করোনা মোকাবিলায় মাঠে সশস্ত্রবাহিনী

আপডেট : ২৪ মার্চ ২০২০, ০১:২৭

করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাবে দুর্যোগের মতো পরিস্থিতিতে প্রশাসনকে সহায়তা করতে সারাদেশে মাঠে নামছে সশস্ত্রবাহিনী । আজ মঙ্গলবার থেকে বিভাগীয় ও জেলা শহরগুলোতে সশস্ত্রবাহিনী প্রশাসনকে সহায়তায় নিয়োজিত হবে বলে জানান মন্ত্রিপরিষদ সচিব।

করোনা ভাইরাস সংক্রমণ প্রতিরোধে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রাষ্ট্রীয়ভাবে সাধারণ ছুটি ঘোষণাসহ ১০ নির্দেশনা দিয়েছেন। দেশের জনগণের মঙ্গল কামনায় মন্ত্রিপরিষদ, রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি, স্বাস্থ্য এবং রোগতত্ত্ব বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে পরামর্শক্রমে রাষ্ট্রীয় এসব সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে।

গতকাল সোমবার বিকালে মন্ত্রিপরিষদ সম্মেলন কক্ষে মন্ত্রিপরিষদ সচিব খন্দকার আনোয়ারুল ইসলাম প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ১০ নির্দেশনা পাঠ করেন।             নির্দেশনাগুলো হলো : ১. মার্চ থেকে ৪ এপ্রিল পর্যন্ত সরকারি-বেসরকারি সব প্রতিষ্ঠান ছুটির আওতায় থাকবে। তবে কাঁচাবাজার, খাবার, ওষুধের দোকান, হাসপাতালসহ জরুরি যেসব সেবা রয়েছে তার জন্য এসব প্রযোজ্য হবে না। জনসাধারণকে জরুরি প্রয়োজন ছাড়া (খাদ্যদ্রব্য, ওষুধ ক্রয় ও চিকিত্সা গ্রহণ ইত্যাদি) কোনোভাবেই ঘরের বাইরে না আসার জন্য সবাইকে অনুরোধ জানানো হয়েছে।

মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, ইতিপূর্বে স্কুল ছুটি ঘোষণার পর দেখা গেছে অনেকেই দেশের বিভিন্ন বিনোদন কেন্দ্রে গেছেন। সাধারণ ছুটি মানে সরাসরি আইসোলেশন না হলেও নিজেকে প্রথক রেখে অন্যকে আক্রান্ত হওয়া থেকে রক্ষা করার ব্যবস্থা।

২. এ সময়ে যদি কোনো অফিস-আদালতে প্রয়োজনীয় কাজকর্ম করতে হয় তাহলে তাদের অনলাইনে সম্পাদন করতে হবে। সরকারি অফিস সময়ের মধ্যে যারা প্রয়োজন মনে করবে তারাই শুধু অফিস খোলা রাখবে।

৩. গণপরিবহন চলাচল সীমিত থাকবে। জনসাধারণকে যথাসম্ভব গণপরিবহন পরিহারের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। যারা জরুরি প্রয়োজনে গণপরিবহন ব্যবহার করবে, তাদের অবশ্যই করোনা ভাইরাসে সংক্রমিত হওয়া থেকে মুক্ত থাকতে পর্যাপ্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করেই গণপরিবহন ব্যবহার করতে হবে। গাড়িচালক ও সহকারীদের অবশ্যই গ্লাভস এবং মাস্ক পরাসহ পর্যাপ্ত সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

৪. জনগণের প্রয়োজন বিবেচনায় ছুটিকালীন বাংলাদেশ ব্যাংক সীমিত আকারে ব্যাংকিং ব্যবস্থা চালু রাখার প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেবে।

৫. ২৪ মার্চ থেকে বিভাগীয় ও জেলা শহরগুলোতে সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিতকরণ ও সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণের সুবিধার্থে সশস্ত্রবাহিনী জেলা প্রশাসনকে সহায়তায় নিয়োজিত থাকবে। দেশের ৬৪ জেলা ম্যাজিস্ট্রেট তাদের স্ব স্ব জেলার প্রয়োজন অনুযায়ী সশস্ত্রবাহিনীর জেলা কমান্ডারকে রিকুইজিশন দেবে।

৬. করোনা ভাইরাসের কারণে নিম্নের কোনো ব্যক্তি যদি স্বাভাবিক জীবনযাপনে অক্ষম হয়, তাহলে সরকারের যে ঘরে ফেরার কর্মসূচি রয়েছে , সে কর্মসূচির মাধ্যমে তারা নিজ নিজ গ্রামে ফিরে গিয়ে আয় বৃদ্ধির সুযোগ পাবে। এ ব্যাপারে জেলা প্রশাসকরা প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদান করবেন।

৭. ভাসানচরে ১ লাখ লোকের আবাসন ও জীবিকা নির্বাহের ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে সরকার। এ সময় যদি দরিদ্র কোনো ব্যক্তি ভাসানচরে যেতে চান তাহলে তারা যেতে পারবেন। এ ব্যাপারে জেলা প্রশাসকরা প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদান করবেন।

৮. করোনা ভাইরাসজনিত কার্যক্রম বাস্তবায়নের কারণে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর আয় অন্ন-সংস্থানের অসুবিধা নিরসনের জন্য জেলা প্রশাসকদের খাদ্য ও আর্থিক সহায়তা প্রদানের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সমন্বয় করে এ সহায়তা দেওয়া হবে।

৯. প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় বাংলাদেশ মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন (বিএমএ) করোনা আক্রান্ত রোগীদের চিকিত্সার জন্য ৫০০ জন চিকিত্সকের তালিকা তৈরি ও তাদের প্রস্তুত রাখবে।

১০. সব ধরনের সামাজিক, রাজনৈতিক ও ধর্মীয় সমাগম সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। বিশেষ করে অসুস্থ জ্বর সর্দি কাশিতে আক্রান্ত ব্যক্তিদের মসজিদে না যাওয়ার জন্য বারবার নিষেধ করা হয়েছে। তার পরও সম্প্রতি মিরপুরে এক জন বৃদ্ধ অসুস্থ অবস্থায় মসজিদে যান। করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত ঐ ব্যক্তি পরে মৃত্যুবরণ করেন। তাই ধর্মপ্রাণ মুসলিমদের প্রতি অসুস্থ অবস্থায় মসজিদে নামাজ আদায় করতে না যাওয়ার অনুরোধ জানানো যাচ্ছে।

প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব আহমেদ কায়কাউস দেশে করোনা ভাইরাস মহামারি ঠেকাতে সরকারের নানা কার্যক্রম তুলে ধরে বলেন, এই পরিস্থিতিতে সবাই সম্মিলিতভাবে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করলে সংকট মোকাবিলা করা যাবে। তিনি বলেন, লকডাউন বলে কিছু নেই। দরকার সোশ্যাল ডিসট্যান্স। সরকার সব সময় এটাকে প্রাধান্য দিয়ে কাজ করেছে। নারায়ণগঞ্জে আক্রান্ত হয়েছে তিন জন। বাংলাদেশ কিন্তু এটা নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম হয়েছে। আমাদের ডাক্তারদের ভালো করে তোলার সামর্থ্য আছে। আতঙ্কের কিছু নেই।

সাংবাদিক সম্মেলনে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব, জননিরাপত্তা বিভাগের সিনিয়র সচিব, স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব, তথ্যসচিব, প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার, প্রধান তথ্য কর্মকর্তা (পিআইও) উপস্থিত ছিলেন।

এদিকে সঠিক সময়ে সশস্ত্রবাহিনীকে মাঠে নামায় সন্তোষ প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞ চিকিত্সকরা। তারা বলেন, বর্তমানে দুই সপ্তাহ দেশের জন্য ক্রিটিক্যাল। এই সময় সশস্ত্রবাহিনী মাঠে নামানো খুবই প্রয়োজন ছিল। বিদেশফেরতদের হোম কোয়ারেন্টাইনে রাখতে সশস্ত্রবাহিনী কার্যকর ভূমিকা রাখবে বলে তারা আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) উপাচার্য অধ্যাপক ডা. কনক কান্তি বড়ুয়া বলেন, সরকার সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। সরকারের এই সিদ্ধান্তকে আমরা স্বাগত জানাই। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. খান আবুল কালাম আজাদ জানান, কোয়ারেন্টাইনের বিষয়টি নিয়ে দুঃচিন্তায় ছিলাম। কেউ মানছিল না। যেহেতু সশস্ত্রবাহিনী নামছে, তাই বিদেশফেরতদের গৃহবন্দি করে রাখা গেলে করোনা ভাইরাসের ভয়াল থাবা থেকে দেশ রক্ষা পাবে। তিনি বলেন, ইউরোপ থেকে ১ লাখ ৭০ হাজার প্রবাসী দেশে এসেছেন। তাদের কারণে দেশ ঝুঁকিতে। আশা করি সরকারের এই সিদ্ধান্তে সময়োপযোগী ফলাফল পাব।

আইএসপিআর এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, বিশ্বব্যাপী মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়া করোনা ভাইরাসে বাংলাদেশে সংক্রমণ, বিস্তৃতির সম্ভাব্যতা ও প্রেক্ষাপট বিবেচনায় বেসামরিক প্রশাসনের অনুরোধে বিভাগীয় ও জেলা শহরগুলো ও উপকূলীয় এলাকায় বেসামরিক প্রশাসনকে সহায়তার আওতায় সেনা, নৌ ও বিমান বাহিনী নিয়োজিত থাকবে। আজ মঙ্গলবার থেকে বিভাগীয় ও জেলা শহরগুলোতে সামাজিক দূরত্ব ও সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণের সুবিধার্থে সশস্ত্রবাহিনী তাদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করবে।

জেলা ম্যাজিস্ট্রটদের সমন্বয়ে সশস্ত্রবাহিনী করোনা ভাইরাসসংক্রান্ত রোগীদের চিকিত্সাব্যবস্থা, সন্দেহজনক ব্যক্তিদের কোয়ারেন্টাইন ব্যবস্থা পর্যালোচনা করবে। বিশেষ করে, বিদেশফেরত ব্যক্তিদের কেউ নির্ধারিত কোয়ারেন্টাইনের বাধ্যতামূলক সময় পালনে ত্রুটি/অবহেলা করছে কি না, তা পর্যালোচনা করবে। জেলা ম্যাজিস্ট্রেটগণ স্থানীয় আর্মি কমান্ডারের কাছে অবস্থা পর্যালোচনার জন্য আইন অনুসারে সশস্ত্রবাহিনীর নিকট অনুরোধ জানাবে। নৌবাহিনী উপকূলীয় এলাকায় বেসামরিক প্রশাসনকে সহায়তায় কাজ করবে। বিমান বাহিনী হাসপাতালের প্রয়োজনীয় চিকিত্সাসামগ্রী ও জরুরি পরিবহনকাজে নিয়োজিত থাকবে।

স্বাচিপের বিবৃতি :স্বাচিপের সভাপতি অধ্যাপক ডা. ইকবাল আর্সনাল বলেন, সশস্ত্রবাহিনী আরো আগেই কোয়ারেন্টাইন নিয়ন্ত্রণে মাঠে নামানো উচিত্ ছিল। বিলম্বে হলেও সরকারের এই পদক্ষেপকে তিনি স্বাগত জানান। বিদেশ ফেরত লোকজন কোয়ারেন্টাইন মানছেন না, তারা অবাধে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। আগামী দুই সপ্তাহ সশস্ত্রবাহিনীর সহযোগিতায় তাদের কোয়ারেন্টাইনে রাখতে পারলে করোনা ভাইরাস নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব বলে তিনি মনে করেন। 

সেনাবাহিনীর গৃহীত কার্যক্রম

বিদেশ হতে প্রত্যাবর্তনকারী নাগরিকদের অবস্থান নির্ণয় ও তাদের স্ব স্ব অবস্থানে কোয়ারেন্টাইন নিশ্চিত করাই হবে সেনাবাহিনীর কার্যক্রমের উদ্দেশ্যে। তদুপরি, করোনা মোকাবিলায় ইতিমধ্যে গৃহীত ও ভবিষ্যতে গৃহীত সরকারি সকল কার্যক্রমের যথাযথ বাস্তবায়নে সেনাবাহিনী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। সেনাবাহিনী জেলাসমূহের জেলা প্রশাসনের সঙ্গে প্রয়োজনীয় সম্বনয় সাধনের মাধ্যমে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করবে।

প্রথম পর্যায়ে আজ মঙ্গলবার ব্রিগ্রেড কমান্ডাররা বিভাগীয় কমিশনারদের কার্যালয়ে প্রয়োজনীয় সম্বনয় সাধন করবেন। পরদিন ইউনিট অধিনায়করা জেলা প্রশাসক, পুলিশ প্রশাসন এবং সিভিল সার্জনের সঙ্গে প্রয়োজনীয় সম্বনয় করবেন। সেনা মেডিক্যাল অফিসার সমন্বয় দলের  সঙ্গে গমন করবে। সেলফ কোয়ারেন্টাইন নিশ্চিতকল্পে জেলা প্রশাসন কর্তৃক গৃহীত মনিটরিং পদ্ধতি এবং বর্তমানে যাদের খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না তাদের সঠিক পরিসংখ্যান নিশ্চিত করা।

করোনা প্রতিরোধে কোয়ারেন্টাইন কর্মসূচি সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য অফিসার, জেসিও এবং অন্যান্য পদবির সেনাসদস্যদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ কর্মসূচি পরিচালনা করা হবে।