খাদ্য নিরাপত্তায় হুমকি হতে পারে করোনা

আপডেট : ০৪ এপ্রিল ২০২০, ২২:০৭

নাজমুন্নাহার নিপা

বৈশ্বিক গবেষণা বলছে, বিশ্ব জুড়ে করোনা ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার প্রভাবে দেশীয় খাদ্য নিরাপত্তা, সামগ্রিক জীবনযাত্রা, জীবন-জীবিকা, দ্রব্যমূল্য মারাত্মক হুমকির সম্মুখীন হতে পারে। দেশগুলো খাদ্যের সংকটে পড়তে পারে এবং সামগ্রিক জীবনযাত্রায় পরিবর্তন আসতে পারে। 

আমরা জানি, মানবদেহের পুষ্টির একটি বড়ো অংশ আসে খাদ্যদ্রব্য থেকে। কিন্তু বর্তমান সময়ে এক দেশ থেকে অন্য দেশে আমদানি-রপ্তানি বন্ধ থাকায় খাদ্যের চাহিদা মারাত্মক ঘাটতির সম্মুখীন হতে যাচ্ছে, যা পুষ্টির একটি বড়ো অংশ লাঘব করে দিতে পারে। অন্যদিকে অপুষ্টি রোগের ঝুঁকি বাড়িয়ে তুলতে পারে, যার ফলে এই সংকটময় মুহূর্তে খাদ্যদ্রব্য নিশ্চিত করাও একটি বড়ো দায়িত্ব। খাদ্যের প্রাপ্যতা সম্পর্কে অনিশ্চয়তা রপ্তানি নিষেধাজ্ঞার প্রবাহকে ছড়িয়ে দিতে পারে এবং বিশ্ববাজারে ঘাটতি সৃষ্টি করতে পারে বলে মনে করছেন জাতিসংঘসহ ওয়ার্ল্ড হেলথ অর্গানাইজেশন এবং ওয়ার্ল্ড ট্রেড অর্গানাইজেশনের পরিচালকগণ। তারা আরো বলেন, কোভিড-১৯ লকডাউনের মাঝে বাণিজ্য যাতে যথাসম্ভব অবাধে প্রবাহিত হয়, তা নিশ্চিত করার জন্য অবশ্যই বিশেষভাবে প্রচেষ্টা চালাতে হবে, বিশেষত খাদ্যের অভাব দূর করতে। দীর্ঘমেয়াদি সীমাবদ্ধতার আদেশ ও ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞাগুলোর কারণে কৃষি শ্রমিক না পাওয়া এবং বাজারে খাদ্য গ্রহণের অক্ষমতার কারণে কৃষি উত্পাদন ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।

বলা হচ্ছে, এখন পর্যন্ত অধিকাংশ দেশে খাদ্য সরবরাহ পর্যাপ্ত পরিমাণে রয়েছে, পরিস্থিতি স্বাভাবিক এবং বাজারগুলো এখনো পর্যন্ত স্থিতিশীল। গ্লোবাল সিরিয়াল স্টকগুলো আরামদায়ক পর্যায়ে রয়েছে এবং ২০২০ সালের জন্য গম ও অন্যান্য প্রধান ফসলের দৃষ্টিভঙ্গি ইতিবাচক। কিন্তু এই মহামারি যদি দীর্ঘদিন চলতে থাকে, তাহলে বৈশ্বিক খাদ্য নিরাপত্তায় এটি হুমকি হয়ে দেখা দিতে পারে। আমরা যদি ইতিহাসের দিকে খেয়াল করি, তাহলে দেখা যায় যে, মহামারি বিশ্বে বারবার ফিরে এসেছে। তবে আধুনিক বিশ্বের মানুষ মহামারি দেখে ১৯১৮ সালে, যা স্প্যানিশ ফ্লু নামে পরিচিত ছিল। এতে পুরো পৃথিবীতে প্রায় ৫০০ মিলিয়ন মানুষ আক্রান্ত হয়েছিল এবং মৃত্যুবরণ করেছিল প্রায় ৫০ মিলিয়ন (সিডিসি)। তবে খুব বেশি দিন হয়নি, ২০০৩ সালে চীন থেকে মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়ে সার্স ভাইরাস, যা ২৬টি দেশকে আক্রান্ত করেছিল। এ দুটি মহামারি-পরবর্তী সময়ে খাদ্যের তীব্র সংকটে ভুগেছে বিশ্ব, যা প্রকট আকার ধারণ করে দরিদ্র্য জনগোষ্ঠীর ওপর। ইবোলা ভাইরাস রোগের প্রাদুর্ভাবের সময় কোয়ারেন্টাইন এবং আতঙ্ক, ক্ষুধা ও অপুষ্টিজনিত রোগ বৃদ্ধির কারণ হয়েছিল। কোভিড-১৯-এর ভয়াবহ প্রভাব যে বিশ্ববাসীর ওপর, বিশেষ করে নিম্ন আয়ের মানুষের ওপর পড়তে যাচ্ছে, তা সহজেই অনুমেয়।

করোনা ভাইরাসের কারণে পুরো বিশ্ব এখন স্থবির, যার কারণে ইতোমধ্যে বিভিন্ন দেশের ভিন্ন ভিন্ন শহর লকডাউন করে দেওয়া হয়েছে। চলাচলের ওপর বিধিনিষেধের কারণে শ্রম ঘাটতির সৃষ্টি হয় এবং দুর্ভোগ আরো বেড়ে যায়। বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক মন্দার যে আশঙ্কা করা হচ্ছে, তা উন্নয়নশীল অর্থনীতিতে বড়ো আঘাত করতে পারে। এই অর্থনৈতিক মন্দা খাদ্য নিরাপত্তাহীনতাকে আরো বাড়িয়ে তুলতে পারে।

সবাই এখন ঘরে বসে মহামারি থেকে বাঁচার উপায় খুঁজছে। কিন্তু মানুষের খাদ্যের চাহিদা দিনে দিনে বেড়েই চলেছে উত্পাদনের তুলনায়। মানুষ ঘর থেকে বের না হতে পারায় কাজ করতে পারছে না, যার কারণে খাদ্য উত্পাদনে মারাত্মক ব্যাঘাত ঘটছে। কৃষকেরা মাঠপর্যায়ে কাজ করতে পারছেন না। ঘরবন্দি হয়ে থাকতে হচ্ছে প্রায় সবাইকে। যেখানে আমরা খাদ্যদ্রব্যের জন্য কৃষির ওপর নির্ভরশীল অনেকাংশেই।

কোভিড-১৯-এ কৃষক, মত্স্য ব্যবসায়ীদের অনেক ক্ষতি হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। জমিতে কাজ করা, পশুপাখির যত্ন নেওয়া বা মাছ ধরায় বাধা সৃষ্টি করতে পারে এটি। বাজারে তাদের পণ্যগুলো বিক্রয় করতে বা প্রয়োজনীয় পণ্য কিনতে বা উচ্চতর খাদ্যমূল্যের কারণে এবং সীমিত ক্রয়ক্ষমতার কারণে তাদের সমস্যার মুখোমুখি হতে হবে। দিনমজুররা ফসল কাটা ও প্রক্রিয়াজাতকরণের চাকরি ও আয়ের দিক দিয়ে খুব বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

কৃষির পাশাপাশি অন্যান্য খাতেও রোগের প্রভাব প্রত্যাশিত। যেমন মাছ। ৩ বিলিয়ন মানুষের জন্য মাথাপিছু প্রোটিন গ্রহণের গড় ২০ শতাংশেরও বেশি সরবরাহ করে, কিছুটা কম উন্নত দেশগুলোতে ৫০ শতাংশেরও বেশি এবং এটি একটি বিশ্বব্যাপী সর্বাধিক ব্যাবসায়িক মাধ্যম। যে দেশগুলো মাছ ধরা খাতের ওপর বেশি নির্ভর করে, বিশেষত সেই দেশগুলোতে জেলে সম্প্রদায়ের জীবিকা, খাদ্যের সুরক্ষা, পুষ্টি এবং বাণিজ্য খাতে করোনা বেশি প্রভাব ফেলতে পারে।

খাদ্যের ঘাটতিতে যেন না পড়তে হয়, সে জন্য সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। দেশীয় সংকট দূর করতে সবাইকে একত্রে কাজ করতে হবে। তাছাড়া ভবিষ্যতে যেন খাদ্যের ঘাটতি না হয়, সেদিকে লক্ষ রাখতে হবে। খাদ্যের ঘাটতি মোকাবিলায় প্রতিটি দেশকে একত্রে কাজ করতে হবে। আমাদের অবশ্যই নিশ্চিত করতে হবে, কোভিড-১৯ যেন আমাদের অজান্তেই প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের অনিয়ন্ত্রিত সংকট সৃষ্টি  না করে  এবং ক্ষুধা ও অপুষ্টি বাড়িয়ে না তোলে।

n লেখক :শিক্ষার্থী, এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ, জাতীয় কবি

কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়