ফ্লোর প্রাইস ও শেয়ারবাজার

আপডেট : ২৭ মার্চ ২০২০, ২০:৪৫

করোনা ভাইরাস আতঙ্কে বিশ্বব্যাপী পুঁজিবাজার ধসে পড়েছে। কোনো প্রণোদনাই কাজ করছে না। বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে যখন ক্রমাগত দরপতন হচ্ছে, বাজারে যখন শেয়ারের দাম ফ্রি-ফল হচ্ছে, লাখ বিনিয়োগকারী যখন দিশেহারা, তখন প্রধানমন্ত্রীর একটি সিদ্ধান্ত পুঁজিবাজারে দরপতন ঠেকাতে বড়ো ধরনের ভূমিকা রেখেছে। বাজারে শেয়ারের দামের ফ্রি-ফল বন্ধ হয়েছে এবং লাখ লাখ ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারী স্বস্তিতে আছে। শেয়ারের ফ্লোর প্রাইস ঠিক করে দেওয়ায় এটি সম্ভব হয়েছে। ফ্লোর প্রাইস হচ্ছে একটি শেয়ারের দাম নির্দিষ্ট দামের নিচে নামতে পারবে না, এ সিদ্ধান্ত অত্যন্ত যুগোপযোগী এবং সঠিক। পুঁজিবাজারে যখনই কোনো বড়ো ধরনের সংকট হয়েছে আমরা দেখতে পাই প্রধানমন্ত্রী সাধারণ বিনিয়োগকারীদের পক্ষে দাঁড়িয়ে এমন একটি সিদ্ধান্ত দিয়েছেন, যা প্রথমে সবাই সমালোচনা করলেও পরবর্তীতে সবাই স্বীকার করে নিয়েছে সিদ্ধান্ত সঠিক ছিল। যেমন গত বাজেটে প্রত্যেক লিস্টেড কোম্পানিকে তার রিটেইনেড আর্নিংস এবং রিজার্ভ থেকে ক্যাশ ডিভিডেন্ড দিতে আইনের মাধ্যমে বাধ্য করা হয়েছে।

গত ১৪ এবং ১৫ জানুয়ারি শেয়ারবাজারে আস্থা এবং তারল্য সংকটের কারণে যখন বাজারে শেয়ার প্রাইস ফ্রি-ফল হচ্ছিল, বাজার তখন ক্রেতাশূন্য হয়ে পড়েছিল, তখন প্রধানমন্ত্রী ১৬ জানুয়ারি সকালে সংশ্লিষ্ট কয়েক জনকে নিয়ে পুঁজিবাজারে ফ্রি-ফল ঠেকানোর জন্য তত্ক্ষণাত্ করণীয় কয়েকটি সিদ্ধান্ত দিয়েছিলেন। তাও বিনিয়োগকারীদের স্বার্থে। যেটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, যারা পুঁজিবাজারের স্বার্থে জড়িত আছে তাদের আর্থিক সক্ষমতা বাড়ানোর জন্য ২০০ কোটি টাকা প্রত্যেকটি প্রতিষ্ঠানকে বাংলাদেশ ব্যাংকের মাধ্যমে অত্যন্ত সহজ শর্তে মাত্র ৫ শতাংশ সুদে পাঁচ বছরের জন্য ভালো ভালো শেয়ারে বিনিয়োগ করতে হবে—এ শর্তে এবং পাঁচ বছরের মধ্যে কোনো লস হলেও ঐ প্রতিষ্ঠানকে কোনো মন্দ ঋণ সঞ্চিতি করতে হবে না। এটি ছিল অত্যন্ত একটি সঠিক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত পুঁজিবাজারের জন্য, যা ইতিপূর্বে আর কখনো হয়নি। অনেক অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা এ সিদ্ধান্তটির সমালোচনা করেছে এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর এ টাকা নেওয়ার এবং বিনিয়োগ করা বিষয়ে তখন কোনো গুরুত্ব দেয়নি। এটা ছিল প্রধানমন্ত্রীর তারল্য সংকট নিরসনে একটি সঠিক সিদ্ধান্ত এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগে সুযোগ। এরপর করোনা ভাইরাস আতঙ্কে যখন ক্রমাগত শেয়ার বিক্রির চাপ, বিদেশি পোর্ট ফলিওতে শেয়ার বিক্রির চাপ, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান মার্জিন রুল মেনে বিনিয়োগকারীর অ্যাকাউন্টে ফোর্স সেল, সব মিলে লাখো বিনিয়োগকারী যখন দিশেহারা, তখন ১৮ মার্চ অর্থমন্ত্রীকে নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া পুঁজিবাজার-সংক্রান্ত সব সিদ্ধান্ত বিনিয়োগকারীকে উজ্জীবিত করেছে। ফ্রি-ফল বন্ধ হয়েছে।

যাদের ২০০ কোটি টাকা প্রদান করা হয়েছে পর্যায়ক্রমে তারা বিনিয়োগ শুরু করেছে। ব্যাংকগুলো ক্যাশ ডিভিডেন্ড দেওয়া শুরু করেছে এবং ক্যাপিটাল মার্কেট স্ট্যাবল হতে শুরু করেছে। আমরা যারা পুঁজিবাজারের সঙ্গে জড়িত আছি, তালিকাভুক্ত কোম্পানির পরিচালকরা, বাংলাদেশ ব্যাংক, বাংলাদেশ সিকিউরিটিস অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন, স্টক এক্সচেঞ্জ,  ব্রোকার-ডিলার, মার্চেন্ট ব্যাংক যদি সবাই সঠিক সময় সঠিক ভূমিকা পালন করে তাহলে একটি শক্তিশালী ও স্থিতিশীল পুঁজিবাজার গড়ে উঠবে। তবে ব্যাংক পরিচালনা পরিষদ থেকে ব্যাংক ব্যবস্থাপনাকে সম্পূর্ণ আলাদা করতে হবে। দক্ষ ব্যাংক ব্যবস্থাপনাকে সম্পূর্ণ আলাদা করতে হবে। দক্ষ ব্যাংক ব্যবস্থাপনা টিম গড়ে তুলতে হবে। বর্তমানে আমরা যেটা দেখতে পাই, বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠানের স্বতন্ত্র পরিচালক এ প্রতিষ্ঠানের স্পনসর পরিচালকদের ইচ্ছা-অনিচ্ছাই নিয়োগ দেওয়া হয়ে থাকে, তাতে করে এ স্বতন্ত্র পরিচালকরা ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ রক্ষা করতে পারে না। এতে করে আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কোনো সুশাসন থাকে না। সবাইকে বুঝতে হবে, ব্যাংকের পরিচালকদের টাকায় ব্যাংক পরিচালিত হয় না, ব্যাংক পরিচালিত হয় আমানতকারীদের টাকায়। অতএব, আমানতকারীদের টাকা রক্ষা করার জন্য অর্থমন্ত্রীকে অত্যন্ত কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। যারা ইচ্ছাকৃত খেলাপি তাদের আইনের আওতায় এনে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে, দেউলিয়া আইনকে যুগোপযোগী করতে হবে। পৃথিবীর অন্য দেশ যেভাবে খেলাপি ঋণের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিচ্ছে, ঠিক সেভাবে ব্যবস্থা নিতে হবে। এ মুহূর্তে অর্থমন্ত্রী যে কাজটি পুঁজিবাজারের স্বার্থে জরুরিভাবে করতে পারেন সেটি হলো কোম্পানি বাই ব্যাক আইন। অর্থাত্ যে সব অত্যন্ত স্ট্রং যাদের রিজার্ভ ভালো, গ্রোথ ভালো, ইপিএস ভালো সেসব কোম্পানি যে কারণেই হোক বাজার যখন খারাপ থাকে তখন কোম্পানি যদি মনে করে তার শেয়ারটি এই দামে ক্রয়-বিক্রয় ঠিক না, তখন কোম্পানির তার রিজার্ভ এবং রিটেইনেড আর্নিংস থেকে বাজার শেয়ার কেনার ঘোষণা দিয়ে তার শেয়ারটি বাজারে স্ট্যাবল করতে পারে এবং দরপতন ঠেকাতে পারে। এতে করে বিনিয়োগকারী উপকৃত হয় এবং সেই কোম্পানির ওপর বিনিয়োগকারীর আস্থা অনেক বেড়ে যায়।

লেখক : সাবেক প্রেসিডেন্ট ও বর্তমান পরিচালক, ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ লিমিটেড