অলক বিশ্বাস
নতুন বছরের শুরু থেকেই করোনা ভাইরাসের ভয়াবহতা মর্মে মর্মে উপলব্ধি করছে বিশ্ববাসী। বিশ্বের প্রায় প্রত্যেকটা দেশই আজ করোনা ভাইরাস নামের মহামারিতে জর্জরিত। করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ প্রতিরোধে বেশির ভাগ দেশই লকডাউন পদ্ধতি অনুসরণ করছে। কলকারখানা, শিল্প প্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে যানবাহন চলাচল সবই একপ্রকার বন্ধ হয়ে যাওয়ায় স্তিমিত হয়ে পড়েছে গোটা বিশ্ব। করোনা ভাইরাসের এমন মহামারির মধ্যে সেরে উঠতে শুরু করেছে পৃথিবীর ‘ক্ষত’। পৃথিবীর বায়ুদূষণ স্মরণকালের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে। বৈশ্বিক উষ্ণতা এ বছর আগের তুলনায় অনেকটা কমে আসবে বলেও আভাস দিয়েছেন বিজ্ঞানীরা। এছাড়া বায়ুদূষণ কমে আসায় প্রকৃতির গাছপালাও আগের চেয়ে বেশি সতেজতা ফিরে পাবে যা ফসল ভালো হওয়ারও ইঙ্গিত দেয়। চীন, ভারত, ইতালি, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, দক্ষিণ কোরিয়ার বাতাস আগের থেকে অনেকটাই বিশুদ্ধ ও পরিচ্ছন্ন হয়েছে। নাসার স্যাটেলাইট এবং ইউরোপিয়ান স্পেস এজেন্সির তোলা গত বছরের ছবির সঙ্গে এ বছরের ছবির তুলনামূলক বিশ্লেষণে সেই চিত্র স্পষ্ট ফুটে উঠেছে।
বৈশ্বিক নাইট্রোজেন ডাই-অক্সাইড, কার্বন ডাই-অক্সাইড, কার্বন মনোক্সাইড হ্রাস পেয়েছে উল্লেখযোগ্যহারে। করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়া বিশ্বের প্রথম দেশ চীন। করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের পর থেকে চীনের অনেক কারখানা ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখা হয়। গাড়ি, পাওয়ার প্ল্যান্ট এবং কলকারখানার ধোঁয়া থেকে সবচেয়ে বেশি নাইট্রোজেন ডাই-অক্সাইড বাতাসে মেশে। করোনা ভাইরাসের কারণে কার্যত অচল উহানের কাছের বাতাসেই প্রথম নাইট্রোজেন ডাই-অক্সাইড হ্রাস পায়। ইউরোপিয়ান স্পেস এজেন্সির সেনিটেল-৫পি স্যাটেলাইটের ছবিতে দেখা যায়—গত বছরের একই সময়ে এশিয়া এবং ইউরোপের আকাশের চেয়ে বর্তমানের আকাশ অনেক বেশি নাইট্রোজেন ডাই-অক্সাইড মুক্ত। করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের কারণে চীনের পরপরই নড়েচড়ে বসে দক্ষিণ কোরিয়া। উত্পাদনমুখী কলকারখানা, শিল্প প্রতিষ্ঠানসহ দেশটিতে থাকা উচ্চমাত্রার পাওয়ার প্ল্যান্টগুলোও বন্ধ করে দেওয়া হয়। বন্ধ করে দেওয়া হয় যানবাহন। অল্প কিছুদিনের মধ্যেই চীনের মতো দূষণ কমতে থাকে দক্ষিণ কোরিয়ারও। ইতালির উত্তরাঞ্চলীয় এলাকায় দূষণের মাত্রাটা বরাবরই একটু বেশি থাকে। বড়ো বড়ো শিল্প কারখানার নির্গত ধোঁয়া পো ভ্যালির শেষ ভাগে আল্পস পর্বতমালায় ধাক্কা খেয়ে এই এলাকার দূষণ বাড়িয়ে দেয় বলে এই অঞ্চলকে ইউরোপের দূষণের ‘হটস্পট’ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। ৯ মার্চ লকডাউন ঘোষণার পর ইতালির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শহর মিলান এবং ইতালির অন্যান্য উত্তরাঞ্চলীয় শহরের বায়ুদূষণ ৪০ শতাংশ পর্যন্ত হ্রাস পেয়েছে যা কিনা দেশটির পরিবেশবিদদের কাছেও রীতিমতো বিস্ময়ের। ইতালির মতোই যুক্তরাজ্যের দূষণও অনেকাংশে কমে এসেছে। করোনা ভাইরাসের কারণে পৃথিবীর পরিবেশ শুদ্ধ হওয়ায় এখন ভারতের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে দেখা মিলছে হিমালয়ের। মার্চের ২৪ তারিখ থেকে লকডাউন ঘোষণা করায় এরই মধ্যে দেশটির বেশির ভাগ অঞ্চলে দূষণের মাত্রা ব্যাপকভাবে হ্রাস পেয়েছে। ফলে হিমালয় থেকে প্রায় ২০০ কিলোমিটার দূরে পাঞ্জাবের একটি জেলা থেকে স্থানীয়রা তুষারআবৃত পাহাড়ের মনোমুগ্ধকর ছবি তুলছেন। করোনা ভাইরাসে কারণে সারা বিশ্ব স্থবির হয়ে পড়ার কারণেই মূলত এটি সম্ভব হয়েছে।
পরিবেশ বিজ্ঞানীদের মতে, করোনা ভাইরাসের কারণে মাত্র কয়েক মাসের ব্যবধানেই পৃথিবীর দূষণ অনেকটাই কমে এসেছে। পৃথিবীর পরিবেশকে এই অবস্থায় আনাটা মানুষের পক্ষে শুধু কঠিনই নয় এক প্রকার অসম্ভব ছিল। প্রকৃতি আজ নিজেই নিজের ক্ষত সারিয়ে তুলছে। মহামারি করোনা ভাইরাস আমাদের দেখিয়ে দিয়েছে মানব সভ্যতার এতো অগ্রগতির পরও মানুষ কতটা অসহায়। প্রকৃতির বিপক্ষে মানুষের যাচ্ছেতাই আচরণই আজ তাদের এ অবস্থার সৃষ্টি করেছে। তাই সময় এসেছে প্রকৃতির কাছে ফিরে ভুল স্বীকারের।
