বিদেশ প্রত্যাগতদের খোঁজে মাঠে প্রশাসন

আপডেট : ২২ মার্চ ২০২০, ২২:৩৮

করোনা ভাইরাসে বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে গোটা বিশ্ব। ছোঁয়াচে এই রোগ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে বাংলাদেশেও। বিশেষ করে বিদেশফেরত ব্যক্তিদের মাধ্যমেই দেশে ছড়াচ্ছে কোভিড-১৯ নামের এই ভাইরাস। গতকাল পর্যন্ত সরকারি হিসাবে বাংলাদেশে আক্রান্তের সংখ্যা ২৭, মারা গেছেন দুই জন। বিদেশ থেকে গত তিন মাসে সাড়ে ছয় লক্ষাধিক প্রবাসী দেশে ফিরলেও হোম কোয়ারেন্টাইনে আছেন ১৫ হাজারের কম। বাদবাকিরা কোনো স্বাস্থ্য নির্দেশনা মানছেন না। তারা দেশে ফেরার সময় অঙ্গীকারনামায় সই করলেও ১৪ দিনের বাধ্যতামূলক হোম কোয়ারেন্টাইনে থাকছেন না। দিব্যি পরিবার নিয়ে ঘুরছেন, আড্ডা দিচ্ছেন, বাজারঘাট করছেন। বিয়ে-শাদিসহ সামাজিক অনুষ্ঠানেও অংশ নিচ্ছেন। অনেকে কোয়ারেন্টাইন না করার জন্য নিজেদের তথ্য গোপন করে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। বিদেশফেরত ব্যক্তিরা ইতিমধ্যে ছড়িয়ে পড়েছেন সারা দেশে। এ কারণে তাদের নিয়ে সৃষ্টি হয়েছে করোনা আতঙ্ক। এই প্রেক্ষাপটে দেশে ফেরা প্রবাসীদের বাধ্যতামূলক কোয়ারেন্টাইনে নেওয়ার জন্য প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে প্রশাসন মাঠে নেমেছে।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে প্রবাসফেরত ব্যক্তিদের তালিকা মাঠপর্যায়ে পাঠানো হয়েছে।       নির্দেশনা মোতাবেক ঐ তালিকা জেলা প্রশাসক ও সিভিল সার্জনকে পাঠানো হয়েছে। এছাড়া প্রতিটি থানার অফিসার ইনচার্জকে (ওসি) তালিকা পাঠিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে। তালিকা নিয়ে গ্রামে গ্রামে বিদেশফেরত ব্যক্তিদের খুঁজে বের করা হচ্ছে। ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে চলছে মাইকিং। বিদেশফেরত ব্যক্তিদের বাড়িতে হোম কোয়ারেন্টাইনে থাকা নম্বরযুক্ত স্টিকার লাগিয়ে দেওয়া হচ্ছে। কয়েকটি জেলার প্রশাসনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, স্থানীয় সংসদ সদস্যদের অবহিত করে ডিসিরা মন্ত্রিপরিষদের পাঠানো তালিকা অনুযায়ী বিদেশফেরত ব্যক্তিদের তদারক করতে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের (ইউএনও) নির্দেশ দিয়েছেন। উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান, ইউপি চেয়ারম্যান ও মেম্বারদের মাধ্যমে তদারক করছেন ইউএনওরা। কোয়ারেন্টাইনে বাধ্য করতে মাঠে নেমেছে পুলিশসহ বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সমন্বয়ে গঠিত টাস্কফোর্স। সরকারের নির্দেশনা পাওয়ার পর পুলিশের এক এসআই, এএসআই, মসজিদের ইমাম ও এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিদের সমন্বয়ে কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটি সচেতনতা বৃদ্ধির পাশাপাশি যারা প্রবাস থেকে এসেছেন, তারা ঠিকমতো কোয়ারেন্টাইন করছেন কি না, সে ব্যাপারে খবর নেবে। হোম কোয়ারেন্টাইন না করলে তাদের বাধ্য করা ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

নোয়াখালীর ডিসি তন্ময় দাস বলেন, ‘আমরা মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের চিঠি পেয়েছি। চিঠিতে বিদেশফেরত ব্যক্তিদের নাম-ঠিকানাসহ তালিকা পাঠানো হয়েছে। আমরা বিদেশফেরত প্রবাসীদের খোঁজখবর নিচ্ছি। যারাই নিয়ম উপেক্ষা করে বাইরে ঘোরাফেরা করছেন, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থাও নেওয়া হচ্ছে।’

ফরিদপুরের পুলিশ সুপার আলীমুজ্জামান জানান, বিদেশ থেকে যারা বাংলাদেশে আসছেন তাদের কোয়ারেন্টাইনে থাকা বাধ্যতামূলক করেছে সরকার। আমরা সরকারের নির্দেশ পেয়েছি। এটা কার্যকর করছি।

জনপ্রশাসন সচিব শেখ ইউসুফ হারুন বলেন, বিদেশফেরতদের নজরদারিতে রাখতে ও হোম কোয়ারেন্টাইন নিশ্চিত করতে মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তাদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। গত বুধবার সকালেই এ সংক্রান্ত নির্দেশনা ডিসিদের কাছে পাঠানো হয়েছে। নির্দেশনায় বলা হয়েছে, বিদেশফেরত যেসব মানুষ হোম কোয়ারেন্টাইনে থাকার নামে চারদিকে ঘুরে বেড়াচ্ছেন, তাদের অবশ্যই সরকারের নির্দেশনা মেনে চলতে হবে। জনস্বাস্থ্য, জননিরাপত্তা ও জনকল্যাণের জন্য আমরা তাদের ছাড় দিতে পারি না। তাই আপনাদের (ডিসি) জনসচেতনতা সৃষ্টি ও প্রয়োজনীয় স্থানে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার অনুরোধ করা হচ্ছে।

ইতিমধ্যে গত সোমবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, যে কেউ বিশ্বের যে কোনো দেশ থেকে দেশে এলে তাকে অবশ্যই ১৪ দিন কোয়ারেন্টাইনে থাকতে হবে। এ জন্য সিটি করপোরেশনের মেয়র, ডিসি, পৌরসভার মেয়র, ইউএনও, উপজেলা চেয়ারম্যান, সিভিল সার্জন, ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানদের এ বিষয়ে খোঁজ রাখতে বলা হয়েছে। কেউ যদি নির্দেশ অমান্য করে তা হলে তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে।

এদিকে গতকাল পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম বলেছেন, দেশে আসা সব প্রবাসীর তালিকা তৈরি করা হয়েছে। ১৪ দিন হোম কোয়ারেন্টাইনে না থাকলে তাদের পাসপোর্ট জব্দ করা হবে।

বিদেশফেরত ব্যক্তিরা বাধ্যতামূলক ১৪ দিনের কোয়ারেন্টাইন না মানলে সর্বোচ্চ ছয় মাসের জেল বা ১ লাখ টাকা জরিমানা গুনতে হবে বলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। নোয়াখালীর সুবর্ণচর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ইবনুল হাসান বলেন, জেলা প্রশাসকের নির্দেশে আমরা বিদেশ ফেরতদের বিষয়ে খোঁজখবর নিচ্ছি। তাদের হোম কোয়ারেন্টাইনে বাধ্য করা হবে। মাগুরা সদর উপজেলার জগদল ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান রফিকুল ইসলাম জানান, প্রতিটি এলাকায় গত সাত দিনের মধ্যে যারা বিদেশ থেকে বাড়ি ফিরেছেন তাদের খোঁজ নিচ্ছি এবং একই সঙ্গে তাদের বাড়ির সামনে লাল পতাকা টানিয়ে দেওয়া হয়েছে যাতে সব বিভাগের নজরদারি থাকে।

বরিশাল বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক ডা. বাসুদেব কুমার দাস জানান, প্রবাস ফেরতদের মাধ্যমেই করোনা ছড়াচ্ছে। তাদের হোম কোয়ারেন্টাইন নিশ্চিত করতে না পারলে বড়ো বিপর্যয় হতে পারে। কাউখালী উপজেলা স্বাস্থ্য বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, কাউখালীতে ১৩জন বিদেশ ফেরত ব্যক্তি এসেছে। তাদের মধ্যে থেকে পাঁচ জনকে হোম কোয়ারেন্টাইনে রাখা হয়েছে। বাকিদের ব্যাপারে খোঁজ নেওয়া হচ্ছে।