করোনা ভাইরাসের (কোভিড-১৯) প্রভাবে দেশের অর্থনীতির যে ক্ষতির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে সেটি বিবেচনায় নিয়ে আগামী বাজেটে রাজস্ব কাঠামোতে একগুচ্ছ সুপারিশ করেছে গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কাছে বাজেটে প্রস্তাবনায় আগামী দুই বছরের জন্য কর কাঠামোতে বেশ কিছু পরিবর্তন আনার সুপারিশ করা হয়। সিপিডির বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, চলতি (২০১৯-২০) অর্থবছরের ছয় মাসে (জুলাই-ডিসেম্বর) আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় রাজস্ব আদায়ে প্রবৃদ্ধি হয়েছে মাত্র ৫ দশমিক ৬ শতাংশ। সরকারের রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য পূরণ করতে হলে বাকি সময়ে রাজস্ব আদায়ে প্রবৃদ্ধি হতে হবে ৮৭ দশমিক ৫ শতাংশ, যেটি সম্ভব নয়। করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব ছাড়া স্বাভাবিক অবস্থা থাকলে এবছর রাজস্ব আদায় লক্ষ্যমাত্রা হতে ১ লাখ কোটি টাকা কম হতে পারে। জিডিপির তুলনায় রাজস্ব আদায় ১০ শতাংশের নিচে নেমে গেছে। সার্বিক অবস্থায় চলতি অর্থবছর বাজেট ঘাটতি সাড়ে ৫ শতাংশে দাঁড়াতে পারে।
আগামী বাজেটে অর্থনীতির ক্ষতি মোকাবিলায় উদ্যোগ থাকতে হবে। করমুক্ত আয়সীমা বাড়ানোসহ একগুচ্ছ প্রস্তাব করেছে সিপিডি। বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, দেশে করোনা পরিস্থিতির কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে নিম্নআয়ের পরিবারগুলো। অনেকেই বেকার হয়ে পড়বে। নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধিতে জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাবে। প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য সরকারিভাবে ভিজিডি, ভিজিএফ এবং ওএমএস এর কার্যক্রম বাড়ানো এবং ১০ টাকা কেজিতে চাল বিতরণ কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। এর সঠিক সুফল পেতে প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা তৈরি করে সুরক্ষার আওতায় আনার আহ্বান জানিয়েছে সিপিডি। আসছে বাজেটে করমুক্ত আয়ের সীমা আড়াই লাখ টাকা থেকে বাড়িয়ে সাড়ে ৩ লাখ টাকা করার সুপারিশ করা হয়েছে। আয়করের নিম্নস্তরের তিনটি ধাপে কমপক্ষে দুই বছর ৫ শতাংশ করে কমানোর সুপারিশ করা হয়েছে। আয়কর রিটার্ন দাখিলের সময়সীমা আগামী মার্চ পর্যন্ত বর্ধিত করা প্রয়োজন। ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের ৫০ লাখ টার্নওভার পর্যন্ত কর রেয়াত দেওয়া আছে। আসছে বাজেটে এর পরিমাণ ১ কোটিতে উন্নীত করার সুপারিশ করা হয়। করোনা মোকাবিলায় হাসপাতালে কর্মরত ডাক্তার, নার্সসহ অন্যদের এককালীন বোনাসের সুবিধা অথবা কর রেয়াতের সুবিধা দেওয়া প্রয়োজন। স্বাস্থ্যখাতের সঙ্গে সম্পর্কিত যেমন ফার্মাসিউটিক্যালস, হাসপাতাল, ক্লিনিক, ডায়াগনস্টিকস সেন্টারগুলোর কর সুবিধা দেওয়া প্রয়োজন।
খাদ্যপণ্যের দাম ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে রাখার জন্য বাজার পরিস্থিতি বিবেচনা করে পেঁয়াজ, রসুন, আদা, ডাল, সয়াবিন তেল ইত্যাদি পণ্যে আমদানি শুল্ক হ্রাস করা প্রয়োজন। করোনা ভাইরাসের প্রভাবে এরই মধ্যে সরবরাহ ব্যবস্থায় বাধা তৈরি হয়েছে। বাণিজ্যের গতি কমে গেলে রাজস্ব আদায়ও কমে যাবে। তাছাড়া কারখানা বন্ধ হওয়া এবং প্রতিষ্ঠানগুলোর আয় কমে গেলে আসছে বাজেটে করপোরেট কর কমানোর চাপ থাকবে। বর্তমান পরিস্থিতিতে আসছে বাজেটে রাজস্ব সংগ্রহে বড়ো ধরনের চাপ থাকবে। এজন্য কর ফাঁকি এবং অর্থপাচার রোধে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। সেইসঙ্গে এনবিআরের সক্ষমতা বাড়াতে হবে। সিপিডি উল্লেখ করেছে, বাজেটে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ দেওয়া হলে বৈধ করদাতারা নিরুত্সাহিত হবে। তাই আগামী বাজেটে এধরনের সুবিধা না রাখার সুপারিশ করা হয়েছে। প্রস্তাবনায় আরো উল্লেখ করা হয়, অনলাইনে কর প্রদান প্রক্রিয়া সহজ করতে একটি সমন্বিত প্রক্রিয়া থাকতে হবে। রাজস্ব আদায় বাড়াতে এডহক ভিত্তিতে উদ্যোগ নিতে হবে।
