করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাবে বিশ্বব্যাপী ব্যবসায়-বাণিজ্যের পাশাপাশি বাংলাদেশের কৃষি ও কৃষকের উপর নামিয়া আসিয়াছে চরম বজ্রাঘাত। মাঠ হইতে যখন গ্রীষ্মকালীন সবজি, জলাশয় হইতে মাছ সংগ্রহের সময় হইয়াছে, তখন দেশব্যাপী লকডাউনের অভিঘাতে দিশাহারা কৃষকসমাজ। করোনার কালবেলায় দেশের বাজারে সকল প্রকার পণ্যের চাহিদা নামিয়াছে এক-তৃতীয়াংশে। অপরদিকে করোনার কারণে বৃদ্ধি পাইয়াছে পণ্যবাহী ট্রাকের ভাড়া। ফলে গ্রাম হইতে শহরে সবজি ও অন্যান্য কৃষিপণ্য আসিবার পরিমাণও কমিয়া গিয়াছে মারাত্মক হারে। ইহাতে মাথায় হাত উঠিয়াছে কৃষকের। বহু কষ্টে ফলানো কৃষিপণ্য নষ্ট হইতেছে খেতের মধ্যেই। কৃষি অর্থনীতিবিদ কেহ কেহ আশঙ্কা করিতেছেন, আগামী দুই সপ্তাহ এই অবস্থা চলিতে থাকিলে দেশের কৃষি ও কৃষক বড়ো ধরনের ক্ষতির মুখে পড়িবে। এমনকি তাহাতে ভাঙিয়া পড়িতে পারে দেশের খাদ্যনিরাপত্তাও।
বিষয়টিকে ভয়ানক এক অশনিসংকেত হিসাবে দেখা বিশেষ জরুরি। কারণ, বাংলাদেশের জাতীয় অর্থনীতি দাঁড়াইয়া রহিয়াছে প্রধানত কৃষি, তৈরি পোশাকশিল্প এবং প্রবাসী শ্রমিকদের পাঠানো রেমিট্যান্সের উপর। মনে রাখিতে হইবে, শেষের দুইটি কোনো চিরস্থায়ী ব্যবস্থা নহে। কিন্তু কৃষি চিরস্থায়ী ব্যবস্থা। স্বাধীনতার পর বিগত প্রায় পাঁচ দশকে কৃষিক্ষেত্রে বাংলাদেশ অভাবিত উন্নতিসাধন করিয়াছে। বিপুল জনঘনত্বের এই দেশে এখন আর কেহ না খাইয়া দিনাতিপাত করে না। অথচ এখনো আমাদের কৃষকসমাজকে নানা রকম প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং আবহাওয়ার প্রতিকূল অবস্থা মোকাবিলা করিয়াই টিকিয়া থাকিতে হয়। কৃষকেরা অনেক ধরনের প্রতিকূল পরিস্থিতি মোকাবিলা করিতে অভ্যস্ত থাকিলেও করোনার এই পাথরসময়ের মতো দমবন্ধ পরিস্থিতির মুখে আগে কখনো পড়ে নাই। কাওরান বাজার ক্ষুদ্র আড়তদার সমবায় সমিতির সভাপতি জানাইয়াছেন, স্বাভাবিক সময়ে প্রতিদিন এই বাজারে অন্তত ৩০০ ট্রাক সবজি কেনাবেচা হইয়া থাকে। কিন্তু সম্প্রতি এইখানে ১০০ ট্রাক সবজিরও কাটতি থাকিতেছে না। স্পষ্টতই এই খাতে নিয়োজিত ব্যবসায়ীরাও চরম ক্ষতির মধ্যে পড়িয়াছেন। এই অবস্থা কতদিন চলিবে, তাহাও কেহ জানে না। করোনার ক্ষতি মোকাবিলায় সরকার অন্যান্য খাতের ক্ষেত্রে বিশেষ কিছু সুবিধা ও সহায়তা প্রধান করিতেছে। কিন্তু কৃষকের ক্ষতির জন্য কোনো তহবিলের কথা শুনা যায় নাই। আমরা মনে করি ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের ঋণের কিস্তির সময়কাল বৃদ্ধি এবং নিদেনপক্ষে কিস্তি পরিশোধের সময়কাল যুক্তিযুক্ত বেশ কয়েক মাস পিছাইয়া দেওয়া একান্ত প্রয়োজন। বিশেষ করিয়া যাহারা অত্যধিক ক্ষতির শিকার হইয়াছেন কিংবা হইতে যাইতেছেন, তাহাদের ঋণের সুদ মওকুফ অথবা এককালীন সাহায্য দেওয়ার জন্য তহবিল গঠন করা যাইতে পারে।
মনে রাখিতে হইবে, করোনার এই ভয়াল সময়ে দেশের খাদ্যনিরাপত্তা সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ। আর তাহাতে নিয়োজিত যেই সকল সৈনিক, সেই কৃষকদের রক্ষা না করিলে মহাবিপদ ঘটিতে পারে। সকলেরই ছুটিছাঁটা রহিয়াছে, কিন্তু কৃষিসৈনিকদের নাই। সকলে ঘরে বসিয়া করোনা ঠেকাইবার সুযোগ পাইলেও কৃষককুল কিন্তু বসিয়া নাই। কারণ, তাহারা ছুটি লইলে আমাদের না খাইয়া থাকিতে হইবে। সুতরাং কৃষকের সমস্যাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়া সমাধান করিতেই হইবে। ইহার ব্যত্যয় ঘটিলে জাতির জন্য তাহা আত্মঘাতী তুল্য হইবে।
