বিশ্বব্যাপী করোনা ভাইরাসের ব্যাপক বিস্তারে কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে সর্বস্তরের মানুষের জীবনযাপন। এমন বাস্তবতায় জীবন বাঁচাতে সবাইকে বিশেষ কিছু নিয়ম-নীতি মেনে চলতে হবে। আর সেইসব বিষয়ে পরামর্শ নিয়ে এবারের কড়চার আয়োজন
l নওশীন শর্মিলী
করোনা ভাইরাস থেকে জীবন বাঁচাতে প্রায় সবাই এখন গৃহবন্দি সময় কাটাচ্ছেন। আগেই বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় সহ সব ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। প্রায় তিন সপ্তাহের জন্য ছুটি দেওয়া হয়েছে দেশের সব সরকারি ও বেসরকারি অফিস। সবাইকে ঘরে রাখতে ও করোনা ভাইরাসের বিস্তার ঠেকাতে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে গণপরিবহন। টানা এতদিন চার দেয়ালের ভেতর বন্দি থাকা খুব একটা সহজ কাজ নয়। দীর্ঘ সময় একই জায়গায় থাকতে হবে, করতে হবে একই ধরনের কাজ। এ সময় একঘেঁয়েমি লাগবে সবকিছু। মনের মধ্যে চেপে বসতে পারে একাকিত্ব। তাই মেনে চলতে পারেন কয়েকটি পরামর্শ—
পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে আন্তরিক আচরণ করুন
দীর্ঘ এই সময় সহজে পার করতে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে আরও বেশি আন্তরিকতাপূর্ণ আচরণ করুন। কাজের চাপে পরিবারের সদস্যদের এতদিন সময় দেওয়ার যে সুযোগ পাননি, এই সময়ে তা পুষিয়ে নিতে সচেষ্ট হউন। এতে করে নিজেদের মধ্যে আন্তরিকতা বাড়বে।
ব্যায়াম করুন
ব্যায়াম যে কোনো সময়েই করা যেতে পারে। কারণ এতে শরীর ও মনের বিশেষ উপকার হয়। কিন্তু এই সময়ে তা আরো বেশি করে করা যেতে পারে। এতে শ্রান্তি দূর হওয়ার পাশাপাশি শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়বে। পাশাপাশি মনও থাকবে সতেজ। সাধারণ সময়ে সবাই ব্যায়াম করতে জিমে যান। কিংবা হাঁটতে বা দৌড়াতে ছুটে যান কাছের কোনো পার্কে বা মাঠে। এখন সেসব করতে পারেন বাড়িতে থেকেই। সে জন্য বাড়ির বড় ঘর কিংবা ছাদ ব্যবহার করতে পারেন। ব্যায়াম করায় সঙ্গী হতে পারে বাড়ির অপর সদস্যরাও; তবে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখতে হবে।
ধ্যান বা প্রার্থনা করুন
দীর্ঘ কর্মহীন সময়ে মনোযোগ ধরে রাখা খুবই কঠিন। সে জন্য করতে পারেন ধ্যান বা প্রার্থনা। এতে করে মনোযোগ বাড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে একঘেঁয়েমি ও একাকিত্বের ক্ষতিকর প্রভাবও কমবে। এ সময়টা প্রার্থনায় নিয়মিত হওয়ার বড় একটা সুযোগ।
যোগাযোগ রাখুন নিয়মিত
গৃহবন্দি থাকা দিনগুলোতে ঘরে বসেই অন্যদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখুন। কাজে লাগান আপনার মোবাইল ফোন। অবশ্য বর্তমানে এর অপকারিতার কথাই বেশি বলছেন। তাদের মতে, মানুষ নাকি মোবাইলে প্রয়োজনের তুলনায় বেশি কথা বলে। তবে এখন এটাই বরং ভালো। মেসেজ চালাচালি নয়, সরাসরি কথা বলুন অন্যদের সঙ্গে। বিশেষ করে আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধু-বান্ধবের সঙ্গে। দৈনন্দিন ব্যস্ততায় অনেক প্রিয়জনের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে কথা বলা হয় না। এই সুযোগে তাদের সঙ্গেও নিয়মিত যোগাযোগ রাখুন। মনে রাখবেন, ইতিবাচক সামাজিক জীবন মানুষকে সুস্থ ও প্রফুল্ল রাখে। বিশেষ করে দুর্যোগপূর্ণ সময়ে।
অন্যের উপকার করুন
ঘরে বসেও মানুষের উপকার করা যায়। হোক সেটা খুবই ছোট কিছু। মনে রাখবেন, নিয়মিত তেমন কিছু করার চেষ্টা করলে নিজের কাছেই নিজের প্রয়োজনীয়তা বোধ তৈরি হয়। মনে হবে ঘরে বসেও আপনি কোনো না কোনো কাজে লাগছেন। হয়তো আপনার কোনো বয়স্ক প্রতিবেশী আছেন। এ সময় তার পক্ষে নিত্যব্যবহার্য পণ্য কিনতে যাওয়া তুলনামূলক বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। নিজের সঙ্গে তার বাজার করে দিতে পারেন।
বই পড়ুন, চলচ্চিত্র দেখুন
একাকিত্ব কাটাতে বই সবচেয়ে ভালো বন্ধু। এই সময়ে তাই আশ্রয় নিন এ বন্ধুর। সেইসঙ্গে দেখতে পারেন পৃথিবীর নানা প্রান্তের চলচ্চিত্রও। তবে বই ও চলচ্চিত্র নির্বাচনে আপনাকে অবশ্যই সতর্ক থাকতে হবে। যেন যা পড়লেন বা দেখলেন—তা আপনার উপকারে আসে।
হার্ভার্ড মেডিকেল স্কুল ও চিকিত্সাবিজ্ঞানী-মনোবিজ্ঞানী
এবং বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ—
n সাধারণ স্বাস্থ্যবিধি ও ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতাবিধি মেনে চলুন।
n রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস গড়ে তুলুন।
n ধূমপানসহ সব ধরনের মাদক এবং চিনিযুক্ত পানীয় বর্জন করুন।
n প্রতিদিন অন্তত ৩০ মিনিট ইয়োগা চর্চা করুন।
n উদ্বেগ নিয়ন্ত্রণে নিয়মিত মেডিটেশন ও প্রাণায়াম চর্চা করুন। নিজ ধর্মমতে প্রার্থনা করুন। রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে প্রার্থনা ও বিশ্বাসের শক্তি বৈজ্ঞানিকভাবে স্বীকৃত।
n বার বার এ-সংক্রান্ত সংবাদ জানতে ও দেখতে উদ্যোগী হবেন না। ভালো বই পড়া এবং এ ধরনের মননশীল কাজে নিজেকে ব্যস্ত রাখুন।
n বাড়িতে অবস্থানকালে পরিবারের সদস্যদের সাথে একাত্মতা বাড়াতে উদ্যোগী হোন।
n পরিবারের শিশুদেরকে আশ্বস্ত করুন—বেশিরভাগ রোগীই সেরে ওঠছে। শিশুর একঘেঁয়েমি কাটাতে তার সঙ্গে ঘরেই খেলায় মতে উঠুন। বই পড়া, নতুন ভাষা শেখা ও লেখালেখির মতো সৃষ্টিশীল কাজে তাদের ব্যস্ত রাখুন। সারাদিন টিভি দেখে বা গেম খেলে সময় কাটাতে দেবেন না।
n সত্যিকার জরুরি প্রয়োজন ছাড়া ফেসবুক টিভি স্মার্টফোন ইন্টারনেট থেকে সচেতনভাবে দূরত্ব বজায় রাখুন। এক বিপদ থেকে বাঁচতে গিয়ে অন্য বিপদ ডেকে আনবেন না।
n আশাবাদী ও ইতিবাচক থাকুন। সব ধরনের নেতিবাচক ও আতঙ্ক সৃষ্টিকারী খবর ও ভিডিও দেখা এবং প্রচার থেকে বিরত থাকুন। প্রাকৃতিক নিয়মে নেতিবাচক প্রচার-প্রচারণা সবার আগে আপনাকেই ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
