করোনায় দেশীয় ফ্যাশন হাউজগুলোর
২ হাজার কোটি টাকা ক্ষতির আশঙ্কা
খালেদ আহমেদ
বাঙালির সবচেয়ে বড় উত্সব পহেলা বৈশাখ। নববর্ষের এই উত্সবকে সামনে রেখে প্রতিবছরই নানা বৈচিত্র্যময় ডিজাইনের পোশাক এবং নানা পণ্যের ব্যবসা চলে দেশীয় ফ্যাশন হাউজগুলোতে। বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও করোনায় প্রভাবে দেশীয় ফ্যাশনে খরা দেখা দিয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে ইতিমধ্যে বৈশাখী অনুষ্ঠান স্থগিত করা হয়েছে। ফলে এ বছর নববর্ষ উপলক্ষে ব্যবসা করার সুযোগ না থাকায় করোনার আঘাত সরাসরি পড়েছে বৈশাখের বাণিজ্যে। এতে শুধু দেশীয় ফ্যাশন খাতে দুই হাজার কোটি টাকা ক্ষতি হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছে ফ্যাশন এন্টারপ্রেনারস এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ফ্যাশন উদ্যোগ)।
জানা গেছে, আমাদের দেশে বছরের দুটি বড় উত্সব পহেলা বৈশাখ ও রোজার ঈদ। এ সময়ে পোশাকের কেনাবেচা জমে ওঠে। ফলে সারা বছরই এ দুটি উত্সবকে কেন্দ্র করে চলে বিভিন্ন প্রস্তুতি। তৈরি করা হয় নতুন নতুন ডিজাইনের নান্দনিক পোশাক। যার প্রস্তুতি অনেক আগেই সম্পন্ন হয়েছিল। বেচাকেনায় জন্য শুরু হয়েছিল নানা আয়োজন। কিন্তু হঠাত্ করোনা ভাইরাসের আঘাতে সব বন্ধ হয়ে গেছে। বৈশাখী বাণিজ্য এবার শেষ। এমন অবস্থায় দেশীয় ফ্যাশন ব্যবসায়ীদের মাথায় হাত। করোনা পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে পহেলা বৈশাখের পর ঈদ বাণিজ্যেও বিপর্যয়ের মুখে পড়বেন দেশীয় ফ্যাশন উদ্যোক্তারা। দেশের নামিদামি ব্র্যান্ডের দেশীয় ফ্যাশন হাউজগুলোর মধ্যে রয়েছে অঞ্জনস, কে ক্র্যাফট, সাদাকালো, আড়ং, নিপুণ, রঙ বাংলাদেশ, বিশ্বরঙ, অন্যমেলা, বাংলার মেলা, ক্যাটস আই, সারা, সেইলর, নবরূপা, নগরদোলা, দেশাল, জেন্টলপার্ক, আমব্রেলা, কান্ট্রিবয় সহ বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান। এসব ব্র্যান্ডের ঈদ ও বৈশাখে নতুন নতুন পণ্য তৈরি করে নিজস্ব শো-রুমেই বিক্রি করে। এছাড়া রয়েছে দেশীয় আরও অনেক প্রতিষ্ঠান।
ফ্যাশন এন্টারপ্রেনারস এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ-এর সভাপতি মো. শাহীন আহম্মেদ বলেন, ‘স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে উদ্যোক্তাদের শ্রম, মেধা ও নিষ্ঠায় দেশীয় ফ্যাশন হাউজগুলোর পোশাক শিল্প স্বতন্ত্র একটি শিল্প হিসেবে গড়ে ওঠেছে। এই শিল্পের ওপর বর্তমানে সারা দেশে প্রায় ৫ হাজার প্রতিষ্ঠান। প্রায় ৫ লাখ মানুষ প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে নির্ভরশীল। সম্প্রতি করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ বিশ্বব্যাপী মহামারী আকার ধারণ করায় এই শিল্পে ব্যাপক বিপর্যয় সৃষ্টি হয়েছে। মার্চ মাসের শুরু থেকে করোনার প্রাদুর্ভাব দেখা দেওয়ায় বেচাকেনা শ্লথ হয়ে এরই মধ্যে প্রায় ১২৫ কোটি টাকা লোকসান গুনতে হয়। আর মার্চের শেষে দেশে সাধারণ ছুটি ঘোষণা করার ফলে বৈশাখী বিক্রি বন্ধ হয়ে যাওয়াতে প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা ক্ষতির সম্মুখীন হবে দেশীয় পোশাক শিল্প খাত।’
তিনি আরও বলেন, ‘এই ফ্যাশন প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্মীদের আগামী তিন মাসের বেতন ভাতা, বোনাস এবং প্রান্তিক কারুশিল্পী ও বয়ন শিল্পীদের কাজের মজুরি প্রদানের ক্ষেত্রে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে, যার পরিমাণ প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকা। এ পরিস্থিতিতে দেশীয় পোশাক শিল্পে যুক্ত প্রান্তিক কারুশিল্পী ও বয়ন শিল্পীদের কাজের মজুরি এবং প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্মীদের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সরকারের কাছে এসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে বিনা সুদে এক বছরের জন্য ৫০০ কোটি টাকা বরাদ্দ প্রদানের জন্য দাবি জানাচ্ছি। উল্লেখ করা প্রয়োজন, এই শিল্পে শতকরা ৮০ জন নারী উদ্যোক্তা এবং নারী কর্মী নিয়োজিত। যারা গ্রামীণ অর্থনীতিতে প্রত্যক্ষভাবে বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখেন। এই পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে ঈদের বেচাকেনাও হারাতে বসবে এই শিল্প খাত।’ সরকারের যথাযথ উদ্যোগই কেবল এই শিল্পকে এবং এই শিল্প সংশ্লিষ্ট মানুষগুলোকে বাঁচিয়ে রাখতে পারে বলেও উল্লেখ করেন ফ্যাশন উদ্যোগ সভাপতি।
এদিকে বর্তমান পরিস্থিতিতে কী পরিকল্পনা করছেন জানতে চাইলে দেশের জনপ্রিয় ফ্যাশন ব্র্যান্ড কে ক্র্যাফটের উদ্যোক্তা খালিদ মাহমুদ খান বলেন, ‘করোনা ভাইরাস শুধু দেশের নয়, বৈশ্বিক সমস্যা। এর ফলে পুরো ব্যবসা-বাণিজ্য স্থবির হয়ে আছে। বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়েই আমরা কর্মপন্থা নির্ধারণ করছি। এজন্য সেফটি বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। বৈশাখ আমাদের একটি বড় উত্সব—এটা এবার বন্ধ থাকবে। অর্থাত্ এ উত্সবে আমাদের বিক্রি শূন্যের কোটায় থাকবে। তাই আমরা বাত্সরিক বিক্রির যে টার্গেট নিয়েছি সেটা এবার পূরণ হবে না। স্বাভাবিকভাবেই ব্যবসাও কমে যাবে।’ এমন পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের উপায় সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এজন্য দুই পক্ষের সহযোগিতা প্রয়োজন। একটা হলো—সরকার এবং অপরটি ক্রেতাসাধারণ (ব্যক্তিগত, কর্পোরেট ও রাষ্ট্রীয়)। এই দুই পক্ষ যদি আগামী দুই বছর দেশীয় পোশাককে ভালোবেসে কেনাকাটা করেন, তবে আমি মনে করি দুই বছর পর দেশীয় ফ্যাশন শিল্প নিজেদের ক্ষতি পুষিয়ে ঘুরে দাঁড়াতে সক্ষম হবে।’
