এম এ মাসুম
বাংলাদেশের প্রস্তুতি
২৫ মার্চ প্রধানমন্ত্রী চলমান করোনা ভাইরাস মহামারি দ্বারা ক্ষতি মোকাবিলায় দেশের ক্ষতিগ্রস্ত রপ্তানিমুখী খাতকে সহায়তায় ৫ হাজার কোটি টাকার তহবিলের ঘোষণা করেন। এ তহবিলের অর্থ দ্বারা শুধু শ্রমিক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা পরিশোধ করা যাবে। দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য খাদ্য ও আর্থিক সহযোগিতার জন্য বিভিন্ন কর্মসূচি হাতে নেওয়া হয়েছে। ঋণগ্রহীতাদের ঋণের কিস্তি প্রদান ৩০ জুন পর্যন্ত বর্ধিত করা হয়েছে। এছাড়া কেন্দ্রীয় ব্যাংক ব্যবসায়ীদের বেশ কিছু নীতিমালায় ছাড় দিয়েছে। দেশে মোট কর্মসংস্থানের প্রায় ৮৫ শতাংশই অপ্রাতিষ্ঠানিক কাজে নিয়োজিত। দৈনিক মজুরি ভিত্তিতে কাজ করেন প্রায় ২ কোটি শ্রমিক, যারা এখন কর্মহীন হয়ে পড়েছেন। নিম্ন আয় ও খেটে খাওয়া মানুষ যাদের কোনো সঞ্চয় নেই, তাদের অবস্থা শোচনীয় পর্যায়ে চলে এসেছে। এ সমস্যা কতদিন স্থায়ী হবে তা বলা যাচ্ছে না। মহামারি দীর্ঘস্থায়ী হলে পরিস্থিতি আরো জটিল হবে। তাই অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বিশেষ প্রয়োজন না হলে বেশ কিছু প্রকল্প কার্যক্রম স্থগিত রেখে দরিদ্র মানুষকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে। গার্মেন্ট শিল্পের পাশাপাশি ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের জন্যও প্যাকেজ ঘোষণা করা প্রয়োজন।
করোনা ভাইরাস সংক্রমণ প্রতিরোধে দেশে দেশে চলছে লকডাউন, ক্ষেত্র বিশেষে কারফিউ। বিশ্বের পরাশক্তি, বৃহত্ থেকে ক্ষুদ্র, উচ্চ আয় থেকে দরিদ্র ১৯৯টি দেশ ও অঞ্চল করোনা ভাইরাসের আঘাতে বিপর্যস্ত। বিশ্বের প্রায় ২০০ কোটি মানুষ স্বেচ্ছায় কোয়ারেন্টাইন বা নিজগৃহে বন্দি জীবনযাপন করছে। বিশ্ব অর্থনীতিতে রীতিমতো তাণ্ডবলীলা চালাচ্ছে কোভিড-১৯। অভূতপূর্ব এক দুর্যোগের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে বৈশ্বিক শিল্পোত্পাদন খাত। বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড স্থবির হয়ে পড়েছে। এমন অবস্থায় সামনের দিনগুলোতে মহাসংকটের আশঙ্কা করা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক অর্থ তহবিলের (আইএমএফ) প্রধান ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভা বলেছেন, আমরা একটি অর্থনৈতিক মন্দায় প্রবেশ করেছি। বিশ্ব চরম আর্থিক মন্দার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। আইএমএফ প্রধান জর্জিয়েভা বলেন, এটা ২০০৯ সালের বিশ্ব অর্থনৈতিক মন্দার চেয়েও কঠিন হবে। বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেছে। স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, অফিস বন্ধ, গাড়ির চাকা ঘুরছে না। আকাশে উড়ছে না বিমান। এক কথায় গোটা বিশ্ব স্থবির হয়ে আছে। স্বাস্থ্য ঝুঁকির চেয়েও করোনার অর্থনৈতিক বিপদ আরো বেশি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস বলেছেন, করোনা ভাইরাসের কারণে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা আগের সব রেকর্ড ভেঙে দেবে। তিনি হুঁশিয়ার করে বলেন, করোনা ভাইরাস মহামারি ঠেকাতে দেশগুলো যে পদক্ষেপ নিচ্ছে, তাতে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া সম্ভব হবে না হয়তো। নভেল করোনা ভাইরাসের বিস্তৃতির প্রভাব হিসেবে আগামী দিনগুলোয় বিশ্বব্যাপী লাখ লাখ মানুষ বেকারত্ব, কর্মসংস্থান সংকট ও দারিদ্র্যের সম্মুখীন হবে বলে জানিয়েছে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও)।
বিভিন্ন দেশের পরিকল্পনা : মন্দা পরিস্থিতি থেকে উদ্ধার পেতে সমস্ত শক্তি সামর্থ নিয়ে কেবল বড়ো বড়ো অর্থনীতিই নয়, সব দেশই উঠেপড়ে লেগেছে। ঘোষণা করা হচ্ছে নানামুখী পদক্ষেপ, নানা ধরনের প্যাকেজ। এর আগে যুদ্ধ ছাড়া কোনো সংকটে এমনটা আর দেখা যায়নি। প্রকোপ যত বাড়ছে পুনরুদ্ধার প্যাকেজে অর্থের পরিমাণও বাড়াচ্ছেন সরকার প্রধানেরা। করোনার প্রভাবে বিশ্ব অর্থনীতির মন্দা মোকাবেলায় বিশ্বনেতারা ৭ লাখ কোটি ডলারের বেশি খরচের পরিকল্পনা করেছেন। এর মধ্যে অর্থ সাহায্য, ঋণ প্রদান, কর মওকুফ এবং দেশগুলোর কেন্দ্রীয় ব্যাংক কর্তৃক নতুন নোট ছাপানোর মতো বিষয়ও রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, জাপান, চীন ও ভারত সরকার ধারণা করেছে এ খরচের পরিমাণ আরো বাড়বে।
আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, তিনি শিগগিরই আমেরিকার সবকিছু আবার সচল করতে চান। ২ লাখ কোটি ডলারের নাগরিক সহযোগিতায় ৭৫ হাজার ডলারের নিচে বার্ষিক আয়ের লোকজনকে ১ হাজার ২০০ ডলারের এককালীন চেক দেওয়া হবে। চার মাসের জন্য বেকার ভাতা দেওয়া হবে সব কর্মহীনদের জন্য, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের সাহায্য করা হবে। বড়ো বড়ো শিল্পপ্রতিষ্ঠানেও অর্থের সাহায্য যাবে। ব্রিটিশ অর্থমন্ত্রী ঋষি সুনাক করোনা ভাইরাসের মহামারি মোকাবিলায় ১ হাজার ৪৫০ কোটি ডলারের জরুরি পুনরুদ্ধার প্যাকেজ ঘোষণা করেন। এছাড়া যুক্তরাজ্যের অর্থনীতিকে বাঁচাতে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের জন্য ৩৩ হাজার কোটি ডলারের প্যাকেজ ঘোষণা করেন। স্বনির্ভর কর্মীরা করোনা ভাইরাসের আর্থিক প্রভাব মোকাবিলায় তাদের মাসিক গড় মুনাফার ৮০ শতাংশ অনুদান হিসেবে চাইতে পারবেন। এ অর্থের পরিমাণ ২৫০০ পাউন্ডের বেশি হবে না এবং কর্মীরা এককালীন পাবেন এটি। ভারত সরকার ১ দশমিক ৭ লাখ কোটি রুপির আর্থিক প্যাকেজ ঘোষণা করেন। পাকিস্তান সরকার প্যাকেজের আওতায় ১৪৪ বিলিয়ন রুপি সরবরাহ করবে। করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব প্রথম শুরু হয় চীনে। এর প্রভাবে দেশটির অর্থনৈতিক ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে ৩৯ হাজার ৪০০ কোটি ডলারের অবকাঠামোগত ব্যয়ের পরিকল্পনা নিয়েছে। এরই মধ্যে ব্যাংকগুলোতে ঋণের বিষয়ে বিধিনিষেধ শিথিল করা হয়েছে। এছাড়া ব্যাংকগুলো থেকে রিজার্ভ চাহিদা কমিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক, যাতে ব্যাংকগুলো বেশি বেশি ঋণ দিতে পারে।
ফরাসি সরকার ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও বেকার কর্মীদের ৫০ বিলিয়ন ডলার সহায়তা দেওয়ার কথা জানিয়েছে। এছাড়া দেশটি করপোরেট ঋণগ্রহিতাদের জন্য ৩৩০ বিলিয়ন ডলারের নিশ্চয়তা দিয়েছে। ইতালি নিজের দেশের শ্রমিকদের এবং স্বাস্থ্য খাতে ২৭ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার ব্যয়ের কথা জানিয়েছে। স্পেনও ২২০ বিলিয়ন ডলার দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এছাড়া ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক ৮২৪ বিলিয়ন ডলার দেওয়ার কথা বলেছে, যা দিয়ে সংস্থাভুক্ত দেশগুলোকে ঋণের সুবিধা দেওয়া হবে। করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলো বাঁচাতে ১ হাজার ৫০ কোটি ডলারের আর্থিক প্যাকেজ ঘোষণা করেছে সুইজারল্যান্ড সরকার। ৭৩০ কোটি ডলারের পুনরুদ্ধার প্যাকেজ ঘোষণা করেছে নিউজিল্যান্ড সরকার। শ্রমিকদের বেতনে ভর্তুকিসহ বেতনভাতা দিতে এ অর্থ ব্যয় হবে।
ভোক্তার ব্যয় ও পর্যটন খাতকে রক্ষায় প্রাথমিকভাবে ইন্দোনেশিয়ার সরকার ৭২ কোটি ৭০ লাখ ডলারের পুনরুদ্ধার প্যাকেজ ঘোষণা করে। পরে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারে আরো ৮০ কোটি ডলারের আর্থিক প্যাকেজ ঘোষণা করা হয়। করোনা ভাইরাস প্রাদুর্ভাবের বিরুদ্ধে লড়াই করতে ২ হাজার ৭২০ কোটি ডলারের পুনরুদ্ধার প্যাকেজ ঘোষণা করেছে সংযুক্ত আরব আমিরাত। থাই মন্ত্রিসভা ১ হাজার ৭৬০ কোটি ডলারের প্যাকেজ ঘোষণা করেছে। দক্ষিণ কোরিয়ার আর্থিক প্যাকেজের আকার ৯৮০ কোটি ডলারের। মালয়েশিয়ার সরকার বরাদ্দ দিয়েছে ৬৬০ কোটি ডলারের। জাপান সরকার ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের জন্য নগদ সহায়তাসহ বিভিন্ন প্যাকেজ ঘোষণা করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এর আর্থিক মূল্য হতে পারে প্রায় ২৭৪ দশমিক ২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। সৌদি আরব সেদেশের অর্থনীতি ও স্বাস্থ্যখাত পুনরোদ্ধারের জন্য ৩২ বিলিয়ন ডলার প্যাকেজ ঘোষণা করেছে। করোনা ভাইরাসের ঝুঁকি মোকাবিলায় ১ হাজার কোটি অস্ট্রেলীয় ডলার বা ৬৬০ কোটি মার্কিন ডলারেপ্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করতে যাচ্ছে অস্ট্রেলিয়া। কানাডার হাউজ অব কমন্সের বিশেষ অধিবেশনে অনুমোদন পেল দেশটির প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডোর প্রস্তাবিত ৮২ বিলিয়ন ডলারের ‘কোভিড-১৯’ এইড প্যাকেজ।
করোনা ভাইরাসের কারণে অর্থনৈতিক ক্ষতির মোকাবিলা এবং যে কোনো মূল্যে কোভিড-১৯-এর বিপর্যয় থেকে ঘুরে দাঁড়াতে ৫ ট্রিলিয়ন ডলার দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন বিশ্বের শীর্ষ ২০ (জি-২০) অর্থনীতির দেশের নেতারা। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোও করোনা ভাইরাস মোকাবিলায় এগিয়ে আসছে। ৫০ বিলিয়ন ডলার বরাদ্দ করেছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। সাড়ে ৬ বিলিয়ন ডলারের তহবিল ঘোষণা দিয়েছে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি)। বিশ্বব্যাংক ১৪ বিলিয়ন ডলারের তহবিল ঘোষণা করেছে। এ ছাড়াও ৭৩ কোটি ডলারের বিশেষ প্যাকেজ ঘোষণা করেছে ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (আইডিবি)।
ছবি : ইন্টারনেট
