেক পণ্য আছে যা সংশ্লিষ্ট এলাকার নামের সঙ্গে একাকার হয়ে গেছে। এসব ভৌগোলিক নির্দেশক পণ্যভিত্তিক শিল্প গড়ে তোলা হলে দেশের সব অঞ্চলের দ্রুত অর্থনৈতিক উন্নয়ন সাধিত হতে পারে। এসব এলাকায় পরিকল্পিতভাবে সিএমএসএমই শিল্প স্থাপন করা হলে স্থানীয়ভাবে প্রয়োজনীয় কাঁচামালের জোগান নিশ্চিত করা যাবে। তুলনামূলক স্বল্প পুঁজির এসব শিল্পে বিনিয়োগ করে যে কেউ চেষ্টা করলেই নিজেকে উদ্যোক্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে পারেন।
গ্রামের উদ্বৃত্ত পুঁজি গ্রামে বিনিয়োগ না হয়ে শহরে চলে আসছে। ফলে গ্রাম ও শহরের মধ্যে বিদ্যমান অর্থনৈতিক বৈষম্য ক্রমশ বাড়ছে। সারা দেহের রক্ত মুখমণ্ডলে এসে জমা হলে তাকে যেমন সুস্থ্যতা বলা যায় না তেমনি অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড শুধু শহরে কেন্দ্রীভূত হলে সেটা সুষম উন্নয়নের কৌশল নয়। আমাদের যে কোনো মূল্যেই হোক এই অবস্থা থেকে উত্তরণ ঘটাতে হবে। আর এজন্য সবচেয়ে সহজ উপায় হতে পারে ‘ওয়ান ভিলেজ, ওয়ান প্রোডাক্ট অ্যাপ্রোচ।’ এই পদ্ধতি কাজে লাগানো হলে প্রতিটি গ্রামেই কর্মচাঞ্চল্য সৃষ্টি হবে। গ্রামের দরিদ্র মানুষকে আর কর্মসংস্থানের জন্য শহরমুখী হতে হবে না।
‘ওয়ান ভিলেজ, ওয়ান প্রোডাক্ট অ্যাপ্রোচ জাতীয় শিল্পনীতির পরিপন্থি নয় বরং সহায়ক। শিল্প মন্ত্রণালয় থেকে প্রণীত ‘জাতীয় শিল্পনীতি-২০১৬’র অধ্যায় ৫-এর অনুচ্ছেদ ৫.১২-তে এ বিষয়ে সুষ্পষ্ট ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, ‘এসএমই উদ্যোক্তা সৃষ্টি ও উন্নয়নে ‘ওয়ান ভিলেজ, ওয়ান প্রোডাক্ট’ নীতি গ্রহণ করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।’ কাজেই ‘ওয়ান ভিলেজ, ওয়ান প্রোডাক্ট’ অ্যাপ্রোচ জাতীয় শিল্পনীতির সঙ্গে অত্যন্ত সামঞ্জস্যপূর্ণ। ট্রেডিশনাল ব্যাংক এবং অন্যান্য অর্থায়নকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে এই খাতে প্রয়োজনীয় ঋণ ও অর্থায়নের জন্য উদ্বুদ্ধ করতে হবে। স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু শহর ও গ্রামের অর্থনৈতিক বৈষম্য দূরীকরণের জন্য ব্যাংক অর্থায়নের ক্ষেত্রে এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ গ্রহণের চিন্তা করেছিলেন। তিনি গ্রামের উদ্বৃত্ত পুঁজি যাতে শহরে চলে না আসে এবং গ্রামেই বিনিয়োজিত হয় সে লক্ষ্যে গ্রামাঞ্চলে ব্যাংক ঋণের সুদের হার শহরের তুলনায় কিছুটা কম রাখার চিন্তা করেছিলেন। অন্যদিকে গ্রামীণ আমানতকারীদের তুলনামূলক বেশি সুদ প্রদানের ব্যবস্থা করেছিলেন, যাতে গ্রামের উদ্বৃত্ত পুঁজি শহরে চলে না আসে। প্রতিবছর যে বিপুল পরিমাণ রেমিটেন্স আসছে তার বেশির ভাগই সঞ্চারিত হয় গ্রামীণ অর্থনীতিতে। কিন্তু গ্রামে বিনিয়োগের উপযুক্ত ক্ষেত্র না থাকায় রেমিটেন্স, যা গ্রামীণ অর্থনীতিকে স্ফীত করছে তা পুনরায় শহরে চলে আসছে। এই ক্যাপিটাল ফ্লাইট রোধ করার জন্য হলেও গ্রামীণ অর্থনীতিতে বিনিয়োগের বিকল্প সুযোগ তৈরি করতে হবে।
বাংলাদেশ রাষ্ট্রীয়ভাবে ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত দেশে পরিণত হতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এই প্রতিশ্রুতি পূরণ করতে হলে আমাদের অবশ্যই অর্থনৈতিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত এবং টেকসই করতে হবে। একই সঙ্গে শহর ও গ্রামের মাঝে বিদ্যমান অর্থনৈতিক বৈষম্য দূর করতে হবে। বর্তমানে গ্রামের উদ্যোক্তারা প্রধানত মাইক্রো ফাইন্যান্স ইনস্টিটিউশন (এমএফআই) থেকে পুঁজি সংগ্রহ করে থাকেন। কিন্তু সেখানে তাদের অতিমাত্রায় উচ্চ হারে সুদ প্রদান করতে হয়। বর্তমানে এমএফআইগুলো ২৪ শতাংশ হারে সুদারোপ করে থাকে। ফলে তাদের পক্ষে জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রতিযোগীদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে কুলিয়ে ওঠা সম্ভব হয় না। সহজ শর্তে তুলনামূলক স্বল্প সুদে ঋণ প্রাপ্তির অভাবে সম্ভাবনাময় অনেক উদ্যোক্তার প্রতিষ্ঠিত হওয়ার স্বপ্ন অঙ্কুরেই বিনষ্ট হয়ে যায়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বারবার বলেছেন, তরুণরা চাকরি প্রত্যাশী হবে না তারা চাকরিদাতা হবে। তার এই বক্তব্যের মূল সুর হচ্ছে গ্রামীণ উদ্যোক্তা বিকাশের ব্যবস্থা করা। বাংলাদেশ সাম্প্রতিক সময়ে অর্থনৈতিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে বিস্ময়কর সাফল্য অর্জন করে চলেছে। এই অর্জনকে টেকসই এবং আরো গতিশীল করতে হলে গ্রামীণ উদ্যোক্তা উন্নয়ন ও বিকাশের কোনো বিকল্প নেই। এই লক্ষ্য পূরণের জন্য আমাদের শিল্পায়ন নীতি এবং কৌশল ঢেলে সাজাতে হবে।
n লেখক :অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংকার ও অর্থনীতিবিষয়ক কলাম লেখক
