পার্বত্য চট্টগ্রাম ১৩,২৯৫ বর্গ কিলোমিটার এলাকা নিয়ে বিস্তৃত। ২০১১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী এ এলাকার জনসংখ্যা ১৫,৯৮,২৯১ জন। এদের মধ্যে ৫ লক্ষ মানুষ ১৪ টি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর অধিবাসী। পার্বত্যাঞ্চলের আসন অনুসারে ভোটার সংখ্যা হলো- খাগড়াছড়ি: ৪,৪১৭৪৩, রাঙ্গামাটি: ৪,১৮২১৫ ও বান্দরবান: ২,৪৬৬৫৩ জন। অর্থাত্ পাহাড়ি-বাঙালি মিলে ১১ লাখ ভোটার সেখানকার সাংসদ নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। উল্লেখ্য, ২০০৮ ও ২০১৪ সালে আওয়ামী লীগ নির্বাচনী এলাকা ধরে রাখে বান্দরবান (১৯৯৬ ও ২০০১ সালে বান্দরবানে আওয়ামী লীগ জয়ী হয়) ও খাগড়াছড়িতে। কিন্তু ২০১৪ সালে রাঙ্গামাটিতে স্বতন্ত্র প্রার্থী জয়ী হয়েছিল। যদিও ২০০৮ সালে এই আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থীই বিজয়ী হন। দেখা যাচ্ছে পার্বত্য এলাকার তিনটি আসনে আওয়ামী লীগেরই জনপ্রিয়তা অতীতে প্রমাণিত হয়েছে। পার্বত্য এলাকার ভোটাররা ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনেও আওয়ামী লীগের জয়কে নিশ্চিত করবে বলে আমরা আশা করি।
ইতোমধ্যে নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী সকল দল তাদের নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করে প্রচার-প্রচারণার কাজও শেষ করেছে। ইশতেহারে পার্বত্য অঞ্চল ও ‘ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী’দের নিয়ে প্রতিশ্রুতিও লিপিবদ্ধ রয়েছে। আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ‘বিশেষ ব্যবস্থা’র কথা উল্লেখ করা হয়েছে। বিভিন্ন অঙ্গীকারের মধ্যে তাদের বিষয়ে বলা হয়েছে- ‘ক্ষুদ্র নৃ-জাতিগোষ্ঠীর প্রতি বিদ্যমান বৈষম্যমূলক সকল আইন ও অন্যান্য অন্যায় ব্যবস্থাপনা বন্ধে সরকার কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করবে। দেশে কোনো ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা অঞ্চলের মানুষ পিছিয়ে থাকবে না। আর সে কারণেই সমৃদ্ধির বাংলাদেশের পথে সকলকে সঙ্গে নিয়ে হাত ধরে এগিয়ে যাবার স্বপ্ন দেখা হচ্ছে। এ স্বপ্ন বাস্তবায়নে অনগ্রসর ও অনুন্নত ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর সন্তানদের শিক্ষা ও চাকরিতে ক্ষেত্রবিশেষ কোটা এবং সুযোগ-সুবিধা অব্যাহত রাখার ব্যবস্থাপনা গ্রহণ করা হবে। এছাড়া দীর্ঘদিন ধরে নিজ ভাষায় শিক্ষার দাবি জানিয়ে আসছিল পার্বত্য চট্টগ্রামসহ বাংলাদেশের অন্যান্য স্থানে বসবাসকারী ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীগুলো। তাদের সেই ইচ্ছা ও চাওয়ার প্রতি সমর্থন জানিয়ে আওয়ামী লীগের এবারের ইশতেহারে ঘোষণা করা হয়েছে- ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী ও অন্যান্য সমপ্রদায়ের অধিকারের স্বীকৃতি এবং তাদের ভাষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি ও জীবনধারার স্বাতন্ত্র্য সংরক্ষণ ও তাদের সুষম উন্নয়নের জন্য অগ্রাধিকার ভিত্তিক কর্মসূচি গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করা হবে। আরো প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে, সমতলের ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর জমি, জলাধার ও বন এলাকায় অধিকার সংরক্ষণের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণসহ ভূমি কমিশনের কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে। উল্লেখ্য, পার্বত্য চট্টগ্রামের জাতিগোষ্ঠীগুলোর মধ্যে পারস্পরিক আস্থা বৃদ্ধি ও সম্পর্ক উন্নয়ন, পার্বত্য শান্তিচুক্তি বাস্তবায়ন, দেশ রক্ষা ও উন্নয়নে উপজাতি যুবসমাজকে সম্পৃক্ত করা, বন ও পরিবেশ রক্ষার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে বিগত আওয়ামী লীগ সরকার। মুক্তিযুদ্ধের পরবর্তী সময়ে শান্তিবাহিনীর সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা হত্যা করেছিল অসংখ্য নিরীহ ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী, বাঙালি ও নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের। ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর শান্তিচুক্তি সম্পাদিত হবার পর শান্তিবাহিনীর সদস্যরা অস্ত্র জমা দিয়ে সাধারণ ক্ষমা ও পুনর্বাসনের রাষ্টী্রয় সুবিধা গ্রহণ করে। তবে ২০০৮-এর ডিসেম্বর এবং ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারিতে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে বিগত ১০ বছরে আওয়ামী লীগ সরকারের আন্তরিকতায় শান্তিচুক্তি বাস্তবায়নের কাজ দ্রুত এগিয়ে চলেছে। পার্বত্য অঞ্চলে স্বাধীনতার আগে ১৯৭০ সালে মাত্র ৪৮ কিমি রাস্তা ছিল। কিন্তু স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগ সরকার পার্বত্য অঞ্চলে নির্মাণ করেছে প্রায় ১৫৩৫ কিমি রাস্তা, অসংখ্য ব্রিজ ও কালভার্ট। এ ছাড়াও বিভিন্ন সরকারি, আধাসরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প, কলকারখানাসহ সম্পন্ন হয়েছে অনেক উন্নয়ন কার্যক্রম। ১৯৭০ সালে পার্বত্য চট্টগ্রামে মাত্র ছয়টি উচ্চবিদ্যালয়/কলেজ ছিল যার বর্তমান সংখ্যা ৪৭৯টি। প্রাথমিক বিদ্যালয় এখন প্রায় প্রতিটি পাড়ায়। এ ছাড়াও ৫টি স্টেডিয়াম, ২৫টি হাসপাতাল এবং বর্তমানে ১৩৮২টি বিভিন্ন কটেজ ইন্ডাস্ট্রি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। শিক্ষার হার ১৯৭০ সালে মাত্র ২% শতাংশ ছিল যা বেড়ে এখন ৪৪.৬% হয়েছে। চাকমা ও তঞ্চঙ্গ্যা জনগোষ্ঠীর শিক্ষার হার ৭৩ শতাংশে পৌঁছেছে। উন্নয়নের আরো স্পষ্ট নজির রয়েছে শান্তিচুক্তির ৭২টি ধারার মধ্যে ৪৮টি ধারার সম্পূর্ণ বাস্তবায়নের মধ্যে। চুক্তির আরো ১৫টি ধারা আংশিকভাবে এবং ৯টি বাস্তবায়নের প্রক্রিয়ায় রয়েছে। আশা করা হচ্ছে, ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনে জয়ী হয়ে শেখ হাসিনার সদিচ্ছায় বাকি ধারাগুলোও বাস্তবায়িত হবে।
কারণ শেখ হাসিনা জানেন, পাহাড়ি ও সমতলের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর জীবন, সম্পদ, সম্ভ্রম ও মর্যাদা সুরক্ষা করা কীভাবে সম্ভব এবং কতটা জরুরি। পার্বত্য অঞ্চলের উন্নয়ন কার্যক্রম আরো জোরদার করার জন্য তাঁর নেতৃত্বের কোনো বিকল্প নেই। পাহাড়ি-বাঙালি সকলে আওয়ামী লীগকে ভোট দিয়ে সে কথাই প্রমাণ করবেন বলে আমরা বিশ্বাস করি।
n লেখক : অধ্যাপক, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়
