ডা. মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম সায়েম
সৃষ্টির শুরু থেকে আজ পর্যন্ত যখনি কোনো নতুন রোগ পৃথিবীতে দেখা দিয়েছে, তখনি সমসাময়িককালের গবেষকরা এর প্রতিষেধক তৈরির জন্য ছুটে গিয়েছেন প্রকৃতির কাছে। প্রকৃতিও কখনো নিরাশ করেনি। করোনা কোভিড-১৯ ভাইরাস যখন থেকে চীনের উহান প্রদেশে দেখা দিয়েছে, তখন থেকে প্রকৃতিতে এর প্রতিষেধক অনুসন্ধানে বিজ্ঞানীরা নিবেদিত। এ ভাইরাসটি একটি আর এন এ ভাইরাস। ক্রায়ো-ইলেকট্রনিক টমোগ্রাফি এবং ক্রায়ো-ইলেকট্রনিক মাইক্রোস্কোপ এ দেখতে এটির আকৃতি অনেকটা গোলাকার এবং যার বাইরের আবরণে মুকুটের মতো কাটা দেখা যায় বলে এটির নাম করোনা হয়েছে বলে ধারণা করা হয়। ভাইরাসটি ইতিপূর্বে স্তন্যপায়ী প্রাণী যেমন কুকুর, বাদুড়, মুরগি, সাপ, শূকুরের মধ্যে পাওয়া যেত।
অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে মানুষে সংক্রামিত হয়ে থাকতে পারে। এটি অনেকটা সার্স-কোভি এবং মার্স-কোভি ভাইরাসের মতো। ভাইরাসটি নিডোভাইরিডি পরিবারের সদস্য। এর চারটি জানা সাব গ্রুপ জানা গেছে—যা আলফা, বিটা, গামা এবং ডেলটা করোনা ভাইরাস নামে পরিচিত। এর জিনগত বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এর জেনোম বেশ বড়ো—যা ৩০ কিলোবাইট মতো। এতে সুগঠিত ও সুগঠিত নয় এমন অনেক জিন রয়েছে। এ জিনগুলোই ভাইরাস দ্বারা সৃষ্ট মহামারির জন্য দায়ী। যে চারটি সুগঠিত প্রোটিন রয়েছে তা হলো এস এম ই এবং এন প্রোটিন। এস প্রোটিন আক্রান্ত রোগীর পৃষ্ঠতলের সঙ্গে সংযুক্ত হতে সাহায্য করে। এম প্রোটিন প্রচুর পরিমাণে থাকে যা ভাইরাস দ্বারা সৃষ্ট প্রাদুর্ভাবের জন্য দায়ী। এম প্রোটিন, এন প্রোটিনের সঙ্গে সংযুক্ত হতে
সাহায্য করে। আর ই প্রোটিন ভাইরাস রিলিজ হওয়া এবং এন প্রোটিন বংশবৃদ্ধিতে সক্রিয় ভূমিকা পালন করে। ভাইরাসটি ৮০% আপেক্ষিক আর্দ্রতায় এবং ৪০০ সেলসিয়াস তাপমাত্রায় ৭ ঘণ্টার কম সময়, ৫০% আপেক্ষিক আর্দ্রতায় এবং ৪০০ সেলসিয়াস তাপমাত্রায় ২৪ ঘণ্টার বেশি, ২০% আপেক্ষিক আর্দ্রতায় এবং ৪০০ সেলসিয়াস তাপমাত্রায় ১২০ ঘণ্টার বেশি কোনো পৃষ্ঠতলে বেঁচে থাকতে পারে।
করোনা ভাইরাস সংক্রমণের লক্ষণ ও উপসর্গ : অন্যান্য ভাইরাস জ্বরের মতো করোনা ভাইরাসের লক্ষণ ও উপসর্গগুলো হলো—জ্বর ১০১ থেকে ১০৩ ডিগ্রি ফারেনহাইট বা তার বেশি হতে পারে। জ্বর দীর্ঘ সময় থাকতে পারে অথবা মাঝে মাঝে আসতে পারে। জ্বরের সঙ্গে সর্দি, গলাব্যথা, মাথাব্যথা, পুরো শরীরের মাংসপেশিতে ব্যথা, পাতলা পায়খানা, বমি বমি ভাব, বমি, রক্তকাশি, ব্রংকাইটিস এবং শ্বাসকষ্ট দেখা দিতে পারে। প্রাথমিক অবস্থায় ভাইরাসজনিত নিউমোনিয়া হলে ও পরবর্তীতে ব্যাকটেরিয়া দ্বারা সৃষ্ট নিউমোনিয়া দেখা দিতে পারে। এ পর্যন্ত চীনের উহান প্রদেশে করোনা ভাইরাসের যে লক্ষণের কারণে রোগীরা হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিল তাদের মধ্যে জ্বর (৭৭-৯৮%), কাশি (৪৬-৮২%), মাংসপেশিতে ব্যথা (১১-৫২%) এবং শ্বাসকষ্ট (৩-৩১%)। তবে বয়স্ক ও শিশুদের ক্ষেত্রে এর প্রকোপ বেশি। রোগ নির্ণয় : রোগ নির্ণয়ের ক্ষেত্রে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রদত্ত নির্দেশনা মেনে চলা যুক্তিসঙ্গত। রোগীর রক্ত, কফ, লালা এবং পায়খানা থেকে ৩-১৫ দিনের মধ্যে ভাইরাসের উপস্থিতি নিশ্চিত করা যায়। এজন্য আর টি পিসিআর (RT-PCR) ব্যবহার করতে হয়।
প্রতিরোধের উপায় : যেহেতু করোনা ভাইরাসের প্রতিষেধক এখনো আবিষ্কৃত হয়নি, তাই এ রোগের প্রতিরোধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করাই শ্রেয়। ধারণা করা হচ্ছে যে, এটি মার্স ও সার্স ভাইরাসের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী। তাই এই ভাইরাস প্রতিরোধে ব্যক্তিগত পর্যায়ে এবং সামস্টিক পর্যায়ে শক্তিশালী পদক্ষেপ নিতে হবে। আমরা দেখেছি—ইতালি বিষয়টিকে প্রাথমিক অবস্থায় হালকাভাবে নিয়েছিল বলে মৃত্যুর মিছিল অনেক লম্বা হয়েছে। সুতরাং আমাদের বর্তমান সরকার বিষয়টিকে জরুরি এবং গুরুত্ব দিয়েছে বলে হয়তো আমাদের এর ভয়ানক পরিস্থিতি দেখা নাও যেতে পারে। কিন্তু সাধারণ এবং বিদেশফেরত মানুষের মধ্যে এর বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার তেমন কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। যা ভয়াবহ বিপদের অশনিসংকেত দিচ্ছে। এক্ষেত্রে প্রিন্ট এবং ইলেকট্রনিক মিডিয়াকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে হবে। সরকার যে যে পদক্ষেপ নিয়েছে এবং আইন করেছেন তা যথাযথ পালন করা হবে সবার জন্য মঙ্গলজনক। তার পরও যে যে প্রতিরোধ ব্যবস্থা গ্রহণ করা অবশ্যই করণীয় তা হলো—অপ্রয়োজনে ঘুরাঘুরি না করা, বাইরে একান্ত বের হতে হলে মাস্ক ব্যবহার করা তবে এক্ষেত্রে সার্জিকেল মাস্ক বা এন ৯৫ মাস্ক ব্যবহার করা শ্রেয়, বাইরে থেকে বাসায় ঢোকার আগে সাবান দিয়ে কমপক্ষে ২০ সেকেন্ড হাত ধোয়া, হেক্সিসল বা হ্যান্ড স্যানিটাইজার দিয়ে হাত পরিষ্কার করা, জনসমাগম থেকে যতসম্ভব দূরে থাকা। প্রয়োজন ছাড়া হাত দিয়ে মুখ না ধরা, বেশি করে তরল জাতীয় খাদ্য খাওয়া, বারবার হাত ধোয়ার অভ্যাস করা, জ্বরের জন্য বয়সভিত্তিক প্যারাসিটামল গ্রহণ করা, প্রয়োজনে চিকিত্সকের সঙ্গে পরামর্শ করা এবং সম্ভাব্য লক্ষণ দেখা দিলে সরকারের দেওয়া হটলাইনে যোগাযোগ করা।
n লেখক : সহকারী অধ্যাপক ও সংক্রামক রোগ বিশেষজ্ঞ, হামদর্দ বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশ
