বাঙালির স্বর্ণোজ্জ্বল একটি মুহূর্তের কথা

আপডেট : ১০ এপ্রিল ২০২০, ২২:০১

১০ই এপ্রিল। লাল অক্ষরে লেখা একটি দিন। স্বাধীন বাঙালির প্রথম সরকারের জন্ম হয়েছিল। হাজার বছরের ইতিহাসের স্বর্ণোজ্জ্বল একটি মুহূর্ত। জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর দীর্ঘ সংগ্রাম ও লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে জন্ম হয় একটি অবিস্মরণীয় মুহূর্তের, যেদিন বঙ্গবন্ধুর নির্দেশনায় জাতীয় চার নেতা সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, এম মনসুর আলী এবং এ এইচ এম কামারুজ্জামানের নেতৃত্বে গঠিত হয় স্বাধীন বাংলাদেশ সরকার। স্বাধীন বাংলাদেশ সরকারের প্রথম রাষ্ট্রপতি হিসেবে ঘোষিত হয় জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নাম। স্বাধীন বাংলাদেশের ঘোষণাপত্র এই দিন অনুমোদিত হয়। পরবর্তী সময়ে স্বাধীন বাংলার প্রথম সরকার শপথ গ্রহণ করে ১৭ই এপ্রিল মেহেরপুর জেলার বৈদ্যনাথতলার আম্রকাননে। ইতিহাসের এই এক দুর্লভ মুহূর্ত।

স্বাধীন বাংলার শত বছর পূর্বে স্বাধীনতার সূর্য অস্তমিত হয়েছিল পলাশীর এক আম্রকাননে। আবার ইতিহাসের এক অমোঘ নিয়মে বৈদ্যনাথতলার আম্রকাননে বাংলাদেশের স্বাধীনতার নতুন সূর্য উদিত হয়েছে, যার নাম কৃতজ্ঞ বাঙালি জাতি দিয়েছিল মুজিবনগর। বঙ্গবন্ধুর আজীবনের চার বিশ্বস্ত সহচর অসীম সাহস অদূরদর্শিতা নিয়ে বঙ্গবন্ধুর আজীবনের স্বপ্ন বাস্তবায়নে দৃঢ় পদক্ষেপে মৃত্যুকে উপেক্ষা করে চূড়ান্ত লড়াইয়ে ঝাঁপিয়ে পড়লেন এই এপ্রিলে। ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম শেষে মৃত্যুঞ্জয়ী এই চার নেতা বাঙালিকে বিজয় উপহার দিলেন এবং বঙ্গবন্ধুকে সুস্থ দেহে ফিরিয়ে আনলেন।

আজকের এই মুহূর্তে বঙ্গবন্ধু ও জাতীয় চার নেতার প্রতি আমার শতকোটি বিনম্র শ্রদ্ধা। শ্রদ্ধা জানাই বীর মুক্তিযোদ্ধাদের লক্ষ লক্ষ শহিদের আত্মার প্রতি। সালাম জানাই ভারতের প্রধানমন্ত্রী প্রয়াত ইন্দিরা গান্ধীসহ ভারতের জনগণকে, যারা আমাদের স্বাধীনতাসংগ্রামে অর্থ, অস্ত্র ও আশ্রয় দিয়ে সহযোগিতা করেছেন।

আজ দেশ ও জাতি এক মহা বিপর্যয়ের সম্মুখীন। করোনা ভাইরাসের মতো এক অদৃশ্য শত্রু সারা বিশ্বকে ছারখার করে দিচ্ছে। দুর্ভাগ্য আমাদের, আজ আমরা বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী পালনের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছি। ২৬শে মার্চ স্বাধীনতা দিবসের আনন্দ ম্লান হয়ে গিয়েছে। প্রতিদিন প্রতি মুহূর্ত ভয়ে-আতঙ্কে ঘরে বন্দি হয়ে আছে বাঙালির জীবন। কয়েক যুগ পরে স্বচ্ছ নীল আকাশ, মুক্ত বাতাস যেন মাঝেমধ্যে নিজেদের কাছে দুঃসহ হয়ে উঠছে। এত দুর্যোগের মধ্যে একটু স্বস্তির খবর বঙ্গবন্ধু এবং জাতীয় চার নেতার পলাতক একজন ঘাতক মাজেদ গ্রেফতার হয়েছে। আইনের বিধান অনুযায়ী দ্রুত এই ঘাতকের ফাঁসি কার্যকর হবে নিশ্চয়ই। তবে ঘাতক ১৫ই আগস্ট জাতির জনক ও বঙ্গবন্ধুর পরিবারের হত্যাকাণ্ডে অংশ নিয়েছে, এমনকি এর হাত থেকে শিশু রাসেলও রেহাই পায়নি। এখানেই শেষ নয়, এই নরঘাতকদের জেল অভ্যন্তরে ঢুকে ৩রা নভেম্বর জাতীয় চার নেতাকে নৃশংসভাবে হত্যাকাণ্ডে অংশ নিয়েছে। বঙ্গবন্ধু এবং জাতীয় চার নেতাকে হত্যাকারীদের অনেকের বিচার হয়েছে এবং দণ্ড কার্যকর হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাহস ও বিচক্ষণতার কারণে এই বিলম্বিত বিচার হয়েছে এবং অনেকের দণ্ড কার্যকর হয়েছে। দেশবাসীসহ আমাদের অনেকের রক্তক্ষরণ বন্ধ হয়েছে। কিন্তু একটি প্রশ্ন থেকেই যায়।

বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের বিচারের শেষে যখন জেল হত্যাকাণ্ডের বিচার শুরু হয় সে সময় খালেদা জিয়া সরকার ক্ষমতায় ছিল। সেই সরকারের সরাসরি হস্তক্ষেপের কারণে জেলহত্যার বিচার বারবার বাধাগ্রস্ত হয়েছিল এবং তাদের আজ্ঞাবহ প্রশাসন এবং বিচারকের কারণে সুষ্ঠু বিচার হয়নি। ঐ হত্যাকাণ্ডের অনেক নেপথ্য খলনায়কের মুখোশ এখনো উন্মোচিত হয়নি। সেজন্য বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে অনুরোধ রেখেছি, এই গ্রেপ্তারকৃত খুনি মাজেদের কাছ থেকে অনেক তথ্য জানা যেতে পারে। কারণ আমি এখনো মনে করি, সেনাশাসক জিয়াউর রহমান বঙ্গবন্ধু হত্যার অন্যতম খলনায়ক। তার নির্দেশনায় দেশে রাজনৈতিক শূন্যতা সৃষ্টি করার লক্ষ্যে জেল অভ্যন্তরে জাতীয় চার নেতাকে হত্যা করা হয়েছিল এবং এ হত্যাকাণ্ডগুলোর সঙ্গে অনেকেই জড়িত ছিল, যারা এখনো বিচারের সম্মুখীন হয় নাই। তাদের মুখোশ উন্মোচিত হওয়া দরকার, অন্যথায় এই নির্মম হত্যাকাণ্ডের কাল অধ্যায়টি অন্ধকারেই থেকে যাবে।

n লেখক : প্রেসিডিয়াম সদস্য, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ