গত ২৫ ডিসেম্বর সারা বিশ্বে পালিত হইয়াছে খ্রিস্টান ধর্মের সবচাইতে বড় ধর্মীয় উত্সব বড় দিন। ইহার একদিন আগে ঐতিহ্যবাহী ‘ক্রিসমাস ইভ’ সমাবেশে বিশ্বের ক্যাথলিক খ্রিস্টানদের প্রধান ধর্মীয় গুরু পোপ ফ্রান্সিস তাহার বক্তৃতায় বলেন যে, যিশু খ্রিস্টের জন্ম হইয়াছিল দরিদ্র পরিবারে। আর ইহা হইতে আমাদের জীবনের অর্থ খুঁজিয়া নিতে হইবে। এই বলিয়া তিনি উন্নত দেশের মানুষদের সাদাসিধে ও কম বিলাসী জীবন-যাপনের অনুরোধ জানান। জীবনের জন্য এত জিনিসপত্র এবং জটিল প্রণালি কি সত্যিই দরকার তাহা নিয়া নিজেদের প্রশ্ন করিতে বলেন এবং অপ্রয়োজনীয় জিনিসগুলো বাদ দিয়া ও যথাসম্ভব লোভ সংবরণ করিয়া চলিবার পরামর্শ দেন।
বর্তমানে অনেক মানুষের কাছে জীবনের মানে হইয়া দাঁড়াইয়াছে অধিকার করা, অনেক জিনিস নিজের কাছে রাখিয়া দেওয়া। অথচ অনেক মানুষ বাঁচিয়া থাকিবার ন্যূনতম খাবারটুকুও পাইতেছে না। মূলত বস্তুবাদের আধিক্যের কারণে এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হইয়াছে। অথচ বিভিন্ন ধর্ম ও তাহার প্রবর্তকগণ এবং জ্ঞানী-গুণী-মনীষীগণ নির্লোভ ও সহজ-সরল জীবন যাপনের প্রতি গুরুত্ব দিয়াছেন। যেমন-আলেকজান্ডার দ্য গ্রেট বলিয়াছেন, ‘যে সহজ-সরল জীবন যাপন করে সুখ তাহার জন্য অত্যন্ত সুলভ্য।’ প্রকৃতপক্ষে সহজ-সরল জীবন যাপনের মধ্যে এক ধরনের সুখ আছে যাহা অব্যাখ্যাযোগ্য। যাহারা এভাবে জীবন যাপন করেন, তাহাদের মধ্যে একটা মন থাকে। সেই মন পৃথিবীর সকল কষ্টকে সুখে পরিণত করে। তাই তাহারা অন্যদের চাইতে ভালো জীবন যাপন করেন। চীনে একটি প্রবাদ আছে যাহার অর্থ হইল- গরিব হইতে বিলাসী জীবনের সঙ্গে খাপ খাওয়ানো অনেক সহজ, কিন্তু বিলাসী জীবন হইতে গরিব জীবনে ফিরিয়া যাওয়া অনেক অনেক কঠিন। কিন্তু আধুনিককালে এই পৃথিবীতেই একশ্রেণির বিত্তবান আছেন যাহারা এই কঠিন কাজটিকেও সহজ করিয়া নিয়াছেন। মেক্সিকোর সবচাইতে বিত্তশালী ব্যক্তিটির নাম কার্লোস স্লিম। তিনি ২০১০ সালে ফোর্বস ম্যাগাজিনের নির্বাচিত বিশ্বের প্রথম বিত্তশালী হন। অথচ তিনি ৪০ বত্সর ধরিয়া একটি ভাঙা বাড়িঘরে বসবাস করিতেছেন। হাতে পরিতেছেন প্লাস্টিকের একটি সস্তা ঘড়ি। শেয়ারবাজারের ‘স্টক গড’ নামে পরিচিত ওয়ারেন বাফেটও পুরাতন বাড়িতে বসবাস করেন এবং পুরাতন গাড়ি ব্যবহার করেন। তিনি তাহার মানিব্যাগটি ২০ বত্সর ধরিয়া ব্যবহার করিয়া আসিতেছেন। বিশ্বের তরুণ বিত্তশালীদের অন্যতম ও ফেসবুকের প্রতিষ্ঠাতা মার্ক জাকার্বাগের বিয়ের অনুষ্ঠানটি কোনো বিলাসী হোটেলের পরিবর্তে হইয়াছে তাহার নিজের বাসায় সাদামাটাভাবে। আর বিল গেটসের কথা বলাইবাহুল্য। বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় এই ধনী ব্যক্তিটির কোনো ব্যক্তিগত ড্রাইভার নাই। তিনি বিমানের শোভন শ্রেণির কামরার টিকিট আর দোকানের ডিসকাউন্ট করা দ্রব্য কিনিতে পছন্দ করেন।
যাহারা ব্যক্তিগত জীবনে বিলাসী, তাহারা খুব কমই সুখী হন। কেননা কার্লোস স্লিমের মতে, প্রত্যেককে সফলতার জন্য চেষ্টা করা উচিত। তবে শুধু বস্তুগত আরামের কথা ভাবা হইলে তাহা হইবে পশুর মতো। তিনি মনে করেন, বিত্তশালী ও গরিব মানুষের মূল পার্থক্য হইল ভোগ আর পুঁজি বিনিয়োগের পার্থক্য বোঝা। অতএব, আমাদের যথাসম্ভব সহজ-সরল জীবন যাপনে অভ্যস্ত হওয়া প্রয়োজন।
