প্র থমবর্ষে আমি অনেকটাই খারাপ রেজাল্ট করি। সবার মাঝে নিজেকে তখন খুব খারাপই লাগতো অথচ সাড়ে চার বছরের ব্যবধানে এ মুখগুলো এতো আপন হয়ে যাবে কখনো ভাবতে পারিনি! বিদায় বেলায় সহপাঠীদের উদ্দেশ্যে নিজের স্মৃতি রোমন্থন এভাবেই করছিলেন নীলাঞ্জনা পুরকায়স্থ।
নিজের মেধা আর যোগ্যতার প্রমাণ দিয়ে দেশ ও সমাজের সেবার মানসিকতা নিয়ে ২০১৪ সালে ২০ এপ্রিল ভর্তি হয়েছিলাম শাবির ব্যবসায় প্রশাসন বিভাগে। কিন্তু সকাল ৮টা ১০ মিনিটে বিশ্ববিদ্যালয়ের লাল বাস ধরে ৮টার ক্লাসে হাজির হয়ে শিক্ষকের ঝাড়ি খাওয়া। একটু বেশি দেরী করে ক্লাসে প্রবেশ করার চেষ্টা করলে তুমি হয়তো পরবর্তী ক্লাসের জন্য অনেক আগেই এসেছো শুনে ক্লাসের বাইরে পরবর্তী ক্লাস শুরু না হওয়া পর্যন্ত দেবদাসের মতো দাঁড়িয়ে থাকা। এ্যাসেইনমেন্ট, সেমিনার, টার্মটেস্ট সব কিছু আমার উপর এমনভাবে ভর করে বসেছিল যে, তখন শুধু মনে পড়ত বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স পেলে আর পড়া লাগে না বলেছিল যে ভাইটি তাকে আমি একবার সালাম দিয়ে আসি। কিন্তু কখন জানি নিজের জীবন থেকে ব্যস্তময় এ চারটি বছর চলে গেল টেরই পেলাম না। কথাগুলো বলছিল জান্নাত রোশনী।
শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় প্রশাসন বিভাগের ২০১৩-১৪ সেশনের শিক্ষার্থীদের র্যাগ তথা শিক্ষা সমাপনী উত্সব অনুষ্ঠিত হয়। এ যেন উত্সবের নামে এক ঝাঁক স্বপ্নবাজ শিক্ষার্থীর একে অপরের কাছ থেকে বিদায় নেয়ার পালা। যে উত্সবে গলা মিলিয়েছিল বিভাগের জুনিয়ররাও।
৭ অক্টোবর বিভাগে ক্লাসের শেষে চললো একে অপরের টি শার্টে লেখা। যে কথাগুলো কখনো বলা হয়নি হয়তোবা সে কথাগুলোই উঠে আসলো মার্কারের বিভিন্ন কালিতে। লেখালেখিতে উত্সাহ নিয়ে যোগ দিলো জুনিয়ররাও। পরে কেক কেটে শিক্ষা সমাপনী উত্সবের উদ্বোধন করেন বিভাগের শিক্ষকরা। একটু পরের র্যালী হয়ে গেল রঙে রাঙায়িত। পরদিন নগরীর একটি অভিজাত রেস্টুরেন্টে গালা ডিনারে অংশ নেয় শিক্ষার্থীরা।
আসিফা, রোশনী, কবীরের উপস্থাপনায় নিজেদের কথা শোনান সানি, কারিনা, মিমি, মুনাসহ অনেকেই। শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে কথা বলেন বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ড. মোছাদ্দেক আহমেদ চৌধুরী। গাম্ভীর্যের খোলস থেকে এদিন বেরিয়ে এসে অনেক না বলা কথা শিক্ষার্থীদের সাথে শেয়ার করেন সাবেক প্রধান অধ্যাপক ড. মোঃ নজরুল ইসলাম। এছাড়া উপদেশমূলক কথা বলেন অধ্যাপক ড. মনিরুল ইসলাম, অধ্যাপক ড. খায়রুল ইসলাম, অধ্যাপক ড. মাজহারুল হাসান মজুমদারসহ বিভাগের অন্য শিক্ষকবৃন্দ। বাদ যায়নি সবার প্রিয় নুর ভাইও।
আতাউর রহমানের কাছে শুনতে চেয়েছিলাম তার অভিব্যক্তির কথা। ‘দীর্ঘ সাড়ে চার বছরের অধিক সময়ে বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে অজান্তেই অসংখ্য স্মৃতির মাঝে নিজেকে হারিয়ে পাওয়া সাধের বন্ধুদের ফেলে যাওয়ার অনুভূতি নিশ্চয় দু’/একটি কথায় প্রকাশ করা কঠিনতম কাজের একটি।’ এমনটিই জানালেন তিনি।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রেসক্লাবের দপ্তর সম্পাদক ও ব্যবসায় প্রশাসন বিভাগের শিক্ষার্থী মেহেদী কবির বলেন, একটা সময় স্বপ্ন ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের লাল বাসে চড়ে সারা শহর চক্কর দিব। আর সেই স্বপ্ন যখন পূরণ হলো তখন সিনিয়র বড় ভাই আর আপুদের ‘র্যাগ ডে’ তে অংশগ্রহণ করতে ভালো লাগলো। বিশেষ করে যখন সিনিয়র বড় ভাই আপুরা কাঁদা ছোড়াছুড়ি করত, একে অপরের মুখে রং মাখিয়ে দিত তখন বিষয়টা খুবই ভালো লাগতো। দিনশেষে তারা যখন একে অপরকে জড়িয়ে ধরে অশ্রু জলে ভিজাতো তখন নিজেকে আর ধরে রাখতে পারতাম না। তবে কালের পরিক্রমায় আমরা ১৬তম ব্যাচও যে এই আনন্দ অশ্রুর দিনে এসে হাজির হবো ভাবতেও অবাক লাগে।
সত্যিই, সেই কবে থেকেই যেন মনে হচ্ছিল এই বুঝি বেজে উঠলো বিদায়ের ঘন্টা। অবশেষে ঠিকই হূদয়ের বাঁধনকে রিক্ত-রুষ্ট করে ছিড়ে গেল নিয়মের বাঁধন। বেজে উঠলো আনুষ্ঠানিক বিদায়ের করুণ সুর। বিদায়ে উপস্থিত থেকে স্নেহাশীষ ছোটরা যেন আমাদের একটি অবিস্মরণীয় মুহূর্তই উপহার দিল বিভাগের সাথে জীবনের বন্ধনটা চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত করার। এ যেন বিদায় বেলায় বিস্বাদের সুর। এ যেন বিস্বাদের উত্সব।
