বিনা কারণে ঘরের বাইরে পাড়া-মহল্লায় গ্রুপ আড্ডা

আপডেট : ২৯ মার্চ ২০২০, ২৩:০৫

কোনো কারণ ছাড়াই কেউ কেউ ঘরের বাইরে যাচ্ছেন। রাজধানীর মূল সড়কগুলোতে তেমন মানুষ ও যানবাহন দেখা না গেলেও পাড়া-মহল্লাগুলোর চিত্র কিছুটা ভিন্ন। বিশেষ করে তরুণদের কাউকে কাউকে চার-পাঁচ জন করে গ্রুপ আড্ডা দিতে দেখা যাচ্ছে। বিভিন্ন বয়সের মানুষকেও দেখা যাচ্ছে দোকানের সামনে, গলির মুখে, বিভিন্ন ভবনের সিঁড়িতে কিংবা গলির রাস্তার ওপর দাঁড়িয়ে দল বেঁধে গল্প করছেন। প্রাণঘাতী করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ রোধে একজন আরেকজনের সঙ্গে যে দূরত্ব বজায় রাখা উচিত বলে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) ও বিশেষজ্ঞরা সর্বাধিক গুরুত্ব দিচ্ছেন, সেটির তোয়াক্কা করছেন না বিনা কারণেই ঘর থেকে বের হওয়া এসব মানুষ। তাই নিজেরা ঝুঁকিতে পড়ছেন এবং অন্যকেও তারা ঝুঁকিতে ফেলছেন।

২৬ মার্চ থেকে রাজধানীসহ গোটা দেশ অঘোষিত লকডাউনে। সরকার, স্বাস্থ্য বিভাগ, সশস্ত্র বাহিনী, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও বিশেষজ্ঞরা দেশবাসীর প্রতি বারবার আহ্বান জানাচ্ছেন, সবাই যেন ঘরে অবস্থান করেন। অতি জরুরি কাজ, যেমন পেশাগত বা চাকরির প্রয়োজনে এবং ওষুধ ও খাদ্যসামগ্রীর মতো জরুরি পণ্য কিনতে স্বল্প সময়ের জন্য বাইরে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। প্রাণঘাতী এই করোনা ভাইরাসের প্রকোপ ঠেকাতে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার জন্য গোটা বিশ্ব সর্বাধিক গুরুত্ব দিচ্ছে। কিন্তু কেউ কেউ সেটিকে গুরুত্ব না দিয়ে অযথাই পাড়া-মহল্লায় জটলা করছেন।

রাজধানীর কয়েকটি এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, মুদিদোকান, খাবারের হোটেল, ওষুধের দোকান, কাঁচাবাজার, মাংসের দোকানের সামনে বেশ কয়েক জন দল বেঁধে গল্প করছেন। কাউকে কাউকে দেখা যায় গলিপথের মোড়ে মোড়ে চার-পাঁচ জন করে খুব কাছাকাছি দাঁড়িয়ে বা বসে আড্ডা দিচ্ছেন। কেউ কেউ উদ্দেশ্য ছাড়াই রাস্তায় হাঁটছেন, মোবাইলে কথা বলছেন। এত সতর্কতার মধ্যেও রাজধানীর হাতিরঝিল এলাকায় রাতের বেলায় ব্রিজগুলোর ওপরে মোটরসাইকেলে বসে ছেলেমেয়েদের গল্প করতে দেখা যাচ্ছে।

রাজধানীর হাতিরঝিল লাগোয়া তেজগাঁও এলাকার বাসিন্দা মিজানুর রহমান জানান, তার বাসার সামনে তিন-চারটি মুদিদোকান, কয়েকটি ওষুধের দোকান রয়েছে। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত নানান বয়সের লোকজনকে সেখানে গ্রুপ বেঁধে আড্ডা দিতে দেখেন। এতে জরুরি পণ্য কেনার জন্য যারা দোকানে যাচ্ছেন কিংবা রাস্তায় বের হচ্ছেন, তারাও ঝুঁকির মধ্যে পড়ছেন। কারণ সেখানে প্রয়োজনীয় সামাজিক দূরত্ব বজায় থাকছে না। এছাড়া যখন-তখন যত্রতত্র উন্মুক্ত স্থানে হাঁচি-কাশি দিচ্ছেন, থুথু ফেলছেন। হাঁচি-কাশির শিষ্টাচারও মানা হচ্ছে না। তাই হাঁচির জলকণা গিয়ে আরেক জনের শরীরে লাগছে। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে নিয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দেখা উচিত বলে মত দেন তেজগাঁওয়ের এই বাসিন্দা।

দেশের বিশিষ্ট মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. মোহিত কামাল ইত্তেফাককে বলেন, যাদের আতঙ্কের মাত্রা ১০ ডিগ্রির নিচে, তারা বিষয়টিকে পাত্তা বা গুরুত্ব দিচ্ছেন না। যারা পাত্তা দিচ্ছেন না, মূলত তারাই এই প্রাণঘাতী ভাইরাসের সংক্রমণ ঘটাচ্ছেন। তার মতে, সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার ক্ষেত্রে সবাই সচেতন না হলে এটা ভয়ংকর পরিণতি ডেকে আনতে পারে। ছেলেমেয়েরা যাতে বিনা কারণে বাইরে ঘোরাফেরা করতে না পারে, এ ব্যাপারে অভিভাবকদেরও খেয়াল রাখা দরকার বলে মত দেন এই মনোরোগ বিশেষজ্ঞ।

করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ প্রতিরোধে দেশব্যাপী সরকার ঘোষিত সাধারণ ছুটি চলছে। ছুটির শুরু থেকে প্রথম তিন দিন ঢাকার মূল সড়কসহ পাড়া-মহল্লার অলিগলিতেও তেমন লোকজন দেখা যায়নি। প্রথম দিকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও এ ব্যাপারে কড়াকড়ি আরোপ করে। অযথা রাস্তায় ঘোরাঘুরির কারণে কোথাও কোথাও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে লাঠিপেটা করতেও দেখা যায়। বিষয়টি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও গণমাধ্যমে সমালোচনা হলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এখন শুধু সচেতনতামূলক কার্যক্রম চালাচ্ছে। মহল্লায় মহল্লায়ও মাইকিং করে মানুষকে ঘরে থাকার আহ্বান জানানো হচ্ছে। কিন্তু ছুটির তিন দিন পার না হতেই কেউ কেউ অধৈর্য হয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে আসছেন।

রাস্তায় ঘোরাঘুরি করা এবং পাড়া-মহল্লায় দল বেঁধে যারা আড্ডা দিচ্ছেন তাদের কেউ কেউ বলছেন, ‘এভাবে কতক্ষণ ঘরে থাকা যায়!’ গতকাল রবিবার দুপুরে রাজধানীর রামপুরায় বনশ্রীর একটি মুদিদোকানের সামনে গিয়ে দেখা যায়, তিন যুবক দোকানের সামনের সিঁড়িতে পাশাপাশি বসে আড্ডা দিচ্ছেন। কারো মুখেই মাস্ক নেই। তিন জনই কিছুক্ষণ পরপর সামনে থুথু ফেলছেন। কেন তারা এখানে বসে আছেন, জানতে চাইলে দোকানদার সজীব বলেন, ‘তারা কথা শোনে না। ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে আড্ডা দিচ্ছেন। কিছুক্ষণ পরপর থুথু ফেলে নিজেদের ও অন্যদেরও ক্ষতির কারণ হচ্ছেন।’