ভয়ঙ্কর একটি দিন পার করলো যুক্তরাষ্ট্র। দেশটিতে নভেল করোনা ভাইরাস এক দিনেই কেড়ে নিল দুই হাজারের বেশি প্রাণ। কোভিড-১৯ হানার পর বিশ্বে ২৪ ঘন্টায় এতো মৃত্যু আর কোনো দেশে হয়নি। মৃত্যুতে ইতালিকে ছাড়িয়ে এখন শীর্ষে যুক্তরাষ্ট্র। ব্রিটিশ সরকার জানিয়েছে, প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসনের শারীরিক অবস্থার দ্রুত উন্নতি হচ্ছে। ভারতে লকডাউনের মেয়াদ আরো দুই সপ্তাহ বাড়িয়েছে সরকার। তবে ইউরোপের কিছু দেশে শিথিল করার খবর পাওয়া গেছে। এরই মধ্যে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানিয়েছে, লকডাউন দ্রুত তুলে নিলে ভবিষ্যতে করোনায় বিপদ বাড়তে পারে। গতকাল বিশ্বে ১৭ লাখ ২২ হাজার ও এক লাখ চার হাজারের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে।
এক দিনে মৃত্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের রেকর্ড
জনস হপকিনস ইউনিভার্সিটি জানিয়েছে, ২৪ ঘন্টায় যুক্তরাষ্ট্রে ২ হাজার ১০৮ জন মানুষের মৃত্যু হয়েছে। এক দিনে মৃত্যু সংখ্যার নিরিখে যা এখনো পর্যন্ত সর্বোচ্চ। গত চার মাসে বিশ্বের আর কোনো দেশে এক দিনে এত সংখ্যক মানুষের প্রাণহানির রেকর্ড নেই। মৃত্যুতে ইতালিকেও ছাড়াল প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের দেশ। জনস হপকিনস ইউনিভার্সিটি জানায়, শনিবার সকাল সাড়ে ১০টা পর্যন্ত ইতালিতে মৃত্যু ছিল ১৮ হাজার ৮৪৯। ওয়ার্ল্ডো মিটার জানায়, শনিবার যুক্তরাষ্ট্রে নতুন করে ১০৩ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। ফলে দেশটিতে মৃত্যু দাঁড়িয়েছে ১৮ হাজার ৮৫০ জনে যা ইতালির চেয়ে একজন বেশি।
একইসঙ্গে পাল্লা দিয়ে আক্রান্তের সংখ্যাও বাড়ছে যুক্তরাষ্ট্রে। সেখানে ৫ লাখ ৫ হাজারের বেশি মানুষ নভেল করোনায় আক্রান্ত। এর মধ্যে নিউ ইয়র্কের পরিস্থিতিই সবচেয়ে সঙ্কটজনক। সেখানে করোনায় আক্রান্ত ১ লাখ ৭২ হাজার ৩৫৮ জন। ইতিমধ্যেই প্রাণ গেছে ৭ হাজার ৮৪৪ জনের। তারপরই রয়েছে নিউ জার্সি। ৫৪ হাজারের বেশি আক্রান্তের মধ্যে ২ হাজারের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে। তবে এরই মধ্যে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেছেন, আমরা প্রথম দিকে এক লাখের বেশি মানুষের মৃত্যুর আশঙ্কা করেছিলাম। কিন্তু আমাদের কঠোর পদক্ষেপে অনেক মানুষের জীবন বেঁচে যাবে।
বরিসের অবস্থার দ্রুত উন্নতি
ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসনের শারীরিক অবস্থার দ্রুত উন্নতি হচ্ছে। শুক্রবার তার অফিস ১০ নং ডাউনিং স্ট্রিট এই তথ্য জানিয়েছে। দেশটির মিডিয়া জানিয়েছে, প্রধানমন্ত্রী বরিস এখন হাঁটতে পারছেন। তিনি চলচ্চিত্র দেখছেন এবং তার অন্ত:স্বত্ত্বা পার্টনারের পাঠানো চিঠিও পড়ছেন। এদিকে দেশটির স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, শনিবার ২৪ ঘন্টায় ৯১৭ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং মৃতের সংখ্যা পৌঁছেছে ৯ হাজার ৮৭৫ জনে।
ভারতে লকডাউন বাড়ছে
ভারতে লকডাউন আরো দুই সপ্তাহ বাড়ছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির কাছে এমন আবেদন জানিয়েছেন বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীরা। সরকারের একটি সূত্র জানিয়েছে, তাদের আবেদনে সাড়া দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী মোদিও। সূত্রের খবর, আপাতত ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত বাড়তে পারে চলতি লকডাউন। তারপর অবস্থা বুঝে ব্যবস্থা। এই মর্মে সরকারি ঘোষণা স্থানীয় শনিবার সন্ধ্যা কিংবা আজ রবিবার সকালে হতে পারে। শনিবার সকাল ১১ টা থেকে প্রায় ৪ ঘণ্টা মুখ্যমন্ত্রীদের সঙ্গে পর্যালোচনা বৈঠক করেছেন প্রধানমন্ত্রী। বৈঠকে পাঞ্জাব, তেলেঙ্গানা, মহারাষ্ট্র ও রাজস্থানসহ প্রায় ১২টি রাজ্য অন্তত আরো দুই সপ্তাহ লকডাউন বাড়ানোর পক্ষে কথা বলেছেন।
লকডাউনের এই পরিবেশে আর্থিক মন্দা ও জীবিকা নির্বাহ একটা অংশের কাছে বড়ো উদ্বেগের কারণ। সেই উদ্বেগ দূর করতে প্রধানমন্ত্রী মোদি মুখ্যমন্ত্রীদের উদ্দেশে বলেন, ‘আমার প্রথম ভাষণে আমি উল্লেখ করেছিলাম আগে জীবনন, তারপর অর্থনীতি। আজ আমি বলছি, জীবন আর জীবিকা দুটোই বাঁচিয়ে চলতে হবে’। কৃষিক্ষেত্রে একাধিক সংস্কার এনে খাদ্য পণ্য উত্পাদনে জোর দিতে মুখ্যমন্ত্রীদের কাছে আবেদন করেছেন প্রধানমন্ত্রী।
লকডাউন নিয়ে সতর্কবার্তা হুর
আগামী সপ্তাহে লকডাউন শিথিল করতে যাচ্ছে অস্ট্রিয়া। ১৫ এপ্রিল থেকে স্কুল ও ডে কেয়ার সেন্টারগুলো খুলে দিতে যাচ্ছে ডেনমার্ক। সামাজিক দূরত্বে আরোপিত বিধিনিষেধ এপ্রিলের ৯ তারিখেই কিছুটা শিথিল করেছে চেক রিপাবলিক। ১৪ তারিখ থেকে ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার পরিকল্পনাও আছে। লকডাউন অব্যাহত থাকলেও ইউরোপের দেশ ইতালি ও স্পেন বেশকিছু পদক্ষেপ শিথিল করেছে। এরই মধ্যে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (হু) জানিয়েছে, সংস্থাটির প্রধান টেড্রোস অ্যাধনম ঘেব্রেইয়েসাস সতর্ক করেছেন, বিশ্বব্যাপী যদি সামাজিক দূরত্বের কড়াকড়ি খুব তাড়াতাড়ি তুলে নেওয়া হয় তাহলে করোনা ভাইরাসের ভয়াবহ বিস্তার ঘটতে পারে। জেনেভায় একটি সম্মেলনে টেড্রোস বলছেন, খুব দ্রুত বিধিনিষেধ প্রত্যাহার করে নেওয়া হলে করোনা ভাইরাস ভয়ঙ্করভাবে ফিরে আসতে পারে।
অন্যান্য দেশের পরিস্থিতি
পরিস্থিতি খানিকটা হলেও নিয়ন্ত্রণে এসেছে ইতালিতে। শুক্রবার পর্যন্ত সেখানে মৃত্যুর সংখ্যা ছিল ১৮ হাজার ৮৪৯ জন। আক্রান্তের সংখ্যা গিয়ে ঠেকেছে ১ লাখ ৪৭ হাজার ৪৭৭ জনে। স্পেনে ১৮ দিনের মধ্যে সবচেয়ে কম মানুষের মৃত্যু হয়েছে। দেশটিতে ২৪ ঘন্টায় ৫১০ জনের প্রাণ গেছে। গত ২৩ মার্চের পর এটাই সর্বনিম্ন। জার্মানিতে প্রাণ হারিয়েছে ২ হাজার ৭৩৬ জন। নোভেল করোনায় আক্রান্ত হয়েছে ১ লাখ ২২ হাজার ৫৩০ জন। তবে করোনার প্রকোপ কাটিয়ে ধীরে ধীরে ছন্দে ফিরছে চীন। শুক্রবার নতুন করে ৪৬ করোনায় আক্রান্ত হয়েছে সেখানে। ২৪ ঘণ্টায় ৩ জন প্রাণ হারিয়েছেন দেশটিতে। তুরস্কে ভাইরাসের বিস্তার ঠেকাতে প্রধান শহরগুলোতে ৪৮ ঘন্টার কারফিউ ঘোষণা করেছে সরকার। সব মিলিয়ে গোটা বিশ্বে ১ লাখ ৪ হাজার ৭৭৫ জন প্রাণ হারিয়েছে এবং আক্রান্ত হয়েছে ১৭ লাখ ২২ হাজার ৩০৬ জন।
