মানুষের কল্যাণ করা আপনাদের দায়িত্ব

আপডেট : ২৮ ডিসেম্বর ২০১৮, ০০:৩৩

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, প্রধানমন্ত্রীত্ব নয়, জাতির পিতার কন্যা হিসেবেই তিনি গর্ব অনুভব করেন। গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে তেজগাঁওস্থ প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে সরকারের মেয়াদের শেষ কর্মদিবসে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সর্বস্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারিদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময়কালে শেখ হাসিনা আরো বলেন, এই পদটাকে কিভাবে উপভোগ করবো সেই চিন্তা করি না, মানুষের কল্যাণে নিজেকে কতটুকু নিয়োজিত করতে পারলাম আমার কাছে সেটাই বিবেচ্য। বিদায় বেলায় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়কে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আখ্যায়িত করে তিনি সরকারি কর্মচারীদেরকে তাদের দায়িত্বের কথাও স্মরণ করিয়ে দেন।

টানা দ্বিতীয় মেয়াদে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার শেষ কার্যদিবস ছিল গতকাল। এ কারণে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন তিনি। ৩০ ডিসেম্বর একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এ নির্বাচনে যারা সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন পাবেন তারাই সরকার গঠন করবেন। বিদায় বেলা বক্তব্য দিতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তার কার্যালয়ের কর্মচারীদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, সবার ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় বাংলাদেশ আজ উন্নয়নের মহাসড়কে। শেখ হাসিনা বাংলাদেশকে এগিয়ে নিতে সবার সহযোগিতা কামনা করে বলেন, ‘আমি থাকি বা না থাকি, আপনাদের কাছে আবেদন এটাই থাকবে আপনারা আপনাদের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করবেন, কারণ আপনারা সরকারি কর্মচারী। আপনাদের বেতন-ভাতা বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের ট্যাক্সের টাকাতেই হয়। কাজেই তাদের সেবা করা, কল্যাণ করা, আপনাদের দায়িত্ব।’

প্রধানমন্ত্রী আবেগাপ্লুত কণ্ঠে বলেন, আমি কিন্তু নিজেকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে চিন্তা করি না। আমি হচ্ছি বাবার কন্যা ‘ফাদারস ডটার।’ সন্তান হিসেবে আমি আমার দায়িত্ব পালন করি। আমি জাতির পিতার কন্যা। আমি আপনাদের কাছে এটুকুই চাইবো আপনারা সবসময় আমাকে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের কন্যা হিসেবেই আপনাদের একান্ত আপনজন হিসেবে দেখবেন। সেটাই আমি চাই। সেটাতেই আমি গর্বিত বোধ করি। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নয়। তিনি বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীত্ব, এটা একটা দায়িত্ব পেয়েছি। কাজ করার সুযোগ পাই এর মাধ্যমে। দেশের কল্যাণ করার একটা সুযোগ পাই। সেটাই আমার কাছে বড়।’ তিনি সরকারের ধারাবাহিকতা বজায় থাকার ওপর গুরুত্বারোপ করে বলেন, ‘১০ বছর একটানা থাকায় অনেক কাজ করে যেতে পেরেছি। এখনও বহুকাজ বাকি। সেটাও নির্ভর করে বাংলাদেশের জনগণের ওপর। আগামী ৩০ তারিখে যদি তারা ভোট দেয় তাহলে আবার আসতে পারবো এবং কাজগুলোকে শেষ করতে পারবো।’ শেখ হাসিনা বলেন, ‘আর তা না হলে মানুষের ভাগ্য মানুষ বেছে নেবে। এখানে আমার কোনো ক্ষোভ বা দুঃখ নেই। কেননা আমার নিজের জীবনে চাওয়া-পাওয়ার কিছু নেই।’

বাংলাদেশের মানুষের ভাগ্য গড়াই তার একমাত্র চাওয়া উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমি একথা সবসময় চিন্তা করি যে, আমার বাবা এদেশটাকে স্বাধীন করে দিয়ে গেছেন। তার মনে যে আকাঙ্ক্ষা ছিল মানুষকে নিয়ে, সেই আকাঙ্ক্ষা যেন আমি পূরণ করে যেতে পারি। যেন তার আত্মা শান্তি পায়- বাংলাদেশের মানুষ আজ আর কষ্টে নেই তারা দুবেলা পেট ভরে খেতে পারছে।’ প্রধানমন্ত্রী তার ভাষণে দেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নসহ সরকারি কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধির প্রসঙ্গে বলেন, ১০টি বছর আপনাদের সঙ্গে কাজ করেছি, আমরা হচ্ছি টেম্পোরারি, আপনারা পার্মানেন্ট। আমরাতো ৫ বছরের জন্যই নির্বাচিত হয়ে আসি। তিনি বলেন, আমার সৌভাগ্য যে, আমরা দ্বিতীয়বার আসতে পেরেছি। তাই আমাদের উন্নয়ন প্রকল্পগুলো আজ দৃশ্যমান হয়েছে। আমাদের এই শাসনামলে গ্রাম পর্যায় পর্যন্ত মানুষের জীবনমানের পরিবর্তন হয়েছে। মঙ্গা পীড়িত দেশের উত্তর জনপদের উন্নয়ন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এই উত্তরবঙ্গে আমি বহুবার সফর করেছি। কিন্তু এবার যখন উত্তরবঙ্গে গেলাম তাদের জীবনমানের ব্যাপক পরিবর্তন লক্ষ্য করেছি। মানুষের জীবনমানের আরো উন্নয়ন করাই তার সরকারের আগামী দিনের লক্ষ্য উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, এজন্য আমরা নির্বাচনী ইশতেহারে প্রত্যেকটি গ্রামকে শহর হিসেবে গড়ে তোলার ঘোষণা দিয়েছি। যাতে সবধরনের নাগরিক সুবিধাগুলো গ্রামের মানুষ পেতে পারে। তার সরকার উন্নয়নের সমতায় বিশ্বাসী উল্লেখ করে সরকারি কর্মচারী থেকে শুরু করে দলিত হরিজন শ্রেণির জন্যও ফ্ল্যাট করে দেওয়ার সরকারের পদক্ষেপ তুলে ধরে তিনি বলেন, এভাবে বস্তিবাসীর জন্য আমরা ফ্ল্যাট করে দেব এবং সাধারণ মানুষ প্রত্যেকেই যেন একটা সুন্দর জীবন পায় সেটা নিশ্চিত করাই আমাদের লক্ষ্য।

বিভিন্ন পেশার অধস্তন কর্মচারীদের নাম পরিবর্তন প্রসঙ্গে শেখ হাসিনা বলেন, নাম পরিবর্তন আমি এজন্য করলাম কারণ, তাদের ছেলে-মেয়ে যখন শিক্ষিত হয় তখন তাদেরকে নাপিত বা সুইপার বলা অসম্মানজনক হয়। তাছাড়া এখন একটু আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করেই তারা কাজগুলো করতে পারে। তাই, এইসব পদবি পরিবর্তন করলাম। তিনি বলেন, ’৯৬ সালে যখন সরকারে তখন সেনাবাহিনীর অধস্তনদের পদবিটা পরিবর্তন করে দিয়েছি। এরপর আমাদের প্রশাসন ও অন্যান্য ক্ষেত্রে যারা কাজ করেন তাদের সম্মানজনক একটা পদবি যেন হয় তার ব্যবস্থা করে দিয়েছি। কিছু ব্রিটিশ আমলের পদবি ছিল যেগুলো থাকার কোনো যৌক্তিকতাই ছিল না। সকল ধর্মাবলম্বীদের বাসস্থল এই বাংলাদেশে সকল ধর্মের মানুষ যেন একটি উত্সব একত্রে উদযাপন করতে পারে সেই চিন্তা থেকেই নববর্ষে ভাতার ব্যবস্থা করা হয়েছে বলেও প্রধানমন্ত্রী উল্লেখ করেন।

বিদায় বেলায় কবি সুকান্তের ভাষায় শেখ হাসিনা বলেন, ‘চলে যাব- তবু যতক্ষণ দেহে আছে প্রাণ/প্রাণপণে পৃথিবীর সরাব জঞ্জাল? এ বিশ্বকে এ শিশুর বাসযোগ্য করে যাব আমি/ নবজাতকের কাছে এই আমার দৃঢ় অঙ্গীকার।’ প্রধানমন্ত্রী পরে তার কার্যালয়ের মেইন গেটের সামনের দেওয়ালে স্মৃতিময় ১৯৫২ থেকে ’৭১ এর মুক্তিসংগ্রাম পর্যন্ত বাঙালির গৌরবের ইতিহাস সমৃদ্ধ একটি টেরাকেটার ম্যুরাল পরিদর্শন করেন। ছাত্রলীগ নেতা মুহম্মদ আরিফুজ্জামান নুর নবী এই ম্যুরালের ভাস্কর।

প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব মো. নজিবুর রহমানের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা এইচটি ইমাম, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এসডিজি বিষয়ক মুখ্য সমন্বয়ক মো. আবুল কালাম আজাদ, প্রধানমন্ত্রীর সামরিক সচিব মেজর জেনারেল মিয়া মোহাম্মদ জয়নুল আবেদীন, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সচিব সাজ্জাদুল হাসান, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মহাপরিচালক বেগম নাসরিন আফরোজ, প্রেস সচিব ইহসানুল করিম, এসএসএফ-এর মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মুজিবুর রহমান, প্রটোকল অফিসার খুরশীদ আলম, সহকারী পরিচালক মো. মকবুল হোসেন, একান্ত সচিব (২) অন্যান্যের মধ্যে অনুষ্ঠানে অনুভূতি ব্যক্ত করে বক্তৃতা করেন।