শনিবার, ২৮ জানুয়ারি ২০২৩, ১৪ মাঘ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের এক দশক বঙ্গবন্ধুর দৃঢ় অঙ্গীকারের প্রতিফলন

আপডেট : ২২ মার্চ ২০২০, ২১:৪৩

বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম

জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকীতে ২৫ মার্চ ২০২০ পূর্ণ হতে চলেছে গণহত্যা ও মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধে অভিযুক্তদের বিচারে বঙ্গবন্ধুর দৃঢ় অঙ্গীকারের সফল বাস্তবায়ন—আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল প্রতিষ্ঠার এক দশক পূর্তি। ২০১৭ থেকে সংসদে গৃহীত সর্বসম্মত প্রস্তাবের নিরিখে ২৫ মার্চ পালিত হয় গণহত্যা দিবস হিসেবে।

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে বাংলাদেশের ভূখণ্ডে দখলদার পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর এদেশীয় কুখ্যাত সহযোগীরা যারা হত্যা, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ, লুটসহ বিভিন্ন ধরনের অপরাধ সংঘটনে অংশ নিয়েছিল এবং প্ররোচনা দিয়েছিল তাদের বিচারের জন্য ১৯৭২ সালের ২৪ জানুয়ারি ‘দ্য বাংলাদেশ কোলাবোরেটরস (স্পেশাল ট্রাইব্যুনাল) অর্ডার, ১৯৭২’ প্রণয়ন করা হয়। এই আইনটি দালাল আইন, ১৯৭২ হিসেবে পরিচিত ছিল। ঐ আইনটি বলবত্ থাকা সত্ত্বেও ১৭ জুলাই ১৯৭৩-এ তত্কালীন আইনমন্ত্রী শ্রী মনোরঞ্জন ধর জাতীয় সংসদে ‘দি ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইমস (ট্রাইব্যুনালস) বিল, ১৯৭৩’ সংসদের বিবেচনার জন্য উত্থাপন করেন। বিলটি উত্থাপনের উদ্দেশ্য সম্পর্কে মাননীয় মন্ত্রী উল্লেখ করেছিলেন, ‘গণহত্যাজনিত অপরাধ, মানবতাবিরোধী অপরাধ, যুদ্ধাপরাধ ও আন্তর্জাতিক আইনের অধীন সংঘটিত অন্যান্য অপরাধে সম্পৃক্ত ব্যক্তিদের আটক, বিচারে সোপর্দ করা এবং দণ্ডদানের উদ্দেশ্যে বিধিবিধান প্রণয়ন করা প্রয়োজন।’ ঐ দিনই বিলটি সর্বসম্মতভাবে জাতীয় সংসদে গৃহীত হয়।

এখানে উল্লেখ করা প্রাসঙ্গিক হবে যে, বঙ্গবন্ধু ১৯৭২ সালের ২৬ মার্চ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে জাতির উদ্দেশে দেওয়া বেতার ও টিভি ভাষণে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের আওতায় আনার ঘোষণা দিয়ে বলেছিলেন, ‘তারা (যুদ্ধাপরাধী) মানবিকতাকে লঙ্ঘন করেছে এবং আন্তর্জাতিক নীতিমালার ভিত্তিতে বিচার হবে।’ এটি প্রতিষ্ঠিত সত্য যে, গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটনকারীদের বিচারে বঙ্গবন্ধু ছিলেন সদা উচ্চকিত ও দৃঢ়। স্বজনহারানোদের ক্ষত তিনি অনুভব করতেন।  ’৭৫-এর ১৫ আগস্ট জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে নির্মমভাবে হত্যার পরে দেশের রাজনৈতিক, সামাজিক প্রেক্ষাপট সম্পূর্ণভাবে পালটে যায়। সামরিক শাসনের নামে মূলত স্বাধীনতাবিরোধী গোষ্ঠী রাষ্ট্রের চালিকাশক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়। পদদলিত হতে থাকে সংবিধান, গণতন্ত্র ও আইনের শাসন। ১৯৭৩ সালের আইনটিও থেকে যায় নীরব। দালাল আইনে সাজাপ্রাপ্ত কয়েক হাজার অপরাধীকে রাতারাতি ছেড়ে দেওয়া হয়। ১৯৭২ সালের কোলাবরেটরস অর্ডার করা হয় বিলুপ্ত। শুরু হয় স্বাধীনতাবিরোধী গোষ্ঠীসমূহ ও ’৭১-এর গণহত্যা ও মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধে জড়িত ব্যক্তিদের রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় সামাজিক ও রাজনৈতিকভাবে পুনর্বাসন ও প্রতিষ্ঠা করা।

২০০৮-এর নির্বাচনে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের নির্বাচনি মেনিফেস্টোতে ’৭১-এ মানবতাবিরোধী অপরাধে জড়িত ব্যক্তিদের বিচারের আওতায় আনার অঙ্গীকারের সূত্র ধরে ২৯ জানুয়ারি, ২০০৯ বৃহস্পতিবার নবম জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের তৃতীয় বৈঠকে মাননীয় সংসদ সদস্য জনাব মাহমুদ উস সামাদ চৌধুরী (সিলেট-৩) কর্তৃক উত্থাপিত সিদ্ধান্ত প্রস্তাব—‘সংসদের অভিমত এই যে, দেশের চিহ্নিত যুদ্ধাপরাধীদের দ্রুত বিচারের উদ্যোগ গ্রহণ করা হউক’ জাতীয় সংসদে সর্বসম্মতভাবে গৃহীত হয়। সংসদ নেতা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা উপরিউক্ত সিদ্ধান্ত প্রস্তাবের ওপর আলোচনায় অংশ নিয়ে বলেন, ‘মাননীয় স্পিকার, ...আজকে সারা দেশের দাবি, জাতির দাবি—যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হোক। আর এটা আমাদের অঙ্গীকার। এটা আমাদের নির্বাচনি ইশতেহারে আমরা ঘোষণা দিয়েছি যে, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হবে। আর এ বিষয়টি নিয়ে ইতিমধ্যেই আমরা আলাপ-আলোচনা করেছি। এমনকি জাতিসংঘ প্রতিনিধি, ইউএনডিপির প্রতিনিধিসহ অনেকের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা হয়েছে। আর বিভিন্ন দেশে যেভাবে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করা হয়েছে, সেই সম্পর্কে কিছু তথ্যও জোগাড় করা হয়েছে এবং এ বিষয়ে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে বিভিন্ন দেশে যারা এ ব্যাপারে কাজ করেছেন, তাদের expert opinion নেওয়ারও কিছু ব্যবস্থা আমি ইতিমধ্যেই নিয়েছি।...আপনি ৭১-বিধির এই বিষয়টি কীভাবে নিষ্পন্ন করবেন জানি না। কিন্তু আমি এটা বলতে পারি যে, আমরা এই প্রস্তাবটি গ্রহণ করতে পারি এবং যুদ্ধাপরাধীদের বিচার আমরা অবশ্যই করব এবং সেই আশ্বাস আমি দিতে পারি। অবশ্যই যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হবে এবং এই প্রস্তাবটি আমি সমর্থন করছি।’

জাতীয় সংসদে গৃহীত ঐ প্রস্তাবের পর শুরু হয় মানবতাবিরোধী অপরাধে জড়িত ব্যক্তিদের বিচারের আওতায় আনার প্রক্রিয়া ও ট্রাইব্যুনাল গঠন। ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইমস (ট্রাইব্যুনালস) অ্যাক্ট, ১৯৭৩ (পরবর্তীতে আইন, ১৯৭৩ হিসেবে উল্লেখ করা হবে)-এর ধারা ৩-এ ট্রাইব্যুনালের এক্তিয়ার এবং বিচার্য অপরাধসমূহ বিবৃত আছে। ১৯৭৩ সালে আইনটি প্রণয়নের সময়ে ‘ব্যক্তি’ কিংবা ‘ব্যক্তিগণের সমষ্টি’-কে (গ্রুপ অব ইনডিভিজুয়ালস) বা ‘সংগঠনকে’-কে বিচারের আওতায় আনার সুযোগ ছিল না। কিন্তু ২০০৯ সালে আইন, ১৯৭৩-এর ধারা-৩ সংশোধন করে (২০০৯ সালের ৫৫ নম্বর আইন) ‘ব্যক্তি’ বা ‘ব্যক্তিগণের সমষ্টি’ (গ্রুপ অব ইনডিভিজুয়াল)-কেও বিচারের এক্তিয়ার ট্রাইব্যুনালকে দেওয়া হয়। ঐ সংশোধনের ফলে মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধে জড়িত ‘ব্যক্তি’ বা ‘ব্যক্তিগণের সমষ্টি’কে বিচারের আওতায় আনার বিধান সন্নিবেশিত হয়। ২০১৩ সালে অপর আরেকটি সংশোধনীর মাধ্যমে (২০১৩ সালের ৩ নম্বর আইন) মানবতাবিরোধী বা যুদ্ধ অপরাধে জড়িত ‘সংগঠন’কেও বিচারের আওতায় আনার বিধান সংযুক্ত  হয়।

২০১০ সালের ২৫ মার্চ স্বাধীনতা দিবসের পূর্বক্ষণে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়। প্রথমে একটি ট্রাইব্যুনাল গঠন করে বিচারকাজ শুরু হলেও মামলার সংখ্যা বৃদ্ধি এবং তদন্তকাজ  দ্রুত  সমাপ্ত হয়ে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক মামলা বিচারের জন্য প্রস্তুত হতে থাকলে ২২ মার্চ ২০১২ তারিখে আরো একটি ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়। মাত্র ১০ বছরে উভয় ট্রাইব্যুনাল এ পর্যন্ত ৪১টি মামলা নিষ্পত্তি করেছে এবং বর্তমানে প্রাক-বিচার, বিচার পর্যায়ে রয়েছে ৩৪টি এবং রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ আছে একটি মামলা। উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, বিচারাধীন মামলার সংখ্যা বিবেচনায় ট্রাইব্যুনাল-২-এর কার্যক্রম ১৫.০৯.২০১৫ তারিখ থেকে স্থগিত রাখা হয়েছে।

গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক অন্যান্য আদালত/অ্যাডহক/হাইব্রিড ট্রাইব্যুনালসমূহের তুলনায় আমাদের উভয় ট্রাইব্যুনাল কর্তৃক ১০ বছরে ৪১টি মামলা নিষ্পত্তি আপাতদৃষ্টিতে বিস্ময়কর মনে হলেও এটাই চরম সত্য ও বাস্তবতা। জাতীয়-আন্তর্জাতিক নানামুখী ও বহুরূপী চাপ ও ষড়যন্ত্র উপেক্ষা করে বিচারহীনতার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসার এই অর্জন অবশেষে সম্ভব হয়েছে। বিবর্তিত আন্তর্জাতিক আইন বিজ্ঞানের সঙ্গে পরিচিত হয়ে সকল পক্ষই এগিয়ে গেছে দক্ষতা ও দৃঢ়তার সঙ্গে। ট্রাইব্যুনালসমূহ এবং আপিল বিভাগ মানবতাবিরোধী অপরাধে জড়িত ব্যক্তিদের বিচার করতে গিয়ে আসামিপক্ষে উত্থাপিত গুরুত্বপূর্ণ বেশ কিছু আইনি প্রশ্নের নিষ্পত্তি ও যৌক্তিক ব্যাখ্যা করেছে। ঐসব আইনি প্রশ্নের নিষ্পত্তি ও ব্যাখ্যা দেশীয় আইনে আন্তর্জাতিক অপরাধসমূহ বিচারের ক্ষেত্রে দেশে-বিদেশে উদাহরণ ও নজির সৃষ্টি করেছে, সমৃদ্ধ করেছে আন্তর্জাতিক আইন বিজ্ঞানকে।

মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধে অভিযুক্ত কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে ট্রাইব্যুনাল-২ কর্তৃক সর্বপ্রথম রায় প্রদান করা হয় অভিযুক্ত আবুল কালাম আজাদের মামলায়। অভিযুক্ত কালাম পলাতক থাকায় এ রায়ের বিরুদ্ধে কোনো আপিল হয়নি। ট্রাইব্যুনাল-২ কর্তৃক দ্বিতীয় রায়টি ছিল চিফ প্রসিকিউটর বনাম আব্দুল কাদের মোল্লা মামলায়। এই মামলায় ট্রাইব্যুনাল-২ কর্তৃক অভিযুক্ত আব্দুল কাদের মোল্লাকে দোষী সাব্যস্ত করে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের সাজা প্রদান করা হয়। কিন্তু এই সাজা সরকার, ছাত্র-জনতা, ভুক্তভোগী কেউ গ্রহণ করতে পারেনি। কাদের মোল্লার সর্বোচ্চ সাজা মৃত্যুদণ্ডের দাবিতে সৃষ্টি হয়েছিল ছাত্র-জনতার অবিস্মরণীয় আন্দোলন—‘গণজাগরণ মঞ্চ’।

১৯৭৩ সালের আইনে কেবল সাজা ও খালাসের বিরুদ্ধে আপিলের বিধান ছিল। কিন্তু ট্রাইব্যুনাল প্রদত্ত কোনো সাজা বা দণ্ডাদেশ ‘অপর্যাপ্ত’ বিবেচনায় তার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষের আপিলের কোনো সুযোগ ছিল না। আমরা লক্ষ করব যে জাতিসংঘ সমর্থিত অ্যাডহক ট্রাইব্যুনালগুলোতে অপ্রতুল সাজার বিরুদ্ধে আপিল চেম্বারে আপিলের বিধান রয়েছে। এমন একটি অবস্থায় এবং প্রবল জনপ্রত্যাশার প্রতি গুরুত্ব দিয়ে, একই সঙ্গে ‘সমান অধিকারের’ বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে ফেব্রুয়ারি মাসেই ১৯৭৩ সালের আইনের সংশোধনী আনা হয়। সরকার বা অভিযোগকারী বা এজাহারকারী কর্তৃক ‘অপর্যাপ্ত সাজার’ বিরুদ্ধে আপিল দায়েরের বিধান সন্নিবেশিত হয়। অতঃপর রাষ্ট্রপক্ষ কাদের মোল্লার মামলায় ট্রাইব্যুনাল প্রদত্ত দণ্ডের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে আপিল দায়ের করে। দণ্ড ও সাজার বিরুদ্ধে কাদের মোল্লা নিজেও আপিল দায়ের করে। উভয় আপিল একত্রে শুনানি হয় এবং একটি অভিন্ন রায়ের মাধ্যমে আপিল বিভাগ কাদের মোল্লার মামলায় ট্রাইব্যুনাল কর্তৃক নিষ্পত্তিকৃত অনেকগুলো আইনি ব্যাখ্যা চূড়ান্তভাবে নিষ্পত্তি করেছে।

আপিল বিভাগ দুটি আপিল একত্রে দীর্ঘ শুনানির পর নিষ্পত্তি করে এবং ১৭-৯-২০১৩ তারিখে রায় প্রদান করে। সাজাপ্রাপ্ত কাদের মোল্লার আপিল খারিজ করা হয়। সংখ্যাগরিষ্ঠের মতামতের ভিত্তিতে [৪:১] রাষ্ট্রপক্ষের আপিল মঞ্জুরপূর্বক বিচারিক ট্রাইব্যুনাল প্রদত্ত দণ্ডাদেশ বৃদ্ধি করে ‘মৃত্যুদণ্ডাদেশ’ প্রদান করা হয়। প্রথাগত আন্তর্জাতিক আইন (coustomay international law) সম্পর্কে আসামিপক্ষের বক্তব্য ছিল, সংশ্লিষ্ট আইনে যেহেতু মানবতাবিরোধী অপরাধের সংজ্ঞা প্রদান করা হয়নি এবং বিচার প্রক্রিয়ার বিষয় সুনির্দিষ্ট নয়, সেহেতু ট্রাইব্যুনালকে ‘প্রথাগত আন্তর্জাতিক আইন’ অনুসরণ করতে হবে এবং বিদ্যমান আইন অনুযায়ী মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধসমূহ বিচারের এক্তিয়ার ট্রাইব্যুনালের নেই। আপিল বিভাগ সংশ্লিষ্ট সব পক্ষ এবং আদালতকে সহায়তাকারী বিজ্ঞ সিনিয়র আইনজীবীদের বক্তব্য শোনার পর সিদ্ধান্ত দিয়েছে যে :ক) প্রথাগত আন্তর্জাতিক আইন যেহেতু দেশীয় আইনের অধীনে গঠিত কোনো ট্রাইব্যুনাল গঠনকে বারিত করেনি, সেহেতু আইন, ১৯৭৩ অনুযায়ী গঠিত ট্রাইব্যুনালের মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্তদের বিচারের সম্পূর্ণ এক্তিয়ার রয়েছে; খ) আইন, ১৯৭৩-এর সঙ্গে প্রথাগত আন্তর্জাতিক আইনসমূহ কোনোভাবেই বেমানান (repugnant) নয়; গ) প্রথাগত আন্তর্জাতিক আইনের সঙ্গে আইন, ১৯৭৩-এর কোনো বিষয় সাংঘর্ষিক হলে আইন, ১৯৭৩ প্রাধান্য পাবে; ঘ) আইন, ১৯৭৩ যেহেতু সংবিধিবদ্ধ বা পূর্ণাঙ্গ আইন, সেহেতু জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে বা অন্য কোনো আন্তর্জাতিক কর্তৃত্ব কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত ট্রাইব্যুনাল বা আদালতের, যেমন নুরেমবার্গ অথবা বলকান বিচারের সাহায্য নেওয়ার প্রয়োজন হবে না।

উপরোক্তভাবে আপিল বিভাগ আইন, ১৯৭৩ এবং দেশীয় আইনের অধীন গঠিত ট্রাইব্যুনালে আন্তর্জাতিক আইন প্রয়োগের বিষয়টি নিষ্পত্তি করেছে। অভিযুক্তদের পক্ষে আপত্তি উত্থাপন করা হয়েছিল যে ১৯৭৪ সালে ত্রিপক্ষীয় চুক্তির (বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তান) মাধ্যমে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর চিহ্নিত ১৯৫ জন যুদ্ধাপরাধীকে বিচার না করে পাকিস্তানে ফিরিয়ে দেওয়ার পর আইন, ১৯৭৩ অনুসারে কোনো ব্যক্তির বিচার করার কোনো সুযোগ নেই।

আপিল বিভাগ ট্রাইব্যুনালের ব্যাখ্যা ও সিদ্ধান্তের সঙ্গে সম্পূর্ণ একমত হয়ে সিদ্ধান্ত দিয়েছে যে ১৯৭৪ সালে যে ত্রিপক্ষীয় চুক্তির মাধ্যমে চিহ্নিত ১৯৫ জন যুদ্ধাপরাধীকে ক্ষমা করে দেওয়া হয়েছে, ঐ চুক্তি কোনোভাবেই আইন, ১৯৭৩-এর সমকক্ষ হতে পারে না বা আইনের কোনো বিধানকে অকার্যকর, অক্ষম বা বাতিল করতে পারে না। ঐ চুক্তি ছিল একটি ‘এক্সিকিউটিভ অ্যাক্ট’, যা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত কোনো অপরাধের বিচারে কোনো বাধা সৃষ্টি করে না।

আসামিপক্ষে আরো আইনগত প্রশ্ন উত্থাপন করা হয়েছিল যে আইন, ১৯৭৩ প্রণয়নের সময় শুধু সশস্ত্র বাহিনী (আর্মড ফোর্স) ও তাদের সহযোগী বাহিনীর (অক্সিলারি ফোর্স), যারা বাংলাদেশের অভ্যন্তরে যুদ্ধাপরাধ বা মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটন করেছে বা করবে, তাদের বিচারের লক্ষ্য নিয়েই ঐ আইন প্রণীত হয়েছিল; কিন্তু ২০০৯ সালে আইনটি সংশোধন করে ‘ব্যক্তি’ বা ‘ব্যক্তিগণের সমষ্টি’কে বিচারের আওতাভুক্ত করার আইনি সংশোধনটি সম্পূর্ণ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং মূল আইনের উদ্দেশ্য ও সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

উপরোক্ত বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়েছে যে ২০০৯ সালে ৫৫ নম্বর আইনের মাধ্যমে আইন, ১৯৭৩-এর ধারা ৩(১) সংশোধনের মাধ্যমে ট্রাইব্যুনালের এক্তিয়ারকে বৃদ্ধি করে ‘সশস্ত্র বাহিনী’ অথবা তাদের ‘সহযোগী বাহিনী’র পাশাপাশি অপরাধে যুক্ত ‘ব্যক্তি’ বা ‘ব্যক্তিগণের সমষ্টি’কে বিচারের ক্ষমতা দেওয়ায় আইন বা সংবিধানের কোনো ব্যত্যয় ঘটেনি। ঐ সংশোধনী মূল আইনের অংশ হিসেবে বিবেচ্য এবং আইনটিকে সাংবিধানিকভাবে সুরক্ষা দেওয়া হয়েছে। সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৪৭(৩) অনুযায়ী আইন, ১৯৭৩ সুরক্ষিত এবং ঐ আইনকে কখনো চ্যালেঞ্জ করা যাবে না, যদি তা বেআইনি কিংবা বাতিলযোগ্য হয়ে থাকে।

ট্রাইব্যুনালসমূহ ও আপিল বিভাগ আসামিপক্ষে উত্থাপিত আরো একটি আইনি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নে সিদ্ধান্ত দিয়েছে, যা হলো দালাল আইন, ১৯৭২ এবং আইন, ১৯৭৩ সম্পূর্ণ পৃথক—ভিন্ন দুটি আইন। দুটি আইনে বিচার্য অপরাধের প্রকৃতিতে রয়েছে ভিন্নতা। দালাল আইন প্রণীত হয়েছিল ঐ আইনের তপশিলে উল্লেখিত অপরাধসমূহ বিচারের জন্য, যা ছিল মূলত দণ্ডবিধির (পেনাল কোড) অধীনে অপরাধ; কিন্তু আইন, ১৯৭৩ প্রণীত হয়েছিল মানবতাবিরোধী অপরাধ, গণহত্যা এবং অন্যান্য অপরাধ, যা আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনে সংঘটিত হয়েছে বা হবে, তা বিচারের জন্য। সুতরাং উপরোক্ত ঐ দুটি আইনের অধীনে সংঘটিত অপরাধসমূহকে এক ও অভিন্নভাবে চিত্রায়িত করার কোনো সুযোগ নেই।

আইন, ১৯৭৩ অনুযায়ী বিলম্বিত বিচারের বিষয়ে আপিল বিভাগ ও ট্রাইব্যুনালের অভিমত হলো যে বিগত ৪০ বছর ধরে বিভিন্ন সরকারের মানবতাবিরোধী অপরাধে যুক্ত ব্যক্তিদের বিচারের আওতায় না নিয়ে আসার ধারাবাহিক ব্যর্থতায় মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্তরা কোনো দায়মুক্তি পেতে পারে না। ট্রাইব্যুনাল-২, চিফ প্রসিকিউটর বনাম কামারুজ্জামান এবং চিফ প্রসিকিউটর বনাম আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ মামলায় সিদ্ধান্ত দিয়েছিল যে বেসামরিক কোনো ব্যক্তি কোনো সশস্ত্র বাহিনীর ‘সহযোগী বাহিনীর’ (আলবদর বাহিনী) উচ্চতর/ঊর্ধ্বতন পদে বা দায়িত্ব পালন করলে ঐ বাহিনীর অধস্তন ব্যক্তি/সদস্যদের অপরাধের দায়দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট উচ্চতর পদে বা নেতৃত্বে থাকা ব্যক্তিদের ওপরেও বর্তাবে। কোনো গোষ্ঠী বা বেসামরিক সহযোগী সংগঠনের অধস্তনদের নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব স্বভাবতই সংগঠনের নেতৃত্বে থাকা ব্যক্তির ওপর বর্তায়। আন্তর্জাতিক আইনবিজ্ঞানেও এটিই বিবর্তিত হয়েছে।

এক্তিয়ার ‘ঊর্ধ্বতন নেতৃত্বের দায়ভার’ (সুপিরিয়র রেসপনসিবিলিটি) সম্পর্কে আসামিপক্ষ থেকে বিভিন্ন সময়ে এটি বলার চেষ্টা করা  হয়েছে যে, ‘ঊর্ধ্বতনের দায়দায়িত্ব’ (সুপিরিয়র রেসপনসিবিলিটি) সম্পর্কিত আইনি নীতিটি বেসামরিক ব্যক্তির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে না, তা হবে শুধু সামরিক বাহিনীর ক্ষেত্রে’ প্রাসঙ্গিক। কিন্তু আপিল বিভাগ  ট্রাইব্যুনাল-১ কর্তৃক দণ্ড ও সাজাপ্রাপ্ত  মতিউর রহমান নিজামী কর্তৃক দাখিলকৃত আপিল মামলায় বেসামরিক ব্যক্তিও ‘সুপিরিয়র রেসপনসিবিলিটি’র (ঊর্ধ্বতন নেতৃত্বের দায়ভার) আইনি নীতি অনুযায়ী কোনো সশস্ত্র বাহিনীর সহযোগী কোনো বাহিনীর ঊর্ধ্বতন পদে বা নেতৃত্বে থাকলে ঐ বাহিনীর অধঃস্তন ব্যক্তি/সদস্যদের অপরাধের দায়দায়িত্ব তাকে বহন করতে হবে এবং ‘ঊর্ধ্বতন নেতৃত্বের দায়ভার’-এর কারণে অধস্তনদের অপরাধে দোষী সাব্যস্ত করা যাবে মর্মে ট্রাইব্যুনালের অভিমতের সঙ্গে একমত পোষণ করেছে। আলবদর বাহিনীর শীর্ষ পদে অধিষ্ঠিত নিজামীর দণ্ড ও সাজা উপরিউক্ত আইনি নীতির আলোকে আপিল বিভাগ বহাল রেখেছে। [১৩ এডিসি (এডি) পৃষ্ঠা ৬০৭, অনুচ্ছেদ ৪৯, ৫১, ৫৩, ৫৬]

আসামিপক্ষে প্রশ্ন উত্থাপন করা হয়েছিল প্রথাগত আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ সংঘটনের ক্ষেত্রে দুটি উপাদান থাকতে হয়। এর একটি হলো অপরাধটি যেন একটি ‘ব্যাপক’ ও ‘পরিকল্পিত/সুসংগঠিত’ (widespread and systematic) আক্রমণে সংঘটিত হয় এবং অপরটি হলো ‘ব্যাপক ও পরিকল্পিত/সুসংগঠিত’ আক্রমণের বিষয়ে অভিযুক্তের প্রত্যক্ষ ‘জ্ঞান’ ও ‘সমর্থন’ থাকতে হবে। কিন্তু আইন, ১৯৭৩’-এ এই দুটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় অনুপস্থিত, যে কারণে এই আইনের অধীনে গঠিত  ট্রাইব্যুনালে ‘মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের’ বিচার করার কোনো এক্তিয়ার নেই। কিন্তু  ট্রাইব্যুনালসমূহ এ আইনি প্রশ্ন নিষ্পত্তি করতে গিয়ে সিদ্ধান্ত দিয়েছে যে—‘১৯৭৩-এর আইন অনুযায়ী যাদের বিচার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে করা হবে তারা সবাই তাদের কৃত অপরাধ ১৯৭১ সালের স্বাধীনতাযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে নিরস্ত্র জনগোষ্ঠীকে (সিভিলিয়ন পপুলেশন) লক্ষ্য করে ‘ব্যাপক’ ও ‘সুসংগঠিত’ আক্রমণ চালিয়ে অপরাধ সংঘটন করে, যা আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন। সুতরাং, বাংলাদেশে ১৯৭১ সালের মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটনকারী ও  যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের ক্ষেত্রে মুক্তিযুদ্ধকালে নিরস্ত্র বাঙালি জনগোষ্ঠীকে লক্ষ্য করে পরিচালিত  আক্রমণগুলো যে ‘ব্যাপক এবং সুসংগঠিত আক্রমণ’ ছিল তা আর আলাদা করে প্রমাণ করার প্রয়োজন পড়ে না।

এ বিষয়ে আপিল বিভাগ আব্দুল কাদের মোল্লার মামলায় অভিমত দিয়েছে যে আইন, ১৯৭৩ অনুযায়ী মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ প্রমাণের জন্য অপরাধটি  ‘ব্যাপক এবং সুসংগঠিত/ পরিকল্পিত’ ছিল তা প্রমাণের প্রয়োজন নেই। অপরাধ সংঘটনের জন্য এটা প্রমাণ করাই যথেষ্ট হবে যে—‘‘১৯৭০ সালে অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনের ফলাফলকে নস্যাত্ এবং নির্বাচনে বিজিতদের ফল ভোগ করতে না দেওয়ার এবং বাঙালি জাতির স্বাধিকারকে অবদমিত করার উদ্দেশ্য থেকে ‘অপারেশন সার্চ লাইট’ চলাকালে কোনো ‘ব্যক্তি’ বা ‘ব্যক্তিগণ’ সাধারণ বাঙালি জনগোষ্ঠীর ওপর আক্রমণের অংশ বা উদ্যোগ বা ষড়যন্ত্র করেছে।” আপিল বিভাগের এ ব্যাখ্যা ‘মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ’ সংঘটনের প্রেক্ষাপটের পরিধি আরো বিস্তৃত করেছে।

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন এই বিচার নিশ্চিত করার বিষয়টিকে একটি স্বতন্ত্র মানবাধিকার বলে স্বীকৃতি দেয়। মানবতাবিরোধী অপরাধের শিকার ব্যক্তিরও প্রতিকার পাওয়ার অধিকার থাকা উচিত। এই অধিকারটি দুটো মুখ্য মানবাধিকার দলিলে সন্নিবেশিত রয়েছে। মানবাধিকারের সর্বজনীন ঘোষণাপত্রের (ইউডিএইচআর) অনুচ্ছেদ ৮ এবং আইসিসিপিআর-এর ২(৩) অনুচ্ছেদে  মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে ‘কার্যকর’ প্রতিকারের বিষয়টিকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। এই বিবেচনায় বাংলাদেশে নিজস্ব আইনে প্রতিষ্ঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ  ট্রাইব্যুনালে চলমান বিচার কার্যক্রমের এক্তিয়ার ও বৈধতা এবং স্বচ্ছতা ও মান প্রশ্নাতীত এবং যে কোনো ধরনের  বিভ্রান্তিমুক্ত। যুক্তরাষ্ট্রের অ্যাম্বাসেডর-অ্যাট-লার্জ মি. স্টিফেন জে র্যাপ বেশ কয়েক বার ট্রাইব্যুনাল  পরিদর্শন ও এর বিচারিক কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করেন। অনেক বৈশ্বিক ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠনের মতো তিনিও বাংলাদেশের নিজস্ব বিচারিক ফোরামে মানবাধিকার লঙ্ঘনপ্রসূত অপরাধের বিচারিক কার্যক্রম সম্পর্কে স্পষ্টভাবে ব্যক্ত করেছেন যে : [...] these trials[…] are of great importance to the victims of the 1971 war of independence from Pakistan. What happens in Bangladesh today will send a strong message that it is possible for a national system to bring those responsible for grave human rights abuses to justice. [‘Old Evidence and Core International crimes: FICHL Publication series No.16(2012)-page 169]

১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধকালে মানবাধিকারের গুরুতর লঙ্ঘন করে সংঘটিত অপরাধসমূহ তদন্ত করা এবং অপরাধ সংঘটনকারী ব্যক্তিকে বিচারে সোপর্দ করার দায়িত্ব রাষ্ট্রের। বাংলাদেশ নিজেদের সার্বভৌম সংসদে ১৯৭৩ সালে প্রণীত আইনে ‘আন্তর্জাতিক অপরাধ  ট্রাইব্যুনাল’ প্রতিষ্ঠা করে আন্তর্জাতিক অপরাধসমূহ অর্থাত্ মানবতার বিরুদ্ধে সংঘটিত অপরাধসমূহ ও গণহত্যার বিচারে অনন্য নজির স্থাপন করেছে। সত্য ও ইতিহাস প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। প্রকাশ্য, স্বচ্ছ ও অভিযুক্তদের আত্মপক্ষ সমর্থনের সব ধরনের সুযোগ নিশ্চিত করে এ বিচারব্যবস্থা আগ্রহ ও নজর কেড়েছে বিশ্বসম্প্রদায়ের। বৈশ্বিক আইন অঙ্গনেও বাংলাদেশের ‘আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল’ আজ ইতিবাচক আলোচনার বিষয়। জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর অপ্রতিরোধ্য অঙ্গীকারে ১৯৭৩ সালে প্রণীত দেশীয় আইনে গঠিত বিচারিক ফোরামে এই প্রকৃতির বর্বর অপরাধের বিচার ভবিষ্যতে বিশ্বের যে কোনো ভূখণ্ডে গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটনকে প্রতিরোধে ভূমিকা রাখবে।

n লেখক : বিচারপতি, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট, হাইকোর্ট বিভাগ ও সাবেক চেয়ারম্যান, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১, বাংলাদেশ