আরশিনগর g বাহার উদ্দিন
লকডাউন বজায় রাখতে, তিলে তিলে তার পরিধি বাড়িয়ে তুলতে বঙ্গীয় সমতটের মানুষ যে ইতিহাস রচনা করেছে তা ভবিষ্যতের সুদূর ও অদূর অপ্রত্যাশিত হামলা রুখতে জাতির ও আত্মশক্তির ভরসা হয়ে থাকবে
অভূতপূর্ব। অনুকরণযোগ্য। গায়ে তাঁর অভ্যস্ত সাদা শাড়ি, পায়ে সেকেলে চপ্পল, বাড়ির বাইরে মুখমণ্ডলে আত্মরক্ষার মাস্ক, হাতে গ্লাভস। কখনো ছুটছেন, কখনো নবান্নের অফিসে কিংবা অন্যত্র প্রেস ব্রিফিংয়ের মুহূর্তে সামাজিক দূরত্ব রেখে বাংলার মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সুকৌশল, সুদূঢ় আর সহমর্মী সজল উচ্চারণ জনমুখী নেতৃত্বের দায়বদ্ধতার ইতিহাসে অদ্বিতীয় নজির হয়ে থাকবে। আমাদের এই অভিব্যক্তি তোয়াজ নয়। প্রশস্তিও নয়। সমাজপাঠের একজন নগণ্য চঞ্চল পড়ুয়া আমি। পেশাগত ছোটাছুটির বাইরেও, ঢেকে রাখা আরেকটি জগত্ আছে, যা অত্যন্ত ব্যক্তিগত। তার নিরিখ এই, অভিজ্ঞতার ভিত্তিতেই বলতে হচ্ছে, না বলাটা পাপ হবে।
সংকট যখন আসে, সমাজকে মাত্রাহীন ভয় দেখায়, প্রতিমুহূর্তে গুজব আর আতঙ্ক তৈরি করে, বিভ্রান্তির তথ্য সাজিয়ে মৃত্যু লাফাতে থাকে, তখন বিবেক ও যুক্তিতাড়িত নেতৃত্ব ঘরে বসে থাকে না। কেবল বাণী ছড়ায় না। সমাজকে অভয় দেয়, সতর্ক করে। আত্মসর্বস্বতার সব বন্ধন খুলে দিয়ে প্রবলতর যুদ্ধের জন্য নিজে তৈরি হয়, অন্যকেও প্রস্তুত থাকার পরামর্শ দেয়।
চীনে, ইউরোপে, আমেরিকায় ও উপসাগরীয় ইরানে করোনার অতিমারি ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোর সীমাবদ্ধতা মেনে এবং জেনে কী করলেন মমতা?
সমস্ত প্রশাসনকে সক্রিয় করে দিলেন। নিজেও যুদ্ধকালীন তত্পরতায় ঝাঁপিয়ে পড়লেন, ছুটতে থাকলেন। রাজ্যের নানা প্রান্তে। মন্ত্রিসভার সদস্য, সাংসদ, বিধায়কদের বলে দিলেন, এ এক কঠিন লড়াই। করোনাকে স্তব্ধ-জব্দ করতে হবে। বাংলা কখনো হার মানেনি। মানবে না। পুলিশের, জনপ্রতিনিধিদের কণ্ঠেও তুলে দিলেন ঐক্য আর প্রতিরোধের গান। অভ্যন্তরীণ রেল ও দেশি-বিদেশি উড়ান বন্ধ করে দেবার আর্জি জানালেন কেন্দ্রকে। কেউ কেউ নয়, অনেকেই তার পরামর্শে কান দেননি।
এরকম পরিস্থিতিতেই বাংলা তার স্বাভাবিক দ্রোহ আর সংযম দিয়ে সংক্রমণ রোখার চেষ্টা করল, যা মহারাষ্ট্র পারেনি। গুজরাট পারেনি। তামিলনাড়ু পারেনি। পারেনি তেলেঙ্গানা, দিল্লি, উত্তর প্রদেশ, রাজস্থান, বিহার। এর পরিণতি কী দাঁড়াল—মহারাষ্ট্রে আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। দেশ জুড়ে সংক্রমিত ৫ হাজার ৭০৯। মৃত ১৯৯। আশার কথা মৃতের চেয়ে সুস্থ হয়ে বাড়িফেরতের সংখ্যা অধিকতর, ৫০৩। তুলনামূলকভাবে বাংলার পরিসংখ্যানটি কী? কোভিড-১৯ পজিটিভ রোগীর সংখ্যা ৭৫। মৃত পাঁচ। নমুনা পরীক্ষার আওতায় এসেছেন ১ হাজার ৮৮৬। হাসপাতালে আইসোলেশনে রয়েছেন ৪ হাজার ৪১৭। ছাড়া পেয়ে বাড়ি ফিরে গেছেন ৫ হাজার ১৮৮। গৃহপর্যবেক্ষণে ৪৫ হাজার ৮৫৮। ছাড়া পেয়েছেন ৯ হাজার ৩৯৬।
মৃত পাঁচ আর বীজাণুসংক্রমিতের সংখ্যা ৭৫—আশাপ্রদ হলেও স্বস্তিকর নয়। আমরা কেউই দ্বীপ নই। যে কোনো মৃত্যু দুঃখকে ভারী করে তোলে, জীবজগত্ আর ভূপ্রকৃতির বেঁচে থাকার মরণপণ যুদ্ধ আর দুঃসাহসের শাশ্বত সত্যটি স্মরণ করিয়ে দেয় যোগ্য নেতৃত্ব কখনো প্রকারান্তরে কখনো সরাসরি। তা হচ্ছে এই যে, যে সেনাপতি, যে সেনারা দুর্বোধ্য আগ্রাসনের মোকাবিলায় রণক্ষেত্রে, মাঠে ময়দানে, অহর্নিশ লড়াইয়ের সঙ্গী, তারা গুজবকে, ভয়কে, মৃত্যুর নগ্নতাকে আমল দেন না, জয়ই তাদের চূড়ান্ত লক্ষ্য হয়ে ওঠে। এরকম লক্ষ্যজয়ে বাংলার মমতার, বাংলার গঠনশীল নেত্রীর এবং তার সহযোদ্ধা ফিরহাদ হাকিম, রাজীব বন্দ্যোপাধ্যায়, স্বরাষ্ট্রসচিব আলাপন বন্দ্যোপাধ্যায়, স্বাস্থ্যসচিবসহ রাজনীতি ও প্রশাসনের সব স্তরের প্রতিনিধিদের মুখাবয়বের দৃঢ়তা ও অঙ্গীকার চলমান ইতিহাস কি এড়িয়ে যাবে? এড়িয়ে যাবে জনশক্তি? মনে হয় না। লকডাউন বজায় রাখতে, তিলে তিলে তার পরিধি বাড়িয়ে তুলতে বঙ্গীয় সমতটের মানুষ যে ইতিহাস রচনা করেছে তা ভবিষ্যতের সুদূর ও অদূর অপ্রত্যাশিত হামলা রুখতে জাতির ও আত্মশক্তির ভরসা হয়ে থাকবে।
সেমিটিক পুরাণে উল্লিখিত মহাপ্লাবনে জলস্থলের সীমা যখন মুছে গেল, জলমগ্ন সব সৃষ্টি, তখন ছোটো ডিঙি নিয়ে একা জেগে রইলেন ইহুদি পয়গম্বর নোয়াহ। তার প্রজ্ঞা, তার স্থিরতা, তার বেঁচে থাকার অনিঃশেষ আশার ওপর ভর করে আবার সচল হয়ে ওঠে জগত্প্রাণ। নোয়াহ মৃত্যুহীন। ক্লান্তিহীন। পুরাণের বানিয়ে বলা সত্যের মৃত্যু নেই। সমাপ্তি নেই। এই ধ্রুব সত্যকে আরো বড়ো, আরো উঁচু করেছে সংকটাপন্ন মানুষের ঐক্য আর তার সতর্ক উদ্যাপন। বাংলাও কঠিন যাপনের অনর্গল সঙ্গী। অভিনন্দন তার নেতৃত্বকে, শুভেচ্ছা তার চিরজয়ী জনসত্তাকে।
ব্রিটিশ কবি জন ডন বলেছিলেন, নো ম্যান ইজ অ্যান আইল্যান্ড। প্রতিটি মৃত্যুই আমাকে ভাবিয়ে তোলে। যুদ্ধের বিরুদ্ধে, হত্যার বিরুদ্ধে, ধ্বংসের বিরুদ্ধে ঐক্যের জাগৃতি উদ্বুদ্ধ করে তুলেছিল জনকে। ঐ মহালগ্ন এসেছে আবার। যে কোনো বিপর্যয়ে মানুষ এক হয়ে যায়। বিচ্ছিন্নতা আর মৃত্যুর মৃত্যুকে অবশ্যম্ভাবী করে তোলে। করোনাতাড়িত বিশ্বও আগের ঐ চিরসত্যের চাঞ্চল্যকে জাগিয়ে তুলেছে। এও আরেক মহাজয়ের পূর্বক্ষণ। মানুষ বাঁচবে। জাগবে। মৃত্যুকে পায়ের তলায় পিষ্ট করে বেঁচে থাকার গান গাইবে। সৃষ্টি, জীবজগত্, বিশেষ করে মানুষের এটাই নির্ণীত, নির্মীয়মাণ ইতিহাস। এখানেই তার দর্শন আর বিজ্ঞানের সাধনার সাফল্য। এখানেই সে চিরঞ্জীবী। অক্ষত, অব্যয়। করোনা তার কাছে তুচ্ছ, তুচ্ছ মৃত্যু। সতর্কতা আর রণকৌশল তার আশু বিজয়ের সঙ্গী।
n লেখক ভারতীয় সাংবাদিক, সম্পাদক আরম্ভ পত্রিকা
mail id: bahar.uddin.editor¦gmail.com
