রোগ-ব্যাধিতে হতাশা মুমিনের বৈশিষ্ট্য নয়

আপডেট : ০২ এপ্রিল ২০২০, ২১:১১

ফিরোজ আহমাদ

রোগ-ব্যাধি মুমিনের ইমান পরীক্ষার কষ্টি পাথর বা মাধ্যম। যেদিন পর্যন্ত পৃথিবীতে মানুষ থাকবে, সেদিন পর্যন্ত সময় সময়ে আল্লাহতায়ালা রোগ-ব্যাধি দিয়ে ইমানের পরীক্ষা নিতেই থাকবেন। পরীক্ষা মানেই পরীক্ষিত হওয়ার আতঙ্ক। এর পরও পরীক্ষা দিয়ে পাশ করতে হবে। ইহার কোনো বিকল্প নেই। মৃত্যু যেমন ধ্রুব সত্য। কেউ তা রোধ করতে পারে না। তদ্রূপ রোগ-ব্যাধিও মুমিন বান্দার ক্ষেত্রে একই রূপ। কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘আমি অবশ্যই তোমাদেরকে পরীক্ষা করব কিছু ভয়, ক্ষুধা এবং জান-মাল ও ফল-ফলাদির ক্ষতির মাধ্যমে।’ (সুরা বাকারা :১৫৫)। ‘আর ভালো এবং মন্দ দ্বারা আমি তোমাদেরকে পরীক্ষা করে থাকি।’ (সুরা আম্বিয়া :৩৫)।

সম্প্রতি বিশ্বব্যাপী করোনা ভাইরাসের আক্রমণে মানুষ আতঙ্কিত হয়ে পড়েছে। এক্ষেত্রে মুমিন বান্দার করণীয় হলো আতঙ্কিত না হয়ে আল্লাহর নিকট সাহায্য প্রার্থনা করা। তার করুণা ভিক্ষা প্রার্থনা করা। অতীত জীবনের সব ভুল-ত্রুটির জন্য ক্ষমা চাওয়া। তওবা ইস্তেগফার বেশি বেশি পাঠ করা। কারণ হাদিসের পরিভাষায় রোগ-ব্যাধি ও বালা-মুসিবত মুমিনের জন্য রহমতস্বরূপ। হযরত আবু হোরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত হয়েছে, হযরত রসুল (স) বলেছেন, ‘মুমিন ব্যক্তির উপমা হলো, সে যেন শস্যখেতের কোমল চারাগাছ। যে কোনো দিক থেকেই তার দিকে বাতাস আসলে বাতাস তাকে নুইয়ে দেয়। আবার যখন বাতাসের প্রবাহ বন্ধ হয়ে যায় তখন সোজা হয়ে দাঁড়ায়। বালা-মুসিবত তাকে নোয়াতে থাকে। আর ফাসিক হলো শক্ত ভূমির ওপর কঠিনভাবে সোজা হয়ে দাঁড়ানো বৃক্ষের ন্যায়, যাকে আল্লাহ যখন ইচ্ছা করেন ভেঙে দেন।’ (বোখারি: ৫২৪১)।

প্রত্যেকটি বালা-মুসিবত কিংবা রোগ-ব্যাধি আসার পেছনে কোনো না কোনো রহস্য লুকায়িত থাকে। যা একজন সাধারণের পক্ষে বুঝা সম্ভব নয়। আল্লাহতায়ালা এমনিতে বা অযথা কোনো কাজ করেন না কিংবা বান্দার ওপর কোনো বিষয় চাপিয়ে দেন না। যেমনটি আল্লাহতায়ালা রোগ-ব্যাধির ক্ষেত্রে করে থাকেন। তিনি রোগ-ব্যাধি প্রদানের মাধ্যমে বান্দার গোনাহ মাফ করে দেন। হযরত আবু হোরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত হয়েছে, হযরত রসুল (স) বলেছেন, ‘মুসলমানদের ওপর যে সব যাতনা, রোগ-ব্যাধি, উদ্বেগ-উত্কণ্ঠা, দুশ্চিন্তা, কষ্ট ও পেরেশানি আপতিত হয়, এমনকি যে কাঁটা তার দেহে বিদ্ধ হয়, এ সবের দ্বারা আল্লাহ তার গোনাহসমূহ ক্ষমা করে দেন।’ (বোখারি :৫২৩৯)। হযরত আয়েশা (রা) থেকে বর্ণিত হয়েছে, হযরত রসুল (স) বলেছেন, ‘কোনো ইমানদার ব্যক্তির শরীরে একটি কাঁটার আঘাত কিংবা তার চেয়ে অধিক কোনো আঘাত লাগলে আল্লাহতায়ালা তার একটি মাকাম বুুলুন্দ করে দেন কিংবা একটি গোনাহ মাফ করে দেন।’ (মুসলিম :৬৩২৮)।

দুনিয়াতে যত ধরনের রোগ-ব্যাধি রয়েছে—আল্লাহতায়ালাই মানুষকে প্রত্যেকটি রোগ-ব্যাধির চিকিত্সা পদ্ধতি শিক্ষা দিয়েছেন। এমন কোনো রোগ-ব্যাধি নেই, যে চিকিত্সা পদ্ধতি তিনি মানুষকে শিক্ষা দেননি। রোগ-ব্যাধি যেমন তিনি দিয়ে থাকেন, শেফাও তিনিই করে থাকেন। তিনিই আমাদের একমাত্র প্রভু। তিনি ছাড়া দ্বিতীয় আর কোনো শেফা দানকারী নেই। হযরত আবু হোরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত হয়েছে, হযরত রসুল (স) বলেছেন, ‘আল্লাহতায়ালা এমন কোনো রোগ অবতীর্ণ করেননি যার নিরাময়ের উপকরণ তিনি সৃষ্টি করেননি।’ (বোখারি :৫২৭৬)। হযরত আয়েশা (রা) থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন, আমি রসুল (স) কে প্লেগ রোগ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করেছিলাম। তিনি বলেন, তা হচ্ছে আল্লাহর এক প্রকার আজাব। যাকে ইচ্ছা আল্লাহ তার ওপর প্রেরণ করেন। তবে আল্লাহ মুমিনের জন্য তা রহমত বানিয়ে দিয়েছেন।’ (বোখারি :৩৩২)।

রোগ-ব্যাধির প্রাদুর্ভাবের সময় মুমিনদেরকে কখনো হতাশ হওয়া যাবে না। কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘তোমরা হতোদ্যম হয়ো না, চিন্তিত হয়ো না, তোমরা যদি ইমানদার হও তাহলে তোমরা বিজয়ী হবে।’ (সুরা আল-ইমরান :১৩৯)। ‘আমি যখন মানুষদের অনুগ্রহ আস্বাদন করাই, তখন তারা তাতে খুশি হয়; আবার যখন তাদেরই (মন্দ) কাজের কারণে তাদের ওপর কোন মুসিবত পতিত হয় তখন তারা সঙ্গে সঙ্গেই নিরাশ হয়ে পড়ে।’ (সুরা রুম :৩৬)। আল্লাহতায়ালা আমাদেরকে সব রকম রোগ-ব্যাধি, বালা-মুসিবত ও মহামারি থেকে শিক্ষা নেওয়ার তৌফিক দান করুন। আমীন।

—লেখক :ইসলামিক চিন্তাবিদ ও গবেষক