গণপিটুনি ও মুদ্রার অপর পিঠ

আপডেট : ২০ মার্চ ২০২০, ২১:৩১

দেশে প্রায়শই আমরা গণপিটুনিতে হত্যার মতো দুর্ভাগ্যজনক ঘটনা দেখিতে পাই। সম্প্রতি নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে স্বপ্ন মিয়া নামে একজনকে গণপিটুনিতে নিহত করিয়াছে এলাকাবাসী। অভিযোগ, ডাকাতির প্রস্তুতিকালে জনতা ধাওয়া করিলে অন্যরা পালাইয়া গেলেও স্বপ্ন মিয়া জনতার হাতে ধৃত হন। আইন হাতে তুলিয়া লইয়া এহেন গণপিটুনিতে হত্যার ঘটনা নূতন কিছু নহে। বহুকাল যাবত্ ছেলেধরা সন্দেহে, ডাকাত-চোর সন্দেহে এবং নানাবিধ গুজবের উপর ভিত্তি করিয়া নিষ্ঠুরভাবে গণপিটুনি অতঃপর হত্যার ঘটনা আমরা দেখিয়া আসিতেছি। ২০১১ সালে শবেবরাতের রাত্রিতে গণপিটুনিতে পাঁচ ছাত্র হত্যা অথবা গুজবের উপর ভিত্তি করিয়া এক শিশুর মা তাসলিমা বেগম রেণুকে হত্যার ঘটনা দেশবাসীকে বিশেষভাবে নাড়া দিয়াছে। খোঁজ লইয়া জানা গিয়াছে, গত দুই দশকে দেশে গণপিটুনিতে তিন শতাধিক মানুষের মৃত্যু হইয়াছে। নিঃসন্দেহে ইহা একটি নিষ্ঠুরতা। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা গিয়াছে গণপিটুনিতে হত্যার শিকার একজন নিরীহ মানুষ। কিন্তু এই নিষ্ঠুরতা থামা তো দূরের কথা, গণপিটুনির প্রবণতা কমেনি। কোনো কোনো ক্ষেত্রে গণপিটুনির সুযোগ লইয়া পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটিয়াছে বলিয়াও অভিযোগ রহিয়াছে। কারণ, সাধারণত দেখা যায় আমাদের মতো দেশগুলিতে গণপিটুনিতে হত্যার ঘটনার বিচার হয় না। ব্যক্তির বিচার সম্ভব, কিন্তু ‘জনতা’র বিচার হইবে কী করিয়া! সম্প্রতি ভারতের উচ্চ আদালত গণপিটুনিকে ‘জঘন্য অপরাধ’ বলিয়াছেন। দেশটি ইহা লইয়া কিছু সুনির্দিষ্ট আইন তৈরির পথে হাঁটিতেছে। কিন্তু বাংলাদেশে গণপিটুনিসংক্রান্ত কোনো সুনির্দিষ্ট আইন নাই। খোঁজ লইয়া জানা গিয়াছে, বাংলাদেশের দণ্ডবিধিতে গণপিটুনি বলিয়া কোনো শব্দ নাই। তবে উচ্চ আদালতের একটি বেঞ্চ সম্প্রতি গণপিটুনি বিষয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে পাঁচটি নির্দেশনা দিয়াছেন। তাহার মধ্যে ঘটনা সংশ্লিষ্ট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার এফআইআর লওয়া বাধ্যতামূলক এবং গণপিটুনি বিষয়ে প্রচারের বিষয়গুলি খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

তবে মুদ্রার উলটা পিঠও রহিয়াছে। যখন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রতি আস্থার অভাব দেখা দেয় তখন মানুষের মধ্যে আইন হাতে তুলিয়া লইবার প্রবণতা সৃষ্টি হয়। এমন ঘটনাও আমাদের দেশে সচরাচর যে, একটি ঘটনা ঘটিবার পর ক্ষতি মানিয়া লয়, তথাপি থানায় অভিযোগ লইয়া যায় না। যদিও সম্প্রতি অবস্থার খানিকটা পরিবর্তন হইতেছে, কিন্তু মানুষের পূর্ণ আস্থা এখনো তৈরি হয় নাই। পৃথিবীর উন্নত দেশগুলি ইহার প্রকৃষ্ট উদাহরণ। গণপিটুনির সঙ্গে তাহারা একেবারেই পরিচিত নহে। কারণ সেই সকল দেশে  আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রতি মানুষের ন্যূনতম আস্থা রহিয়াছে। সুতরাং ইহা লইয়া শুধু জনতার দিকে অঙ্গুলিনির্দেশ করিলেই চলিবে না। আমরা মনে করি, জনগণ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মধ্যে আস্থার সম্পর্ক তৈরি হইলেই গণপিটুনির মতো দুর্ভাগ্যজনক ঘটনা লাঘব হইবে। সেই সঙ্গে জনগণের শিক্ষা, সহিষ্ণুতা বৃদ্ধিও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, বলা হইয়া থাকে, একটি দেশের পুলিশ তথা আইনশৃঙ্খলা বাহিনী হইল সেই দেশেরই জনগণের আয়না—প্রতিচ্ছবি।