করোনায় আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) একজন পরিচালক। গতকাল সোমবার সকাল সাড়ে ৭টায় রাজধানীর উত্তরায় কুয়েত মৈত্রী হাসপাতালে চিকিত্সাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান।
এদিকে দুদকের পরিচালক মারা যাওয়ার পর তার স্ত্রী ও ছেলেকে আইসোলেশনে নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে গত ২৪-২৫ মার্চ অফিস করার সময় তার সংস্পর্শে আসা কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কোয়ারেন্টাইনে পাঠানো হয়েছে বলে জানা গেছে।
পরিচালকের মৃত্যুতে দুদকের কর্মকর্তা-কর্মচারী ও সহকর্মীদের মধ্যে শোকের ছায়া নেমে আসে। এ ঘটনায় দুদকের চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদ শোক প্রকাশ করেছেন।
দুদকের পরিচালক (জনসংযোগ) প্রণব কুমার ভট্টাচার্য্য জানান, গতকাল সোমবার সকালে তিনি মারা যান। তিনি করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে চিকিত্সাধীন ছিলেন। তাকে আইসিইউতে রাখা হয়েছিল।
দুদক সূত্র জানায়, গত ২২ মার্চ প্রথম দফায় জ্বর আসে তার। তখন তাপমাত্রা কম ছিল। ঐ সময় তার জ্বর সেরে যায়। দ্বিতীয় দফায় ২৪-২৫ তারিখে তার জ্বর আসে। তখনো তাপমাত্রা কম ছিল। জ্বরের সঙ্গে হালকা কাশিও ছিল। দুই দিন পর তিনি সুস্থ হয়ে যান। তবে জ্বর নিয়ে তিনি অফিস করেন। তৃতীয় দফায় ৩০ তারিখে তার পুনরায় জ্বর আসে। এবার তাপমাত্রা বেশি ছিল। সেদিনই তিনি আইইডিসিআরকে জানান। পরে আইইডিসিআর তার নমুনা সংগ্রহ করে এবং রাতেই তাকে করোনা পজিটিভ বলে জানানো হয়। এরপর তাকে কুয়েত মৈত্রী হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তাকে ভেন্টিলেশনে রাখা হয়েছিল। তাকে কৃত্রিম শ্বাস-প্রশ্বাস দেওয়া হচ্ছিল। রবিবার তার শারীরিক অবস্থার কিছুটা উন্নতি হয়। কৃত্রিম শ্বাস-প্রশ্বাসব্যবস্থার প্রয়োজন হবে না বলে আশা করা হচ্ছিল। কিন্তু গতকাল ভোরে হঠাত্ তার শারীরিক অবস্থার অবনতি হয়। একপর্যায়ে সকাল সাড়ে ৭টায় তিনি মারা যান।
জানা গেছে, দুদকের ঐ পরিচালক প্রশাসন ক্যাডারের ২২তম ব্যাচের কর্মকর্তা ছিলেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের প্রাক্তন শিক্ষার্থী। প্রশাসন ক্যাডারে যোগ দেওয়ার আগে তিনি ১৭তম বিসিএস শিক্ষা ক্যাডারে কাজ করেন। স্ত্রী ও এক সন্তানসহ ঢাকায় থাকতেন।তার একমাত্র ছেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। এদিকে এক বিবৃতিতে দুদকের পরিচালকের মৃত্যুতে গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ পুলিশ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন, বাংলাদেশ ফরেন সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন, পুলিশ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার মোহা. শফিকুল ইসলাম এবং সাধারণ সম্পাদক নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশ সুপার মোহাম্মদ জায়েদুল আলম। এক বিবৃতিতে তারা মরহুমের বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি গভীর সমবেদনা জ্ঞাপন করেছেন। ফরেন সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি সৈয়দ মাসুদ মাহমুদ খন্দকার ও সাধারণ সম্পাদক খোরশেদ আলম খাস্তগীর এক বিবৃতিতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন।
ছেলের আকুতি
এদিকে দুদক পরিচালকের করোনায় আক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়ার ঘটনায় তার একমাত্র ছেলে সেলফ আইসোলেশনে থেকে ফেসবুকে এক আকুতি জানিয়েছেন। তিনি লিখেছেন, আমার বাবা দুদক পরিচালক, সকালে সাড়ে ৭টার দিকে কার্ডিয়াক অ্যারেস্টের কারণে মৃত্যুবরণ করেন (ইন্না লিল্লাহি...রাজিউন)। উনি গত ৩০ মার্চ করোনা ভাইরাসে (কোভিড-১৯) আক্রান্ত হয়ে উত্তরার বাংলাদেশ-কুয়েত মৈত্রী হাসপাতালে চিকিত্সাধীন ছিলেন। আমি তার একমাত্র সন্তান। আমি এবং আমার আম্মু দুই জনই পরিপূর্ণরূপে সুস্থ আছি। আমরা গত সাত দিন ধরে দুই জনই সেলফ আইসোলেশনে আছি, কোনো হাসপাতালে না। আমাদের দুই জনকে আরও সাত দিন আইসোলেশনে থাকতে হবে। আইসোলেশনের কারণে বাবার জানাজার এবং কবর দেওয়ার ক্ষেত্রে অংশ নিতে পারিনি। এর চেয়ে বেদনার কিছু আর নেই। বাবাকে সোমবার ৪টার দিকে আজিমপুর কবরস্থানে দাফন করা হয়। উনি একজন সত্ ও নিষ্ঠাবান মানুষ ছিলেন। তার আত্মার মাগফেরাত কামনা করছি।
আমার বাবা জীবিকার তাগিদে সরকারি আদেশ না আসা পর্যন্ত ২২ মার্চ পর্যন্ত অফিস করেছিলেন। তার পর থেকে তিনি বাসাতেই ছিলেন। কিন্তু তবুও রক্ষা পাননি। তাই এখনো যারা ঘরে থাকার বিধিনিষেধ মানছেন না, তাদের সবাইকে ঘরে থাকার অনুরোধ জানাচ্ছি। এই মুহূর্তে আমার এবং আমার পরিবারের ওপর দিয়ে যা যাচ্ছে সেটা কোনোদিন আমার শত্রুকেও যেন মোকাবিলা করতে না হয়।
