ছুটি পেয়ে গ্রামে ফেরা, করোনা নিয়ে যাচ্ছেন না তো?

আপডেট : ২৮ মার্চ ২০২০, ২২:০৬

বিশ্বব্যাপী মহামারি আকার ধারণ করা নোভেল ভাইরাস কোভিড-১৯ যা করোনা নামে পরিচিত। এ তথ্য শুধু বাংলাদেশ নয় সারা বিশ্বের কারো কাছেই অজানা নয়। করোনা ভাইরাসের বিশ্ব পরিভ্রমণ যাত্রায় সর্বশেষ যোগ হয়েছে উগান্ডা। এ ভাইরাসটি এতই শক্তিশালী যে চিকিত্সা বিজ্ঞানীদের মতে এটি এ পর্যন্ত ৩৮০ বারের মতো এর গঠন পরিবর্তন করেছে, যার কারণে নির্দিষ্ট কোনো ওষুধের প্রতিষেধক হিসেবে কাজ করছে না। করোনা ভাইরাস সর্বপ্রথম  মহামারি রূপ ধারণ করে পৃথিবীর অন্যতম আধুনিক দেশ চীনের উহান নগরীতে। উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে ইতোমধ্যে এ ভাইরাসের ক্ষতির সক্ষমতা, মৃত্যুর হার, ছড়ানোর মাধ্যম সম্পর্কে কম-বেশি সকলেই অবগত আছি। প্রশ্ন হচ্ছে, চীন যেভাবে করোনা ভাইরাস মোকাবিলা করে জয়ী হতে যাচ্ছে পৃথিবীর অন্যান্য দেশ বিশেষ করে উন্নয়নশীল ও অনুন্নত দেশগুলো কী সেভাবে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারবে? যদি পারে তাহলে তো ভালো কিন্তু না পারলে কী হবে?

 বাংলাদেশ একটি উন্নয়নশীল দেশ। এ দেশের আয়ের একটা বড়ো অংশ আসে প্রবাসীদের দেওয়া রেমিট্যান্স থেকে। করোনা ভাইরাস যখন চীনে প্রথম ধরা পড়ল তখন আমরা চিন্তিত হয়ে পড়লাম চীনে অবস্থানরত আমাদের বাংলাদেশিদের নিয়ে। বাংলাদেশ সরকার চীনা প্রবাসীদের দেশে ফিরিয়ে আনার প্রশ্নে ত্বরিত পদক্ষেপ নিয়ে তাদের অনেককে বিশেষ বিমান পাঠিয়ে ফেরত আনলেন। সংক্রমণ প্রতিরোধে প্রাথমিক পদক্ষেপ হিসেবে প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টাইনের ব্যবস্থা করলেন। মানুষ স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। পরবর্তীকালে যখন মধ্যপ্রাচ্য, স্পেন, আমেরিকা, ইতালিসহ অন্য দেশে এ ভাইরাস ভীষণভাবে ছড়িয়ে পড়ল। সেই দেশগুলোতে অবস্থানরত বাংলাদেশিরা বিদ্যুেবগে দেশে ফিরতে শুরু করল। সারা দেশের মানুষের উদ্বেগ-উত্কণ্ঠা এবার বহুগুণ বেড়ে গেল। সবার মনে একটি শঙ্কা উঁকি দিতে শুরু করল বিশ্বের আক্রান্ত দেশগুলো থেকে যেহারে লোকজন ফিরে আসছে না জানি মাতৃভূমি বাংলাদেশের কী হয়! জনসাধারণের আশঙ্কাই সত্যি হলো ৮ মার্চ ইতালিফেরত প্রবাসীর দেহে করোনা ভাইরাস শনাক্ত হলো। আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ল সর্বত্র। দেশের সকলে মনে করে প্রবাসীদের দেশে আসতে না দিলে করোনা ভাইরাস আমাদের দেশে আসত না। বিষয়টি আসলে তেমনই। কিন্তু তাই বলে সরকার তো আর নিজ দেশের নাগরিকদের  দেশে না আসতে দিতে পারে না। বাংলাদেশ সরকার করোনা ভাইরাস  নির্মূলে ত্বরিত ব্যবস্থা নিলেন। মুজিব শতবর্ষের অনুষ্ঠান বাতিল করলেন, বন্ধ করে দিলেন দেশের সকল স্কুল-কলেজ, নিষিদ্ধ করা হলো সকল গণজমায়েত। কিন্তু দিন যত গড়াচ্ছিল অবনতি হতে থাকল অবস্থার। এমতাবস্থায়, সরকারও কঠিন থেকে কঠিনতর পদক্ষেপ নিতে শুরু করলেন। গৃহীত  পদক্ষেপগুলোর মধ্যে সর্বশেষ পদক্ষেপ ছিল সরকারি-বেসরকারি সকল অফিস ১০ দিনের জন্য বন্ধ ঘোষণা। আমরা জাতি হিসেবে খুবই আবেগী। লোকজন ভাবল অনেকদিন যাবত্ পরিবার-পরিজনকে সময় দেওয়া হয় না, ছুটি যখন পেয়েছি তাহলে বাড়িতে চলে যাওয়াই ভালো। তারা একটিবারের জন্যও চিন্তা করল না সরকার কেন তাদের ছুটি দিল কেনই বা দলবেঁধে তাদের বাড়িতে যেতে হবে! বাঙালিরা এমন কেন! রেমিট্যান্স যোদ্ধারা যখন দেশে আসতে ছিল পরিবেশ ও পরিস্থিতি অনুযায়ী সরকার অনুরোধ করেছিল তাদেরকে বাড়িতে অবস্থান করার জন্য। কিন্তু এতদিন বাদে দেশে এসে কি আর বাড়িতে থাকা যায়! তারা সরকারি নির্দেশনা অমান্য করে অন্যান্য সাধারণ মানুষের সঙ্গে মিশে গেল। বাড়তে থাকল করোনা আক্রান্তের সংখ্যা। মৃত্যুও হয়েছে কয়েকজনের। এমতাবস্থায়, আমাদেরকে সব সময় সতর্ক থাকতে হবে। অথচ এই সচেতনতার ব্যাপারে আমরা সবচেয়ে পিছিয়ে।

দেশের মধ্যে রাজধানী ঢাকা এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত। সাধারণ ছুটি ঘোষণার পর থেকেই ঢাকা থেকে দলে দলে মানুষের গ্রামে ফেরার হিড়িক পড়ে গেল। এটি ভুলে গেলে চলবে না প্রবাস থেকে যারাই দেশে ফিরেছিল তারা কিন্তু প্রায় সকলেই সুস্থ ছিল। আর আপনারা যারা পরিবারের সঙ্গে দেখা করতে যাচ্ছেন তারা প্রায় সকলেই সুস্থ আছেন। যে পরিবারের জন্য অক্লান্ত পরিশ্রম করছেন সেই তাদের জন্য করোনা ভাইরাস উপহার হিসেবে নিয়ে যাচ্ছেন না তো! উপায় এখন একটাই ঘর থেকে বের না হয়ে প্রত্যকেই নিজ নিজ জায়গায় অবস্থান করুন। সচেতন হউন, পরিষ্কার থাকুন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা প্রদত্ত স্বাস্থ্য বিধি মেনে চলুন। সম্মিলিত সহযোগিতা, প্রচেষ্টা ছাড়া সরকারের একার পক্ষে মহামারি আকার ধারণ করা এই করোনা ভাইরাস মোকাবিলা করা প্রায় অসম্ভব।

n লেখক :সাবেক শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়