করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাবে ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য বরাদ্দকৃত ত্রাণ কিছুসংখ্যক অসত্ জনপ্রতিনিধির দ্বারা তছরুপের যেসব ঘটনা ঘটছে, তার বিরুদ্ধে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি আবারও পরিষ্কার করে দিয়েছেন, দেশের জাতীয় দুর্যোগে যারা গরিব মানুষের জন্য বরাদ্দ করা ত্রাণ চুরি করছে, তারা সেগুলো হজম করতে পারবে না, তাদের ব্যক্তি বা দলীয় পরিচয় যা-ই হোক না কেন। প্রয়োজন হলে এসব অসত্ লোকের মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে তাত্ক্ষণিক বিচার করে সাজা দেয়া হবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
এছাড়া কোভিড-১৯-এর সম্ভাব্য ক্ষতিকর প্রভাব কাটিয়ে ফসলের উত্পাদন বৃদ্ধিতে আগামী বাজেটে সাড়ে ৯ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি ঘোষণার পাশাপাশি কৃষি খাতের জন্য ৫ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছেন প্রধানমন্ত্রী।
গতকাল রবিবার সকালে গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে বরিশাল ও খুলনা বিভাগের ১৬টি জেলার স্থানীয় প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি, সশস্ত্র বাহিনীর সদস্য, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য, সিভিল সার্জন ও স্বাস্থ্যকর্মীদের সঙ্গে সর্বশেষ করোনা ভাইরাস পরিস্থিতি নিয়ে মতবিনিময়কালে প্রধানমন্ত্রী এ প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করে বলেন, ‘আমরা ক্ষুদ্র ও মাঝারি কৃষকদের খাদ্য উত্পাদন বাড়াতে সহায়তার জন্য সর্বাধিক ৫ শতাংশ সুদে ৫ হাজার কোটি টাকার একটি নতুন প্রকল্প গ্রহণ করতে যাচ্ছি।’
কৃষকদের বিশেষ প্রণোদনা দেওয়া হবে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘কৃষি খাতে চলতি মূলধন সরবরাহে বাংলাদেশ ব্যাংক ৫ হাজার কোটি টাকার নতুন একটি পুনঃঅর্থায়ন স্কিম গঠন করবে। এখান থেকে শুধু কৃষি খাতে গ্রাহক পর্যায়ে ঋণ দেওয়া হবে, যার সর্বোচ্চ সুদহার হবে ৫ শতাংশ।’ তিনি বলেন, ‘এই তহবিল থেকে গ্রাম অঞ্চলে যারা ক্ষুদ্র ও মাঝারি চাষি তাদের জন্য ঋণ দেওয়া হবে। কৃষি, ফুল, ফল, মত্স্য, পোলট্রি, ডেইরি ফার্ম ইত্যাদি কর্মকাণ্ডে এখান থেকে সহায়তা পাবেন।’ শেখ হাসিনা বলেন, ‘কোনো মানুষ যেন কষ্ট না পায়, সেদিকে লক্ষ রেখেই ৫ হাজার কোটি টাকা প্রণোদনা ঘোষণা করছি। কৃষি মানে গ্রাম অঞ্চলের ক্ষুদ্র ও মাঝারি চাষি। কারণ আমাদের দেশের কৃষক-শ্রমিক-দিনমজুর থেকে শুরু করে কামার-কুমার-তাঁতি-জেলে সবার জন্য সাহায্য করতে আমরা প্রস্তুত।’ তিনি বলেন, পাশাপাশি সারের ভর্তুকি হিসেবে আগামী অর্থবছরের বাজেটে ৯ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হবে, যাতে কৃষকের উত্পাদন ব্যাহত না হয়। তিনি বলেন, ইতিমধ্যে শিল্প খাতের জন্য ৭২ হাজার কোটি টাকার বেশি কয়েকটা প্রণোদনা ঘোষণা করা হয়েছে। কৃষিক্ষেত্রে বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কিছুদিনের মধ্যে বোরো ফসল উঠবে। কৃষক যেন সঠিক মূল্য পায়, বিষয়টি লক্ষ রেখে খাদ্য মন্ত্রণালয় গত বছরের তুলনায় এ বছর বেশি ধান-চাল ক্রয় করবে। অর্থাত্, ২ লাখ মেট্রিক টন চাল বেশি ক্রয় করবে, সেই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। শেখ হাসিনা বলেন, “ধান কাটা ও মাড়াই যান্ত্রিকীকরণের জন্য ইতিমধ্যে কৃষি মন্ত্রণালয়কে ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। আরো ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হবে। এছাড়া বীজ ও চারা রোপণের জন্য আরো ‘১৫০’ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হবে।” তিনি বলেন, কেউ পেঁয়াজ, রসুন, আদাসহ মসলাজাতীয় কিছু উত্পাদন করলে মাত্র ৪ শতাংশ সুদে ঋণ দেওয়ার আরেকটি উদ্যোগ বর্তমানে চলমান রয়েছে। এই উদ্যোগ অব্যাহত থাকবে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘করোনা ভাইরাসের ক্ষতি মোকাবিলায় বেশ কিছু প্রণোদনা দিয়েছি। শিল্প, কৃষি সব ক্ষেত্রে ব্যাপকভাবে প্রণোদনা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। করোনার কারণে অনেক উন্নয়নকাজ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, কিন্তু এখন সবচেয়ে বড়ো কথা মানুষ বাঁচানো। মানুষের জীবনযাত্রা যেন অব্যাহত থাকে সেদিকে বিশেষভাবে দৃষ্টি দেওয়া। করোনা ভাইরাসের প্রকোপে বিশ্বব্যাপী খাদ্যের মারাত্মক সংকট দেখা দেওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা যদি নিজেরা উত্পাদন ঠিক রাখি, তাহলে এই সংকট মোকাবিলা করতে পারব। এজন্য আমাদের উত্পাদন বাড়াতে হবে, যাতে আমার দেশের মানুষ কষ্ট না পায়। পাশাপাশি আমরা অনেক দেশকে সহযোগিতা করতে পারি, রপ্তানি করতে পারি, সে বিষয়টা মাথায় রেখেই আপনারা উত্পাদন বাড়াবেন।’ প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘কারো এতটুকু জমিও যেন অনাবাদি না থাকে। আপনারা বাড়ির পাশে এবং ছাদে টবের মধ্যেও গাছ লাগান। যেটাই উত্পাদন করবেন সেটাই কাজে লাগবে।’
প্রধানমন্ত্রী পুনরায় এবারের নববর্ষ ঘরে অবস্থান করে এবং বাইরে কোনো জনসমাগম না করে পালনের আহ্বান জানান। নববর্ষের সব সরকারি অনুষ্ঠান বাতিল করার কথা পুনরায় উল্লেখ করে সবাইকে ঘরে থাকার আহ্বান জানান।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, দুর্যোগ আসে, সেই দুর্যোগ সাহসের সঙ্গে মোকাবিলা করতে হয়। যারা মৃত্যুবরণ করছেন তাদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করে এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি সমবেদনা জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আপনারা সবাই নিজেরা সুরক্ষিত থাকেন, ভালো থাকেন, সুস্থ থাকেন সেভাবেই নিজেদেরকে নিজেরা সুরক্ষিত করেন। তিনি বলেন, ‘যে নির্দেশগুলো আমরা দিয়েছি বা স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে দেওয়া হচ্ছে বা প্রতিনিয়ত রেডিও, টিভি, গণমাধ্যমসহ সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে প্রচার করা হচ্ছে দয়া করে সেগুলো একটু মেনে চলুন। এটা মেনে চললে নিজে যেমন ভালো থাকবেন তেমনি অন্যকেও আপনি সুরক্ষিত করবেন।’ তিনি বলেন, ‘নিজের জন্য নিজের ওপরে যেমন আপনার দায়িত্ব আছে তেমনি অন্যের ওপরেও রয়েছে। সে কথাটা সবাইকে মনে রাখতে হবে।’ আর যারা হাত পাততে পারে না তাদের সবার ঘরে খাদ্য পৌঁছে দেওয়ার আহ্বানও পুনর্ব্যক্ত করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘কাজ না থাকায় অনেকে কাজ করতে পারছেন না আবার রিলিফও চাইতে পারছেন না, এরকম বহু পরিবার রয়েছে। তাদেরকে খাবার পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা আমরা ইতিমধ্যে নিয়েছি। সেটা সংশ্লিষ্টদের নিশ্চিত করতে হবে।’ আমাদের খাদ্যের কোনো অভাব নেই। বরং যথেষ্ট খাদ্যসামগ্রী রয়েছে। সেটা আমরা প্রয়োজন অনুসারে দিতে পারব।
বাজারজাত করার সময়ও সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার ওপর গুরুত্বারোপ করে প্রধানমন্ত্রী পরামর্শ দেন যে, হাটবাজার একেবারে বন্ধ না রেখে বড়ো একটি মাঠে সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে সপ্তাহে এক দিন হলেও এগুলো বিক্রির উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। তিনি বলেন, সেখান থেকে মানুষ পণ্য কিনে নেবে, কিন্তু অনেক মানুষের ভিড় যেন না হয়—সেদিকে সবার লক্ষ রাখবেন। তিনি বলেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, স্থানীয় প্রশাসন এবং স্বাস্থ্যকর্মীরা মিলিতভাবে এবং পরিকল্পনা করে যদি এ ধরনের উদ্যোগ নেন তাহলে মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হবে না। তিনি এ সময় সাতক্ষীরার সঙ্গে মতবিনিময়কালে দুধের মূল্য নিশ্চিত করতে এটি রিলিফে দেওয়ার উদ্যোগ গ্রহণে এবং দুগ্ধজাত সামগ্রী প্রস্তুত করে এই দুধকে কাজে লাগানোর উদ্যোগ গ্রহণেও আহ্বান জানান। ধান কাটার মৌসুম শুরু হয়ে যাওয়ায় এবং অনেকেরই হাতে কাজ না থাকায় দিনমজুর শ্রেণির লোকজন ধান কাটায় সম্পৃক্ত হতে পারেন এবং সেই সুযোগ তার সরকার করে দেবে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
ভিডিও কনফারেন্সে ঝালকাঠি জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে উপস্থিত একজন ইমাম জানান, তারা নির্দেশনা অনুযায়ী জুমার নামাজ দশ জনে পড়েছেন এবং ওয়াক্তর নামাজে পাঁচ জনের বেশি উপস্থিতি রাখছেন না। এ বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আসলে সবাইকে দোয়া করতে হবে। যেন এ করোনা ভাইরাস থেকে আমরা রক্ষা পাই। আপনারা জানেন, সৌদি আরবে মক্কা এবং মদিনাতেও কারফিউ দিয়ে দেয়া হয়েছে।’ শেখ হাসিনা বলেন, ‘ঘরে বসে দোয়া করলে আল্লাহ সে দোয়া কবুল করবেন।’
করোনা ভাইরাসের কারণে যারা মারা গেছেন তাদের প্রতি প্রধানমন্ত্রী সমবেদনা জানান। শেখ হাসিনা বলেন, আমরা সারাদেশে এ ভাইরাস মোকাবিলায় বেশ কয়েকটি পদক্ষেপ নিয়েছি। এ ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু খুব কম থাকলেও এটা মানুষকে ভোগায় বেশি। তিনি বলেন, এ ভাইরাস থেকে বাঁচার জন্য সব কর্মসূচি বন্ধ করে দিয়েছি। সবাই ঘরে থাকুন। বাইরে যাওয়ার প্রয়োজন নেই। তিনি এ সময় সর্দি-কাশি হলে সবাইকে প্রচুর গরম পানি খাওয়ার এবং ঘরে থাকারও পরামর্শ দেন। শেখ হাসিনা বলেন, হাসপাতালগুলোতে আইসোলেশন খোলা হয়েছে। করোনা রোগীর জন্য হাসপাতালে আলাদা ওয়ার্ড করে দিয়েছি। সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমাদের সংবাদমাধ্যম অত্যন্ত ঝুঁকি নিয়ে সচেতনতামূলক জিনিস প্রচার করছে।’ শেখ হাসিনা বলেন, ‘আগামী ১৭ এপ্রিল মুজিবনগর দিবস, সবসময় আমরা এটি উদ্যাপন করি। এবার তো আমরা সেভাবে জনসমাগম করতে পারব না। যেটুকু সীমিত আকারে ঘরে বসে করা যায়, সেটুকু করবেন, জনসমাগম যেন না হয়। তিনি বলেন, ইনশাল্লাহ, এ অবস্থা চলে গেলে আমরা ভালোভাবে করতে পারব। কারণ, স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সরকার প্রথম শপথ নিয়েছিল এই মেহেরপুরে—এ কথা আমাদের সবসময় স্মরণ রাখতে হবে।’ তিনি বর্ডার গার্ড বাংলাদেশকে এ সময় সীমান্তে কড়াকড়ি আরোপের এবং বাংলাদেশে যেন কেউ ঢুকতে না পারে, তা নিশ্চিত করার নির্দেশ দেন এবং কেউ ঢুকে পড়লে তাকে সেখানেই কোয়ারেন্টাইনে রাখার ব্যবস্থা গ্রহণেও নির্দেশ প্রদান করেন।
প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব ড. আহমদ কায়কাউস ভিডিও কনফারেন্সটি সঞ্চালনা করেন। মন্ত্রিপরিষদ সচিব খন্দকার আনোয়ারুল ইসলাম, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সচিব মো. তোফাজ্জেল হোসেন মিয়া, প্রেস সচিব ইহসানুল করিম এবং প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য চিকিত্সক অধ্যাপক ডা. এ বি এম আব্দুল্লাহ ভিডিও কনফারেন্সে উপস্থিত ছিলেন।
