করোনা ভাইরাস নিয়ে এখন উদ্বেলিত বিশ্ব। প্রতিদিন বাড়ছে আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা। সবার দৃষ্টি এখন বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) নিয়মিত ব্রিফিংয়ের দিকে। এ রকম পরিস্থিতিতে সংস্থার তথ্য ভান্ডারের দিকে নজর পড়েছে শীর্ষ স্থানীয় হ্যাকারদের। সংস্থার একজন সিনিয়র কর্মকর্তা বার্তাসংস্থা রয়টার্সকে বলেছেন, মার্চে তাদের ওয়েবসাইট টার্গেট করে হ্যাকিং চেষ্টা কয়েকগুণ বেড়ে গেছে। তবে হ্যাকারদের এসব চেষ্টা সফল হয়নি বলে তিনি জানিয়েছেন।
ডব্লিউএইচওর চিফ ইনফরমেশন সিকিউরিটি অফিসার ফ্লাভিও আজ্জিও বলেছেন হ্যাকারদের পরিচয় স্পষ্ট নয় এবং এ পর্যন্ত তাদের প্রচেষ্টা সফল হয়নি। তবে তিনি সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন করোনা প্রাদুর্ভাব বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ডব্লিউএইচও এবং এর সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলোর ওয়েবসাইট উদ্দেশ্য করে হ্যাকিং বেড়েছে। ডব্লিউএইচওর সাইবার সিকিউরিটি এক্সপার্ট আলেক্সান্ডার উর্বেলিস রয়টার্সকে হ্যাকিংয়ের কথা প্রথম অবহিত করেছিলেন। উল্লেখ্য উর্বেলিস নিউ ইয়র্ক ভিত্তিক ব্ল্যাকস্টোন ল ফার্মের একজন আইনজীবী। এই ফার্মটি সন্দেহভাজন ইন্টারনেট ডোমেইন রেজিস্ট্রেশনের বিষয়টি নিয়ে কাজ করে থাকে। উর্বেলিস বলেন, এটি ১৩ মার্চের ঘটনা। তিনি লক্ষ করেন, একদল হ্যাকার ক্ষতিকর প্রোগ্রাম ব্যবহার করে ডব্লিউএইচওর অভ্যন্তরীণ ইমেইল ব্যবহার করার চেষ্টা করছে। তিনি বলেন, ‘আমি এটি দ্রুতই উপলব্ধি করতে পারি মহামারি চলাকালে ডব্লিউএইচওর ওয়েবসাইটের ওপর এটি ছিল একটি লাইভ হামলা। তবে এর পেছনে ঠিক কারা দায়ী তা আমি ঠিক বুঝতে পারিনি।’ তবে এ বিষয়ে ওয়াকিবহাল আরেকটি সূত্র জানিয়েছে সন্দেহভাজন কাজটি করেছে ডার্কহোটেল নামে একটি এলিট হ্যাকার গ্রুপ। ধারণা করা ২০০৭ সালে থেকে সাইবার এসপিওনাজ অপারেশন চালিয়ে এসেছে। হ্যাকাররা ডব্লিউএইচওর কাছে কিছু ইমেইল ঠিকানা দিয়ে সেখানে মেইল পাঠানোর অনুরোধ করেছিল। অনুরোধ মতো ঠিকানাগুলোতে মেইল পাঠিয়েও কোনো জবাব পাওয়া যায়নি। উর্বেলিসের মতো আজ্জিও মনে করেন, ডব্লিউএইচওর বিভিন্ন স্টাফদের মেইল পাসওয়ার্ড চুরি করা এর উদ্দেশ্য ছিল।
টেলিফোনে রয়টার্সকে দেয়া ঐ সাক্ষাত্কারে আজ্জিও বলেন, নির্দিষ্ট করে বলা না গেলেও এটা ঠিক যে করোনা প্রাদুর্ভাবের পর ডব্লিউএইচওর সংশ্লিষ্ট কিছু প্রতিষ্ঠানকে টার্গেট করে সাইবার আক্রমণ বেড়েছে। গোপন তথ্য ছাড়াও তহবিল থেকে অর্থ হাতিয়ে নেয়া এর কারণ হতে পারে বলে তিনি মনে করেন। করোনা বা কোভিড-১৯ এর প্রকোপ ২০১৯ সালের ৩১ ডিসেম্বর থেকে শুরু হয়। জানুয়ারিতে মোটামুটি চীনে এর বিস্তার সীমিত থাকলে ফেব্রুয়ারি থেকে ইউরোপ ও আমেরিকায় এর বিস্তার শুরু হয়। বিভিন্ন সরকার সাধারণ মানুষকে ঘরে থেকে কাজ করতে বলে এবং শাটডাউন লকডাউন শব্দগুলো হয়ে ওঠে সবার নিত্য পরিভাষায়। তথ্যপ্রযুক্তির এই যুগে ঘরে বসে কাজ করার কনসেপ্টটি নতুন কিছু নয়। তবে করোনা ভাইরাস একে নতুন মাত্রা দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন ও অন্যান্য দেশের সাইবার বিশেষজ্ঞরা ফেব্রুয়ারিতে এ বিষয়ে সতর্কতা উচ্চারণ করেছিলেন। তারা আশঙ্কা প্রকাশ করেন যে পরিবর্তিত পরিস্থিতির সুযোগ হ্যাকাররা কাজে লাগাতে পারে।
ডব্লিউএইচও জাতিসংঘের একটি অঙ্গপ্রতিষ্ঠান। জাতিসংঘ ও এর অঙ্গপ্রতিষ্ঠানগুলো সময় সময় সাইবার আক্রমণের শিকার হয়ে থাকে। তবে করোনা আক্রমণের পর কেন এই সময় এটি বেশি করে হচ্ছে সে ব্যাপারে নিশ্চিত কিছু বলতে পারছেন না আজ্জিও। রুমানিয়াভিত্তিক সাইবার সিকিউরিটি ফার্ম বিটডিফেন্ডার এবং মস্কোর ক্যাসপারস্কি জানিয়েছে করোনার প্রাদুর্ভাব শুরুর পর ডার্কহোটেল পূর্ব এশিয়ায় সাইবার এস্পিওনাজ করেছে বলে তাদের নজরদারিতে ধরা পড়েছে। তাদের টার্গেটের মধ্যে বিশেষ করে চীন, জাপান, উত্তর কোরিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি কর্মকর্তা এবং ব্যবসায়িক নেতৃবৃন্দ ছিলেন। বর্তমানে করোনা প্রতিষেধক গবেষণার যে কোনো তথ্য অত্যন্ত মূল্যবান এবং যে কোনো দেশের গোয়েন্দা বিভাগের এর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা একটি বাড়তি দায়িত্ব। এ অবস্থায় হ্যাকারদের তত্পরতা বেড়ে যাওয়াটা অস্বাভাবিক নয় বলে অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করেন। উর্বেলিস বলেন, প্রতিদিনই করোনাসংশ্লিষ্ট হাজার হাজার ওয়েবসাইট খোলা হয়েছে। তিনি বলছেন, এর অনেকগুলোই ক্ষতিকর, ছদ্মবেশে কাজ করে থাকে হ্যাকারদের জন্য।
