কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণ

আপডেট : ২০ মার্চ ২০২০, ১৯:৩৬

প্রতিদিন মানুষ তিন প্রকার খাদ্য গ্রহণ করে থাকে—ফ্যাট, প্রোটিন ও কার্বোহাইড্রেট। এই তিনটি উপাদানের মধ্যে ফ্যাট সর্বোচ্চ শক্তি দান করে (৯ ক্যালরি/গ্রাম)। আমরা গড়ে প্রতিদিন ৪০০ গ্রাম ফ্যাট, ১০০ গ্রাম প্রোটিন ও ১০০ গ্রাম কার্বোহাইড্রেট গ্রহণ করি। ফ্যাট বা স্নেহ বা চর্বি জাতীয় দ্রব্যকে মানবদেহের শত্রু ভাবা হলেও দেহের গঠন ও স্বাভাবিক কর্মকাণ্ডে ফ্যাটের ভূমিকা অনন্য। ফ্যাট বা স্নেহ বা চর্বি জাতীয় দ্রব্যের কাজ হলো—দেহের গঠনে সহায়তা করা এবং দেহের গড়ন রক্ষা করা, দেহের প্রতিটি কোষে আবরণ তৈরি করা, দেহের নিয়মিত কাজে সহায়তা করা, দেহের খাদ্য ও শক্তির ভান্ডার হিসেবে কাজ করা এবং দেহের বিভিন্ন অঙ্গকে সঠিক অবস্থানে ধরে রাখা।

বিভিন্ন রোগে স্নেহ / চর্বি পদার্থের ভূমিকা হলো :স্নেহ জাতীয় পদার্থ দেহের জন্য অত্যাবশ্যক। কিন্তু পরিমাণে বেশি হলেই বিপর্যয় ঘটে। দেহ খাদ্যের মাধ্যমে যে স্নেহ পদার্থ গ্রহণ ও কাজ করে তা খরচ করায় বৈষম্য হলে বিভিন্ন সমস্যা দেখা দিতে পারে। গড়ে আমরা প্রতিদিন যে পরিমাণ খাদ্য খাই তার মধ্যে ১৫ শতাংশ ফ্যাট থাকে। এই ফ্যাট খাদ্যনালিতে বিপাকের পর রক্ত সংশোধনের পর লিভারে যায়। লিভারে কিছু পরিবর্তনের পর আবার রক্তনালি দিয়ে দেহের বিভিন্ন কোষে পৌঁছে। দেহের সব চর্বি বা কোলেস্টেরল আমরা খাবারের মাধ্যমে পাই না। কোলেস্টেরল চর্বি জাতীয় একটি পদার্থ, মাত্র ৩০ শতাংশ কোলেস্টেরল আসে খাবার থেকে, বাকি ৭০ শতাংশ আসে লিভার থেকে। কোলেস্টেরল প্রধানত : চার ধরনের হয়ে থাকে। এর মধ্যে একমাত্র এইচডিএল মানব দেহের জন্য উপকারী। অন্যগুলো (এলডিএল, টিজি ও ভিএলডিএল) লাভের চেয়ে ক্ষতি বেশি করে থাকে।

এইচডিএল :একমাত্র দেহবান্ধব কোলেস্টেরল হচ্ছে এইচডিএল (HDL)। ভালো বা ভদ্র কোলেস্টেরল হিসেবেও এর পরিচিতি রয়েছে। শরীরের অতিরিক্ত কোলেস্টেরলকে ধরে ধরে লিভারে নিয়ে যায়। লিভারে গিয়ে কোলেস্টেরল ভেঙে যায়। এইচডিএলের পরিমাণ যত বেশি হূদেরাগের ঝুঁকি তত কম।

এলডিএল :এলডিএল লিভার থেকে রক্তনালি ও অন্যান্য অংশে কোলেস্টেরল নিয়ে যায়। অতিরিক্ত কোলেস্টেরল রক্তনালিতে জমে জমে প্লেক তৈরি করে। এই প্লেক পর্যায়ক্রমে রক্তনালিকে বন্ধ করে দেয়। তখনই হার্ট অ্যাটাক হয়। তাই হার্ট অ্যাটাকের মতো জটিল ও জীবন সংহারী অবস্থা থেকে রক্ষা পেতে হলে এলডিএল কমাতে হবে।

ট্রাইগ্লিসারাইড :ট্রাইগ্লিসারাইড খাবার থেকে শক্তি সংগ্রহ করে জমা রাখে। স্থূলতা, শ্রমহীনতা, ধূমপান, মদ্যপান এবং অতিরিক্ত চিনিযুক্ত খাবার গ্রহণের কারণে ট্রাইগ্লিসারাইডের পরিমাণ বৃদ্ধি পায়।

কোলেস্টেরলের উত্স :বিভিন্ন বাণিজ্যিক বিজ্ঞাপনে ভুল তথ্য দিয়ে মানুষকে অহরহ প্রতারণা করা হচ্ছে। ভোজ্য তেলের বিজ্ঞাপনে খুব গর্ব করে বলা হচ্ছে—এই তেল কোলেস্টেরল মুক্ত। অথচ প্রাণীদেহ ছাড়া অন্য কোথাও কোলেস্টেরল  তৈরি হতে পারে না। আমাদের দেহের মধ্যে যতটুকু কোলেস্টেরল  আছে তার ৭০ শতাংশ আমাদের লিভার থেকে আসে, বাকি ৩০ শতাংশ অন্যান্য প্রাণিজ উত্স (মাছ, মাংস, ডিম, লিভার, মগজ, গিলা ইত্যাদি) থেকে আসে। গাছ থেকে কোলেস্টেরল আসে না।

রোগের সঙ্গে কোলেস্টেরলের সম্পর্ক-

অতিরিক্ত এলডিএল বা কম এইচডিএল বা  বেশি  ট্রাইগ্লিসারাইড থাকলে কিছু কিছু জটিল রোগ হতে পারে। আবার কিছু রোগের জটিলতা বৃদ্ধি পায়। যেমন—ইসকেমিক হার্ট ডিজিজ,  স্ট্রোক, উচ্চ রক্তচাপ, কিডনি ফেইলুর, শ্বাসকষ্ট, সন্তানহীনতা ইত্যাদি।

কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে যা করতে হবে :

জীবন যাত্রার পরিবর্তন আনতে হবে, পরিমিত ওষুধ গ্রহণ করতে হবে।

জীবন যাত্রার পরিবর্তন :দৈহিক ওজন আদর্শ মাত্রায় রাখতে হবে। ৫-১০ শতাংশ দৈহিক ওজন কমালে কোলেস্টেরলের মাত্রা উল্লেখযোগ্য মাত্রায় কমে যায়। দৃঢ় প্রতিজ্ঞ চিত্তে পরিকল্পনা করে অন্যান্য প্রক্রিয়ার সঙ্গে ওজন কমানোকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিতে হবে। পরিমিত খাবার গ্রহণ ও দৈহিক পরিশ্রম ও ব্যায়ামের মাধ্যমে ওজন আদর্শ মাত্রায় আনতে হবে। মাসে দুই কেজি পর্যন্ত ওজন কমানোই যথেষ্ট। পাঁচ ফুট উচ্চতার জন্য আদর্শ ওজন হচ্ছে ৫৫ কেজি। প্রতি ইঞ্চি উচ্চতা পরিবর্তনে দুই কেজি ওজন হ্রাস বা বৃদ্ধি পেতে পারে।

স্বাস্থ্যকর খাবার :খাদ্যতালিকা থেকে যেসব খাবার বাদ দিতে হবে বা খুব কম খেতে হবে যেমন-ফাস্ট ফুড (বার্গার, পেটিস, হটডগ, রোস্ট মাংস ও চকোলেট), ননিযুক্ত দুধ ও দুগ্ধজাতসামগ্রী, গিলা, কলিজা, মাথা, ডিমের কুসুম, লাল মাংস (গরুর গোশত), প্যাকেটজাত মাছ, মাংস ও ভাত, বিস্কুুট, চিপস ও কেক, প্যাকেট জুস, কোলা ও মাখন, সাদা চাল, সাদা আটা ও সাদা চিনি ইত্যাদি।

যেসব খাবার খেতে হবে :শাক-সবজি, টমেটো, শসা, খিরা, কপি, সালাদ ও গাজর, লাল চাল ও লাল আটা, সামুদ্রিক মাছ ও ইলিশ মাছ।

নিয়মিত ব্যায়াম ও কায়িক শ্রম :

চিকনা-মোটা নির্বিচারে প্রাপ্তবয়স্ক সবাইকে কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য ব্যায়াম করতে হবে। চিকিত্সকের পরামর্শক্রমে প্রতিদিন অন্তত ৩০ মিনিট ব্যায়াম করতে হবে। হাঁটা, হালকা ব্যায়াম, সাঁতার কিংবা যোগব্যায়াম যেভাবেই হোক ব্যায়াম করতেই হবে। সুবিধামতো খেলাধুলা করা যাবে।

কিছু সহজ কাজ করা যায়—

খাবারের আগে ৫-১০ মিনিট হাঁটাহাঁটি করা, লিফ্ট ব্যবহারের পরিবর্তে মাঝে মাঝে সিঁড়ি ব্যবহার করা, দীর্ঘ সময় বসে না থেকে মাঝে মাঝে হাঁটাহাঁটি ও হাত-পা নাড়াচাড়া করা, বাইসাইকেল বা ফিক্সড সাইকেল চালানো এবং রাতে কম খাওয়া।

ধূমপান, মদ্যপান না করা:ধূমপান এবং মদ্যপান করা যাবে না। এসব বদ অভ্যাস থাকলে আজই ত্যাগ করুন।

সামাজিক জীবনযাপন :সামাজিক জীবনযাপন সুস্বাস্থের জন্য সহায়ক। প্রতি মাসে কমপক্ষে চার দিন সামাজিক অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করা উচিত। সামাজিক কর্মসূচিতে হাঁটাহাঁটি ও আলোচনার সুযোগ থাকে। দৈহিক ও মানসিকভাবে প্রফুল্ল থাকার পাশাপাশি ক্যালরি খরচও হয়।

ধর্মীয় কাজে অংশগ্রহণ :ধর্মীয় বিধিবিধান মেনে চললে মানুষের জীবন ছন্দময় হয়। পরিমিত খাবার গ্রহণ, পরিশ্রম, জ্ঞান অর্জন, প্রয়োজনীয় বিশ্রাম, পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন থাকা এবং পরোপকার ইত্যাদি শিক্ষা আমরা ধর্ম থেকেই পেয়ে থাকি যা পারিবারিক ও সামাজিক চর্চায় বিস্তৃতি লাভ করে। পরিমিত খাদ্য গ্রহণ কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণের অন্যতম উপায়।

পরিমিত ওষুধ গ্রহণ :জীবনযাত্রার পরিবর্তনের পাশাপাশি প্রয়োজন হলে চিকিত্সকের পরামর্শক্রমে কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণের জন্য পরিমিত ওষুধ গ্রহণ করতে হবে। সাধারণত দীর্ঘ সময় ওষুধ খেতে হয়। চিকিত্সকের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে ওষুধ চালিয়ে যেতে হবে।

শেষ কথা : মানুষের জীবনকাল সীমিত। এই নির্দিষ্ট ও পূর্বনির্ধারিত সময়ের মধ্যেই সব দায়দায়িত্ব পালনে সচেষ্ট হতে হয়। মানব জীবনের মিশন সফলভাবে শেষ করার জন্য দৈহিক ও মানসিক সুস্থতা প্রয়োজন। সুস্থতার জন্য কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণ করে সঠিক মাত্রায় রাখতে হবে। জীবনযাত্রার পরিবর্তনের মাধ্যমে এবং সেই সঙ্গে প্রযোজ্যক্ষেত্রে ওষুধগ্রহণের মাধ্যমে কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। গতিময়তার জন্য জীবনযাত্রার পরিবর্তন ধারাবাহিকভাবে চালাতে হবে। আদর্শ জীবনের কোনো বিকল্প নেই।

 

nঅধ্যাপক ডা: লিয়াকত হোসেন তপন

অধ্যক্ষ, শেখ সায়েরা খাতুন মেডিক্যাল কলেজ, গোপালগঞ্জ

চেম্বার: মেডিনোভা মেডিক্যাল

সার্ভিসেস লি:উত্তরা শাখা, ঢাকা