নির্বাচন গণতন্ত্রের প্রাণ। সুষ্ঠু-নিরপেক্ষ-গ্রহণযোগ্য এবং প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচন গণতান্ত্রিকব্যবস্থার পূর্বশর্ত। নির্বাচন প্রক্রিয়ায় ভোটের মাধ্যমে দেশের মানুষের স্বাধীন ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটে। কেননা নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণের পছন্দের প্রার্থীরাই দেশ শাসনের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। আগামীকাল ৩০ ডিসেম্বর একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সারা দেশে সৃষ্টি হয়েছে উত্সবের আমেজ। বিশেষ করে প্রধান বিরোধী দল বিএনপিসহ সব রাজনৈতিক দল নির্বাচনে অংশ নেওয়ায় এ আমেজের মাত্রা আরো বেড়েছে। চায়ের দোকান, পাড়া-মহল্লা, হাট-বাজার, অলিগলি সর্বত্রই এখন আলোচনার বিষয় নির্বাচন।
একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মোট ভোটার সংখ্যা ১০ কোটি ৪১ লাখ ৯০ হাজার ৫৭৩ জন। এর মধ্যে নারী ভোটার ৫ কোটি ১৬ লাখ ৪৩ হাজার ২৭৯ জন এবং তরুণ ভোটারদের সংখ্যা প্রায় আড়াই কোটি। এই নির্বাচনের ফল নির্ধারণে তরুণ এবং নারী ভোটারের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। নির্বাচনকে ঘিরে তরুণ ও নারীসহ সকল ভোটারের প্রাণের দাবি হলো ভোটকেন্দ্রে নিরাপত্তা এবং একটি উত্সবমুখর পরিবেশ। যাতে ভোটাররা নির্বিঘ্নে এবং নির্ভয়ে ভোটকেন্দ্রে গিয়ে পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিতে পারেন।
বাংলাদেশের ১৯৯১ সাল থেকে গত ছয়টি জাতীয় নির্বাচন সহিংসতামুক্ত ছিল না। প্রতিটি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আহত এবং নিহতের ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু গণতন্ত্রে এটা কখনোই কাম্য নয়। একজন নাগরিক তার নাগরিক কর্তব্য ভোট প্রয়োগ করতে এসে নির্বাচনী সহিংসতায় প্রাণ হারানো গণতন্ত্রের জন্য এক ধরনের কলঙ্ক। অন্যদিকে সহিংসতা নির্বাচনের সৌন্দর্যকে নষ্ট করে এবং ভোটারদের মধ্যে ভীতির সৃষ্টি করে। যার ফলে ভোটকেন্দ্রে উত্সবমুখর পরিবেশ থাকে না। আমাদের দেশে তিনটি ধাপে নির্বাচনী সহিংসতা দৃশ্যমান— নির্বাচন পূর্ববর্তী, নির্বাচনকালীন এবং নির্বাচন পরবর্তী সহিংসতা। এসব সহিংসতার মধ্যে রয়েছে খুন, অপহরণ, জালভোট, ব্যালটবাক্স ছিনতাই, কেন্দ্রদখল এবং অগ্নিসংযোগ। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে এ সমস্ত সহিংসতার ফলাফল ভয়াবহ। সহিংসতা কখনো ভালো কিছু দিতে পারে না বরং মানুষের মনে দীর্ঘকালীন রাজনৈতিক ঘৃণা ও ক্ষোভের সৃষ্টি করে।
একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর থেকে বেশ কিছু এলাকায় নির্বাচন পূর্ববর্তী সহিংসতা দেখা গিয়েছে। সুতরাং আর সহিংসতা নয়; সময় এসেছে আমাদের ঘুরে দাঁড়ানোর এবং সহিংসতাকে না বলে নির্বাচনের উত্সবকে আনন্দঘন পরিবেশে উদযাপন করার। আমরা সাধারণ ভোটাররা আসন্ন নির্বাচনকে কেন্দ্র করে কোনো ধরনের সহিংসতা চাই না। নির্বাচনকে ঘিরে আমরা কোনো লাশ চাই না। আমরা একটা শান্তিপূর্ণ নির্বাচনী পরিবেশ চাই। এজন্য সকল রাজনৈতিক দলকে সহিংসতার পথ পরিহার করে নির্বাচনী আচরণবিধি মেনে চলতে হবে। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের নির্বাচনী দায়িত্ব পালন করতে হবে সততা ও সাহসিকতার সঙ্গে। নির্বাচন অনুষ্ঠানে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে চাইলে নির্বাচন কমিশনের অধীনে কর্তব্যরত শাসন বিভাগের কর্মকর্তাকে তাত্ক্ষণিক ব্যবস্থা নিতে হবে এবং বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারীদের আইনের আওতায় আনতে হবে। ভোটাররা যাতে নির্বিঘ্নে ভোটকেন্দ্রে গিয়ে পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিয়ে নিরাপদে বাড়ি ফিরতে পারেন সেজন্য আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সার্বোত্ক্ষণিক সজাগ থাকা জরুরি। সর্বোপরি, নির্বাচন কমিশনকে নির্বাচনকালীন আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে মনিটর করতে হবে। পরিশেষে, আশা করি একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন হোক উত্সবমুখর এবং প্রাণবন্ত।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
