করোনা ভাইরাস আক্রান্ত কভিড-১৯ রোগ বিস্তারের আতঙ্কে প্রায় সমগ্র বিশ্বই লক-ডাউন হয়ে স্থবিরপ্রায়। ধর্মীয় দৃষ্টিকোণে ভীতি বা শঙ্কা কাটাতেই এ প্রবন্ধের অবতারণা।
রোগের উদ্ভব আর বিস্তার সৃষ্টিজগতের বৈশিষ্ট্য:
লাখ লাখ বরং কোটি কোটি মানুষ প্রতিদিন পৃথিবীতে রোগাক্রান্ত হচ্ছে। যেকোনো বড় হাসপাতালে গেলে রোগীর আধিক্য দেখে মনে হবে পৃথিবীর তাবৎ মানুষই বুঝি রোগাক্রান্ত। পাশ্চাত্য এবং বিশ্বের ধনী দেশগুলোতে উন্নত চিকিৎসাব্যবস্থা আছে বটে কিন্তু তৃতীয় বিশ্ব বা স্বল্পোন্নত দেশগুলোতে চিকিৎসা সেবার মান বেশ দুর্বল। ফলে লাখ লাখ মানুষ দরিদ্র আর চিকিৎসার ভালো ব্যবস্থা না থাকার কারণে রোগাক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়তে থাকে।
এসব দেশের হাসপাতালগুলোর বড্ড করুণ দশা, সেখানে মানুষ চিকিৎসার জন্য গেলেও আধুনিক ব্যবস্থা না থাকার কারণে সঠিক চিকিৎসা পায় না। ক্ষেত্র বিশেষে চিকিৎসার ব্যবস্থা থাকলেও হয়তো সময়মত ডাক্তার পাওয়া যায় না ফলে প্রয়োজনের সময় মানুষ সঠিক চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হয়।
আরোগ্য লাভ আল্লাহতায়ালার দয়ার ওপর নির্ভরশীল:
লাখ লাখ এমন মানুষও আছে, যারা সময়মতো উপযুক্ত চিকিৎসা পায় আর আরোগ্য লাভ করে। আবার অনেকে আছে যাদের আয়ুষ্কাল ফুরিয়ে এলে যতই উন্নত চিকিৎসা করা হোক না কেন তারা নিয়তির কাছে হার মানতে বাধ্য। আবার অনেকে এমন আছে যারা নিজেদের ভুলের কারণে অসুস্থ্য হয়ে পড়ে। বাহ্যিকভাবে সুঠামদেহী এবং কমবয়স্ক হওয়া সত্ত্বে ও এমন রোগ-ব্যাধির শিকার হয় যা ধীরে ধীরে ভয়ঙ্কর রূপ ধারণ করে, সব ধরনের চিকিৎসা এবং চেষ্টা-তদবীর করা সত্বেও তারা প্রাণে বাঁচতে পারে না।
কিন্তু, পৃথিবীতে এমনও অনেক মানুষ আছে যাদের চিকিৎসা করানোর মতো সাধ্য বা সামর্থ কোনটিই নেই। অনেক ক্ষেত্রে, রোগীর বেঁচে থাকার মতো কোনো সম্ভাবনা আছে বলে মনে না, হলেও খোদা তা’লার দয়ায় তারা বেঁচে যায়। এত্থেকে প্রমাণ হয় যে, মানুষ যত চেষ্টাই করুক না কেন খোদার কৃপা না হলে কেউ আরোগ্য লাভ করতে পারে না। আর খোদার দয়া হলে বিনা চিকিৎসায়ও মানুষ পূর্ণ সুস্থ হয়ে উঠে।
রোগ নিরাময়ের চিকিৎসাপদ্ধতি উদ্ভাবন আল্লাহতায়ালারই বিশেষ অনুগ্রহ:
মহানবী (দ.)-এর বিভিন্ন হাদীস এবং তাঁর জীবনী থেকে বিভিন্ন ঘটনার উল্লেখ করে খোদার দয়া এবং অনুগ্রহেই যে মানুষ আরোগ্য লাভ করে তেমনই কয়েকটি ঘটনা এখানে তুলে ধরা হচ্ছে।
আল্লাহতায়ালার একটি গুণবাচক নাম হচ্ছে ‘শাফী’ বা আরোগ্যদাতা। কেবল মানুষই নয় বরং সব প্রাণী, জীব-জন্তু এবং পশুপাখি ও জড়জগত সব কিছুরই নিরাময়দাতা তিনিই। বর্তমানে মানুষ গবেষণা করে জীবজন্তু এবং উদ্ভিদ’-এর বিভিন্ন রোগ-ব্যাধি নির্ণয়ের চেষ্টা করে থাকে আর সে প্রচেষ্টার ফলস্বরূপ খোদাতায়ালা তাদেরকে চিকিৎসা পদ্ধতি শিখান।
চিকিৎসায় সাফল্য লাভে বড়াই করা অনুচিত:
খোদাতায়ালা মানুষকে ব্যাধিমুক্ত করতে এ জগতে কতই না আয়োজন করেছেন। বরং আল্লাহ তাঁর অন্যান্য সৃষ্টির সেবায়ও মানুষকেই নিয়োজিত করেছেন। বিভিন্ন দেশে প্রাণী জগতের চিকিৎসা এবং তাদের সেবার পেছনে বেশ বড় অংক ব্যয় করা হয়ে থাকে। বর্তমানে বিভিন্ন রোগের নতুন নতুন ওষুধ আবিষ্কৃত হচ্ছে, অস্ত্রপচারের অত্যাধুনিক এবং স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তিও উদ্ভাবিত হচ্ছে।এসব চিকিৎসা এবং অপারেশনের ফলে মানুষ আশানুরূপ আরোগ্যও লাভ করছে। এই সফলতার মূল কারণ হচ্ছে খোদাপ্রদত্ত জ্ঞান ও বিবেক-বুদ্ধির সফল প্রয়োগ। উন্নত বিশ্বে, বর্তমানে আরোগ্যের হার যে মাত্রায় বৃদ্ধি পেয়েছে পূর্বকালে কোনোক্রমেই এটি সম্ভব ছিল না। তারপরও আল্লাহতায়ালা মানুষের সামনে একটি বিষয় সুস্পষ্ট করে থাকেন যে, সত্যিকার ‘শাফী’ বা আরোগ্যদাতা তিনিই। অনেক সময় চিকিৎসকরা চিকিৎসা সম্পর্কে শতভাগ নিশ্চিত হওয়া সত্বেও রোগী মারা যায়। তাই এ ব্যাপারে ডাক্তারদের দৃষ্টি রাখা উচিত, কোনো প্রকারেই যেন নিজের বড়াই প্রকাশ না পায়।
রোগের কষ্ট থেকে পরিত্রাণদাতা স্বয়ং আল্লাহতায়ালা:
মহানবী (সা.) এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘রোগের কষ্ট থেকে মূলতঃ আল্লাহতায়ালাই মুক্তি দিয়ে থাকেন।’
চিকিৎসকদের উচিত রোগীদের মনোযোগ দোয়ার প্রতি নিবদ্ধ করা:
প্রত্যেক ডাক্তার এবং গবেষকের উচিত মানুষের প্রতি সহানুভূতিশীল হয়ে তাদের চিকিৎসা করা এবং তাদের কষ্ট লাঘব করার সম্ভাব্য সব উদ্যোগ নেয়া।
দোয়ার কল্যাণে আরোগ্য লাভের কয়েকটি উদাহরণ:
হজরত সা’দ (রা.) বর্ণনা করেন, “একবার আমি অসুস্থ হয়ে পড়লে মহানবী (দ.) আমাকে দেখতে আসেন। তিনি (দ.) তাঁর নিজ হাত আমার বুকের উপর রাখেন। এক পর্যায়ে আমি তাঁর হাতের শীতলতার পরশ আমার বুকে অনুভব করলাম। তারপর তিনি (দ.) বলেন, ‘তোমার হৃদরোগ হয়েছে; তুমি সাকীফ গোত্রের হালীফ হারেস বিন কালদাহ্’র কাছে যাও, কেননা সে একজন চিকিৎসক। তাকে বল, সাতটি আজওয়া খেজুর (খেজুরের এক বিশেষ প্রজাতি) বিচিসহ পিষে তা দিয়ে ওষুধ প্রস্তুত করে তোমার মুখে দিতে।”
হজরত সাঈদ বিন যায়েদ (রা.) বলেন, ‘মহানবী (দ.)-কে বলতে শুনেছি, মাশরুমের পানি চোখের জন্য আরোগ্যের কারণ।’ হজরত আবু হুরায়রা (রা.) বর্ণনা করেন, মহানবী (দ.) বলেছেন, তোমাদের কারো থালায় মাছি পড়লে মাছিকে পুরোপুরি থালায় ডুবিয়ে এরপর ফেলে দিবে, কেননা এর একটি ডানায় আরোগ্য এবং অন্যটিতে ব্যাধি রয়েছে।’
হাদিসে চিকিৎসকদের উদ্দেশ্যে যা বর্ণিত হয়েছে তার সার কথা হল :
‘প্রকৃত চিকিৎসক হচ্ছেন আল্লাহতায়ালা কিন্তু তুমি একজন সহানুভূতিশীল মানুষ মাত্র। যেকোনো রোগের আরোগ্যদাতা হচ্ছেন সেই সত্ত্বা যিনি একে সৃষ্টি করেছেন।’ ‘তোমরা সদকা-খয়রাতের মাধ্যমে তোমাদের রোগীদের চিকিৎসাকে ত¦রান্বিত কর এবং যাকাত প্রদানের মাধ্যমে তোমাদের ধন-সম্পদকে পবিত্র কর।’
উপরের আলোচনা থেকে স্পষ্ট হল যে, রোগের চিকিৎসায় প্রতিষেধক তথা ওষুধের ব্যবহার যেমন বিজ্ঞানসম্মত তেমনি মহানবীর (দ.) শিক্ষারও সঠিক অনুসরণ।
মুমিনের জীবনের উদ্দেশ্য হল আল্লাহতায়ালার প্রতিটি বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করা। আল্লাহ করুন, আমরা সবাই যেন তাঁর অনুপম বৈশিষ্ট্যাবলীর অভিজ্ঞান লাভে সক্ষম হই আর আল্লাহতায়ালা আমাদের দোয়াসমূহ কবুল করে আমাদের মধ্যে যারা পীড়িত তাদের সবাইকে আরোগ্য দান করুন, আমিন।
লেখক: অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক, ঢাকা সিটি কলেজ
