আমিনুল হক শাহীন
ভয়াবহ এক বিপর্যয়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে পৃথিবী। ছয় মাস আগেও কেউ ঘুণাক্ষরে চিন্তা করেন নাই যে পৃথিবী এভাবে থেমে থাকবে। বিল গেটস থেকে শুরু করে জনস্বাস্থ্য নিয়ে কাজ করেন, এমন কেউ কেউ মাঝেমধ্যে দু-এক বার জীবাণুর কারণে পৃথিবীতে ভয়াবহ বিপর্যয় ঘটতে পারে বলে ধারণা করেছিলেন বটে। কিন্তু এর ব্যাপকতা যে এত বিশাল হবে তা ছিল যে-কারোরই কল্পনার অতীত। বর্তমানে কোভিড-১৯ ভাইরাসের কারণে সমগ্র পৃথিবী লকডাউন হয়ে কার্যত স্থবির হয়ে আছে। চীনের উহান প্রদেশে প্রথম কোভিড-১৯ ভাইরাস আক্রান্ত রোগীর সন্ধান পাওয়া যায়। সেখান থেকে মাত্র তিন মাসের মধ্যেই সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়েছে। এটা এতটাই ভয়াবহ যে আক্রান্তের প্রায় ৫ শতাংশ লোক ফুসফুসের অস্বাভাবিক নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করছে। কোভিড-১৯-এ গতকাল রবিবার দুপুর পর্যন্ত সারা বিশ্বে ১২ লাখের বেশি মানুষ আক্রান্ত হয়েছেন। মারা গেছেন ৬৫ হাজারের বেশি মানুষ। আমেরিকার ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব অ্যালার্জি অ্যান্ড ইনফেকশাস ডিজিজের প্রধান ধারণা করছেন, শুধু আমেরিকাতেই ২ লাখ লোকের মৃত্যু হতে পারে। চীনের পরে ইউরোপ, আমেরিকায় যতটা দ্রুত কোভিড-১৯ ভাইরাসটি ছড়িয়ে পড়েছে; সে তুলনায় চীনের কাছের দেশ হিসেবে জাপান, কোরিয়া বা তাইওয়ানের অবস্থা অনেকটা ভালো। এর কারণ হিসেবে এ অঞ্চলের মানুষের মাস্ক ব্যবহারে অভ্যস্ততাও একটা কারণ বলে অনেকের মনে হয়েছে। আমি দীর্ঘকাল জাপানে মেডিক্যাল গবেষণায় যুক্ত ছিলাম, আমার কাছেও তা-ই মনে হয়েছে।
মাস্ক জিনিসটা যে মশকরার নয় তা আমি ভালো বুঝেছি জাপানে থাকার সময়। আমি দেখেছি, জাপানিরা প্রচুর মাস্ক ব্যবহার করে। পলেন অ্যালার্জি থেকে রক্ষা পেতে মাস্ক পরে, নিজের ফ্লু হলে যাতে না ছড়ায় তার জন্যও মাস্ক পরে। এমনকি রাতে ডিনারে রসুনের একটা আইটেম ছিল। পরের দিন সকালে অফিসে মুখ থেকে যাতে দুর্গন্ধ বের না হয় তার জন্যও তারা মাস্ক পরে থাকে। আমেরিকার মানুষের মধ্যে মাস্ক ব্যবহারের প্রবণতা নেই বললেই চলে। তাই আমেরিকার বাজারেও এই করোনার কালবেলায় মাস্ক ছিল অপ্রতুল। সে কারণেই হোক বা অন্য কোনো কারণেই হোক আমেরিকার সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন যে গাইডলাইন বের করে, তাতে লেখে আক্রান্ত ব্যক্তি ও তার সেবায় নিয়োজিত ব্যক্তি ছাড়া সুস্থ ব্যক্তিদের মাস্ক ব্যবহারের প্রয়োজন নাই। মাস্ক ব্যবহারে অনভ্যস্ত আমেরিকানরা কথাটি লুফে নেন। ভাইরাসটি আমেরিকায় ছড়িয়ে পড়ার পেছনে মাস্ক ব্যবহার না করাও একটা কারণ বলে মনে করেন অনেকে। আমেরিকায় সবচেয়ে খারাপ অবস্থা নিউ ইয়র্কে। নিউ ইয়র্ক শহরকে লকডাউন করা হয়েছে। কিন্তু জরুরি কাজে, ডাক্তার দেখাতে বের হওয়া মানুষেরা, হাসপাতালে বা ক্লিনিকের স্টাফরা অনেকক্ষণ অপেক্ষা করে যে ট্রেনে উঠেছে তাতে আগের মতোই তাদের গাদাগাদি করে বসতে হয়েছে। তাই শহর লকডাউন করা হলেও কার্যত লকডাউনের আসল উদ্দেশ্য ব্যাহত হয়েছে। নিউ ইয়র্কের ইনফেকশাস রোগীদের নিয়ে কাজ করা কোভিড-১৯ ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে সুস্থ হয়ে ওঠা বাংলাদেশি এক ডাক্তার আক্ষেপ করেই বলছিলেন, ট্রেনের সংখ্যা কমিয়ে দিয়েই ভাইরাসকে আরো ছড়িয়ে দেওয়া হলো। এতক্ষণে অরিন্দম কহিলা বিষাদের মতো এখন সিডিসির পক্ষ থেকেও কমিউনিটি লেভেলে ভাইরাস ছড়ানো প্রতিহত করতে সবাইকে মাস্ক পরতে বলার কথা চিন্তা করা হচ্ছে। আবার ইনফেকশাস ডিজিজ স্পেশালিস্টের কেউ কেউ মাস্ক ব্যবহার করতে বললে জনগণের মধ্যে যদি ‘পুরোপুরি সুরক্ষিত’ এমন ভুল ধারণা তৈরি হয় এবং তারা তখন যদি ছয় ফুটের সোশ্যাল ডিস্টান্টিং না মানে, এ নিয়েও চিন্তিত।
মনে রাখতে হবে, কোনো কিছুই করোনা ভাইরাসের বিরুদ্ধে আমাদের ১০০ ভাগ সুরক্ষা দিচ্ছে না। এ মুহূর্তে আমাদের কাজই হবে ইনফেকশন ছড়ানোর যতগুলো পথ আছে সব রুদ্ধ করে দেওয়া। এই মুহূর্তে সবাইকে যার যার বাড়িতে থাকতে হবে। মাঝে মাঝে সাবান দিয়ে কমপক্ষে ২০ সেকেন্ড করে হাত ধুতে হবে। নাকে, মুখে, চোখে হাত দেওয়া বন্ধ করতে হবে। ভাইরাসটি মানুষ থেকে মানুষে ছড়ায়। তাই একে অন্যের মধ্যে কমপক্ষে ছয় ফুট পরিমাণ দূরত্ব রাখতে হবে। যে ব্যক্তি অসুস্থ তাকে তো অবশ্যই, তার সেবায় যিনি থাকবেন তাকেও এবং জরুরি প্রয়োজনে বাড়ির বাইরে গেলে আমাদেরকে মাস্ক পরতে হবে। বাড়িতে বা দোকানে যেসব জায়গায় মানুষের হাতের স্পর্শ বেশি লাগে, যেমন দরজার নব, ফ্রিজের পাল্লা, লিফটের নব, ফোন, কিবোর্ড— সেসব জায়গা নিয়মিত ডিজিনফেক্ট্যান্ট দিয়ে পরিষ্কার করতে হবে।
মাস্ক ব্যবহার অনেকটা দুই মুখ ধারালো তলোয়ারের মতো। মাস্ক যেমন একদিকে জীবাণু ছড়ানো প্রতিহত করে এবং নিজেকে সংক্রমিত হওয়া থেকে কিছুটা হলেও বেশি প্রতিরক্ষা দেয়, তেমনি আবার মাস্কের ভুল ব্যবহার জীবাণু সংক্রমণের চান্সকে বাড়িয়ে দেয়। মাস্ক ব্যবহার করা অবস্থায় কোনোভাবেই মাস্কের সামনে হাত দেওয়া যাবে না। ব্যবহার শেষে কানের দিক থেকে মাস্ক খুলতে হবে এবং ডিস্পোজেবল মাস্ক হলে সঙ্গে সঙ্গে ট্রাশ বক্সে ফেলে দিয়ে হাত সাবান দিয়ে ধুতে হবে। আর রিইউজেবল মাস্ক হলে মাস্ক খোলার সঙ্গে সঙ্গে সে মাস্কের নিয়ম অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে।
মাস্কের প্রতুলতার দিক দিয়ে বাংলাদেশের অবস্থা আমেরিকা বা অন্য যে কোনো দেশের চেয়ে ভালো। ডিস্পোজেবল মাস্কের ওপর চাপ কমানোর জন্য জাপান সরকার তার প্রতিটি জনগণকে দুটি করে কাপড়ের মাস্ক দিচ্ছে। দুই বা তিন পরতা মোটা কটন কাপড় সেলাই করে মাস্কগুলো তৈরি করা হয়েছে। তারা প্রতিদিন একটি করে মাস্ক ব্যবহার করবে। ব্যবহার শেষে সাবান দিয়ে অন্য কাপড় চোপড়ের সঙ্গে না মিশিয়ে আলাদা ধুয়ে শুকিয়ে ইস্তিরি করার জন্য প্রত্যেককে বলে দেওয়া হয়েছে। এবং একজনের মাস্ক যেন কোনোভাবেই অন্য কেউ ব্যবহার না করে তাও বলে দিয়েছে। আমাদের দেশেও আমরা এভাবে মাস্ক বানিয়ে ব্যবহার করতে পারি।
আমি যুক্তরাষ্ট্রের যেখানে থাকি, সেই লুইজিয়ানায় এখন বসন্তকাল। প্রকৃতি অনেক সুন্দর এখানে। ওদিকে এ সপ্তাহে জাপানে চেরিফুল ফুটেছে। অপরূপ সৌন্দর্যের চেরিফুল তার মোহনীয় রূপের পসরা সাজিয়ে ফুটে আছে পথেঘাটে। এদিকে বাংলাদেশে আর কিছু দিন পরেই নববর্ষ। আবহমান বাঙালির প্রাণের উত্সব। উত্সব, প্রকৃতি সবকিছু ছাপিয়ে করোনা আতঙ্ক আমাদের সবাইকে গ্রাস করে নিয়েছে। আমি আশাবাদী মানুষ। আমি বিশ্বাস করি, অল্প কিছুদিনের মধ্যেই মানুষ আবার স্বমহিমায় পুরোনো মঞ্চে ফিরে আসবে। এই অল্প কিছুদিন আমাদের শুধু ধৈর্য ধরে বৈরী পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে চলতে হবে। The World will be great again. সবাই ভালো থাকবেন।
n লেখক :চিকিত্সক ও গবেষক, লুইজিয়ানা স্টেট ইউনিভার্সিটি অব হেলথ সায়েন্স, যুক্তরাষ্ট্র
