আপনারাই বিদ্যানন্দের শক্তি

আপডেট : ০৪ এপ্রিল ২০২০, ২২:০৮

কিশোর কুমার দাস

প্রতিষ্ঠাতা, বিদ্যানন্দ

দেশে করোনা ভাইরাস শনাক্ত হওয়ার আগে থেকেই সামাজিক সচেতনতা তৈরিতে কাজ করছে স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশন। করোনার বিস্তার রোধে সংস্থাটি মূলত ঢাকা ও চট্টগ্রামের যেসব স্থানে জনসমাগম বেশি সেসব স্থানে জীবাণুনাশক ছিটানো এবং মাস্ক-অ্যাপ্রোন-গাউন তৈরি ও বিতরণের কাজ করছে। তাদের কাজে অনুপ্রাণিত হননি এমন মানুষের সংখ্যা যেমন কম, ঠিক তেমনি বিদ্যানন্দের প্রতিষ্ঠাতাকে খোঁজ করেননি এমন মানুষের সংখ্যাটাও নেহায়েত অল্প। তিনি কিশোর কুমার দাস। আড়ালে থাকতেই যেন স্বস্তি পান এই স্বপ্নবাজ মানুষ। অনাহারে অভাবে দিন কাটানো এই মানুষটার হাতেই গড়ে ওঠা বিদ্যানন্দ। সম্প্রতি তিনি ভিন্নচোখের মুখোমুখি হয়েছেন। সাক্ষাত্কার নিয়েছেন কৌশিক

 

করোনা মোকাবেলা দিয়েই শুরু করি, করোনা জ্বরে কাঁপছে পুরোবিশ্ব। এই পরিস্থিতিতে বিদ্যানন্দের উদ্যোগগুলো একটু আপনার মুখ থেকে শুনতে চাইছি—

করোনা নিয়ে বিদ্যানন্দ একদম শুরু থেকেই যথেষ্ট গুরুত্বের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে কাজ করছে। এরইমধ্যে বেশ কয়েকটি উদ্যোগ নিয়েছি। আমরা মাস্ক, হ্যান্ড স্যানিটাইজার সরবরাহ করেছি সকলের কাছে। যেগুলো দূষণ রোধের জন্য আমাদের পূর্বে বানানো পিপিইসহ নানা চিকিত্সা সামগ্রী দেশের মানুষদের জীবনে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আমার প্রত্যাশা। এছাড়া দেশের এই পরিস্থিতিতে যারা দিনমজুর কিংবা অনাহারে আছেন তাদের জন্য খাবার সরবরাহ করছি। শুরুতে পরিকল্পনাটা ২ লাখ হলেও পরবর্তিতে এটি ৫ লাখেও বেশি পরিবারকে সরবরাহের কাজ করে যাচ্ছি। ১৮ মার্চের পর দেশের পরিস্থিতি যখন আরও ভয়াবহ রূপ নেয় তখন ৬০ জনের টিমকে দু-ভাবে গঠন করে ঢাকা ও চট্টগ্রাম শহরে আমরা প্রতিদিন প্রায় ১০ হাজার লিটার জীবাণুনাশক ছিটিয়ে দিচ্ছি। এছাড়াও ঢাকার মধ্যে যারা হোম কোয়ারেন্টাইনে আছেন তারা কল করে জানালেই তাত্ক্ষণিক খাবারসহ অন্যান্য সেবা দিতে কাজ করে যাচ্ছি আমরা।

 

এমন অভিনব চ্যালেঞ্জের পেছনের মূল শক্তিটা কী ছিল?

এমন চ্যালেঞ্জের মূলশক্তি অনুপ্রেরণা যেটাই বলুন না কেন এর পেছনে এক কথায় বলবো আপনারাই। আপনারা সবাই যারা বিদ্যানন্দকে সব সময় অনুপ্রেরণা জুগিয়েছেন, এদেরকেই আমি এই শক্তির দাবিদার বলবো। এ পর্যন্ত আমরা যত কাজ পরিচালনা করলাম এতে সবচেয়ে প্রধান যে অংশটা হচ্ছে আর্থিক অনুদান। যেটা সম্পূর্ণ দেশ-বিদেশের লাখো মানুষ সম্মিলিতভাবে বহন করছে। প্রত্যেকটি কাজেরই একটি প্রধান অংশ অর্থ, যা আপনাদের মাধ্যমে পেয়ে আমরা সেচ্ছাসেবকরা বাস্তবায়ন করি। এই যে করোনা প্রতিরোধে আমাদের ডাকে আপনারা লাখো মানুষ ছুটে এলেন, এটিই আমাদের শক্তি। আর আমাদের প্রতি বিশ্বাস জনগণ রেখেছে। আমাদের পরিকল্পনার চাইতেও একটি বড় পরিমাণের অনুদান সংগ্রহ হয়েছে এরইমধ্যে।

 

স্বেচ্ছাসেবকদের কথাই যখন উল্লেখ হলো তাদের গল্পটা আপনার দৃষ্টিকোণ থেকে শুনতে চাইছি—

এই প্রশ্নের উত্তর দিতে প্রথমে একটা শব্দ উল্লেখ করে রাখি, ‘অনবদ্য’। আমার চোখে বিদ্যানন্দের প্রতি সদস্যই এক কথায় তুলনাহীন। এই স্বেচ্ছাসেবকদের নিয়ে বলা আমার পক্ষে অসম্ভবের সমান। এদের সামনে আমি কিছুই না। খুব সততার সঙ্গে বলছি এই সেচ্ছাসেবকদের সামনে আমি সামান্য মাত্র। বিদ্যানন্দের মূল চালক এই স্বেচ্ছাসেবকরাই। আমাদের হাজার স্বেচ্ছাসেবকদের সামনে নিজেকে কিছু মনে করি না। বিদ্যানন্দকে আজ এই জায়গায় দাঁড় করানোর কৃতিত্ব তা পুরোটাই ওদের। আমাদের সকল স্বেচ্ছাসেবকরাই কোনো না কোনো পেশায় নিয়োজিত, কেউ চাকরিজীবী, কেউ শিক্ষার্থী। সকলেই নিজ নিজ জায়গা থেকে পরিবর্তনের উদ্দেশ্যে এখানে এসেছে।

এই অনবদ্য স্বেচ্ছাসেবকদের খুঁজে বের করাটা কঠিন নিশ্চয়ই?

আসলে এটা ঠিক আমরা খুঁজি না। ওরা নিজেরাই এখানে আসে। আমরা শুধু এমন একটি প্লাটফর্ম তৈরি করার চেষ্টা করেছি যেখানে প্রতিটা স্বেচ্ছাসেবকদের জন্য একটি সুস্থ পরিবেশ তৈরি করা সম্ভব। যার ফলে আগ্রহীরাই আমাদের খুঁজে বের করে আমাদের সঙ্গে যুক্ত হয়। কাজের সুস্থ পরিবেশ থাকলে সঠিক মানুষ পেতে অসুবিধা হয় না যেটা আমি সবসময় বিশ্বাস করি।

 

করোনা ভাইরাস মোকাবেলায় বিদ্যানন্দ কতটুকু ভূমিকা রাখতে সম্ভব হবে বলে মনে করেন?

করোনা ভাইরাস একটি বৈশ্বিক মহামারি। এটি কখনোই একক কিংবা ব্যক্তি উদ্যোগে মোকাবেলা করা সম্ভব নয়। এটিকে দমনে সবাইকে একত্রে একযোগে লড়াই চালিয়ে যেতে হবে। এই লড়াইয়েরই একটি অংশ বিদ্যানন্দ। আমরা কখনোই শুধুমাত্র নিজেরাই এই মহামারির রোধ করতে সক্ষম হবো না। তবে আমরা আমাদের সামর্থ্য অনুযায়ী লড়ে যাবো। এরইমধ্যে আমরা আমাদের উদ্যোগের মাধ্যমে লড়ে যাচ্ছি, জানি না কী পরিমাণ ভূমিকা রাখতে পারবো, তবে এটা বলে রাখছি বিদ্যানন্দ নিজেদের সর্বোচ্চ চেষ্টা করে যাচ্ছে এবং যাবে বাকিটা সৃষ্টিকর্তার ওপর নির্ভর করবে। একটা কথা, অবশ্যই সরকারের সামনে আমরা সবসময়ই ক্ষুদ্র।

 

বাংলাদেশ দিনমজুরের সংখ্যাটা প্রায় ৪ কোটির মতো, সবাইকে সহায়তা করা আপনাদের পক্ষে অসম্ভব, এক্ষেত্রে অন্যান্য সংগঠনের প্রতি আপনার কী বার্তা থাকবে?

বৈশ্বিক মহামারিকে দমাতে অবশ্যই সব সংগঠনকে মিলিত হয়ে কাজ করে যেতে হবে। আমি খুবই সাধারণ, আমি মনে করি অন্যদের প্রতি বার্তা দেওয়ার মতো যথেষ্ট যোগ্যতা আমার মাঝে নেই এবং এটি এখনও আমি অর্জন করিনি। আমার কাছে যারা গণমানুষের হয়ে কাজ করে সবাই সমান। দিনশেষে আমাদের সবারই একটাই উদ্দেশ্য মানবকল্যাণ।

 

কর্মসূত্রে আপনার বর্তমান অবস্থান পেরুতে, দেশের অন্যপ্রান্ত থেকে কীভাবে বিদ্যানন্দের কার্যক্রমে সময় দেন?

নিজের ব্যস্ততার মাঝেও সবসময় সবকিছু দেখাশোনার চেষ্টা করি। এত দূরে থাকতে সবসময় খারাপ লাগে, এটা স্বাভাবিক। তবে ব্যাপারটাকে আমি দু-রকমভাবে দেখি, অনেক সময় মনে হয় দূরে অবস্থানটাই ভালো। নিজেকে প্রতিষ্ঠাতা পরিচয়ে কখনোই গড়ে তুলতে চাইনি। বিদ্যানন্দ কারও একার না, এটা আমাদের সবার। অনেকেই আমার গল্প নানাভাবে তুলে ধরে, বিষয়গুলো আমি এড়িতে চলতে চেষ্টা করি। দেশে থাকলে হয়তো অনেকেই এটা নিয়ে আরও বেশি আলোচনা করতো। দেশের বাইরে থাকার ফলে এটা নেই, আমার কাছে ভালোলাগাটা এখানেই।

 

বিদ্যানন্দের ভবিষ্যত্ নিয়ে যদি প্রশ্ন করা হয়, কী পরিকল্পনা রয়েছে?

বিদ্যানন্দের ভবিষ্যত্ নিয়ে আমরা কখনোই পরিকল্পনা করিনি এবং করতেও চাই না। আমাদের দেশের অধিকাংশ সংগঠনের ক্ষেত্রেই যেটা দেখা যায়, ভবিষ্যত্ পরিকল্পনা চিন্তা করে তাদের বর্তমান কাজটা এড়িয়ে যায়। যেটি আমরা কখনোই করিনি, আমরা সবসময় বর্তমান নিয়ে ভেবেছি এবং বর্তমান নিয়েই চিন্তা করেছি। ভবিষ্যতে এটি কোথায় গিয়ে ঠেকবে সেটি কখনোই চিন্তা করতে চাই না। আমরা মনে করি বর্তমান ঠিক থাকলে ভবিষ্যত্ও ঠিক থাকবে। আমরা জানি আমাদের কাজ দিয়ে আমরা দেশ পুরোপুরি বদলাতে পারবো না। আমাদের হাত ছোট। আমরা শুধু যেখানেই সমস্যা দেখি সেখানেই একটি অনুপ্রেরণার গল্প তৈরি করতে চাই। আমরা শুধু সবাইকে দেখাতে চাই, দেখুন কাজ করলে পরিবর্তনটা হবেই।