করোনার বিরুদ্ধে প্রধান যোদ্ধা চিকিত্সক-নার্স

আপডেট : ১৩ এপ্রিল ২০২০, ২২:১৪

স্বাস্থ্যসংশ্লিষ্টদের সুরক্ষা নিশ্চিতের দাবি

আসিফুর রহমান সাগর

জীবনবাজি রেখে চিকিত্সক ও নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীরা করোনা ভাইরাসের বিরুদ্ধে মরণপণ লড়াইয়ে নিয়োজিত। তারাই এই ভয়ংকর সংক্রামক ভাইরাসের বিরুদ্ধে জয়ী হওয়ার পথে প্রধান যোদ্ধা। এ প্রসঙ্গে বর্ষীয়ান চিকিত্সকরা বলছেন, ‘আমাদের মনে রাখতে হবে ডেঙ্গুর বিরুদ্ধে এই চিকিত্সকরাই জয়ী হয়েছিলেন। সেটাও অনেক বড়ো লড়াই ছিল। তাই চিকিত্সকদের প্রতি মানবিক ও তাদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা জরুরি। যারা সেবা দিচ্ছেন তাদের স্বাস্থ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে সবার আগে।’

করোনা ভাইরাস গোটা বিশ্বকে অচল করে দিয়েছে। নতুন আক্রান্ত রোগী ও মৃতের সংখ্যা বাড়ছেই। করোনার সঙ্গে জীবন-মৃত্যুর লড়াই চলছে। এ লড়াইয়ে নেতৃত্ব দিচ্ছেন সারা বিশ্বের চিকিত্সক, নার্সসহ স্বাস্থ্যসেবাকর্মীরা। তারাই করোনা ভাইরাসকে চ্যালেঞ্জ করেছেন। মৃত্যুভয়কে তুচ্ছ করে চিকিত্সকরা করোনা আক্রান্ত রোগীর চিকিত্সা করছেন। লাখ লাখ রোগীর চাপ সামলাতে সন্তান, পরিবার-পরিজন থেকে দূরে থাকতে হচ্ছে। বিশ্ব জুড়েই চিকিত্সকদের জন্য মিলছে না পর্যাপ্ত সুরক্ষা পোশাক। ওষুধ ও চিকিত্সা সরঞ্জামও অপ্রতুল। এত প্রতিকূলতা নিয়ে করোনাযুদ্ধে থাকা চিকিত্সকরাও আক্রান্ত হচ্ছেন, প্রাণ হারাচ্ছেন।

বাংলাদেশে করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ শুরুর পর থেকেই দেশের চিকিত্সকরা এর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নিয়োজিত রয়েছেন। এ অবস্থায় চিকিত্সকদের সুরক্ষা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করাটা সবচেয়ে জরুরি। কারণ করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত রোগীদের চিকিত্সা দিতে গিয়ে বেশ কয়েক জন চিকিত্সক ও নার্স করোনা ভাইরাসের সংক্রমণের শিকার হয়েছেন। তাই করোনা মোকাবিলায় সত্যিকারের নায়ক চিকিত্সকরাই।

অনেক চিকিত্সক ও নার্স চিকিত্সাসেবা অব্যাহত রাখলেও তাদের ব্যক্তি ও পারিবারিক জীবনে এর অনেক বড়ো প্রভাব পড়ছে। এমনকি ঘরে ফিরেও নিজেকে পরিবার থেকে আলাদা থাকতে হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে চিকিত্সকদের বিভিন্ন পোস্ট মানুষের মনে তাদের জন্য দুঃখময় অনুভূতি ছড়িয়ে চলেছে। এ অবস্থায় সম্প্রতি করোনা ভাইরাসে আক্রান্তদের চিকিত্সায় হাসপাতাল-চিকিত্সাকেন্দে  নিয়োজিত চিকিত্সক, নার্স, স্বাস্থ্যকর্মীসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের করোনা যোদ্ধা হিসেবে জাতীয় বীরের মর্যাদা দিতে কেন নির্দেশ দেওয়া হবে না, তা জানতে চেয়ে রুল দিয়েছেন হাইকোর্ট। সম্প্রতি, বিচারপতি মো. আশরাফুল কামাল ও বিচারপতি সরদার মো. রাশেদ জাহাঙ্গীরের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ স্বতঃপ্রণোদিত এ রুল দেন।

এদিকে, গত শনিবার করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত রোগীদের চিকিত্সা দিতে অপারগতা প্রকাশ করায় কুয়েত বাংলাদেশ মৈত্রী সরকারি হাসপাতালের দুই চিকিত্সক ও হাসপাতালে অনুপস্থিত থাকার কারণে চার চিকিত্সককে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে।

এ প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত চিকিত্সক ডা. এ বি এম আবদুল্লাহ ইত্তেফাককে বলেন, এ পরিস্থিতিতে ডাক্তার, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রতি সদয় হতে হবে। এদের বরখাস্ত করা কোনো সমাধান নয়। চিকিত্সকদের ভয় দেখানোও কোনো সমাধানের পথ নয়। স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রতি কঠোর না হয়ে তাদের প্রতি মানবিক হয়ে তাদের সুরক্ষা নিশ্চিত করার প্রতি মনোযোগ দিতে হবে।

তিনি বলেন, এই প্রতিকূল পরিস্থিতিতে চিকিত্সকদের আস্থায় নিয়ে আমাদের এই ভয়ংকর ছোঁয়াচে ভাইরাসের বিপক্ষে লড়াই করতে হবে। আমাদের বুঝে দেখতে হবে, চিকিত্সকদের মধ্যে কারো কারো মনের জোর কম থাকতে পারে। তাদের মোটিভেশন করতে হবে। তাদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। তারা যেন আশ্বস্ত হয় যে, এই ডিউটি করতে এসে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা কম, যদি আক্রান্ত হয়ে যায় তাহলে তাদের সুচিকিত্সা নিশ্চিত করা হয়েছে। সম্ভব হলে তাদের জন্য আপত্কালীন সময়ে আলাদা বাসস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে। কারণ, চিকিত্সকরা চিকিত্সা দিতে ভয় পাওয়ার চেয়ে তাদের সন্তান ও পরিবারের কথা ভেবেও অনেকে পিছিয়ে যাচ্ছে।

ডা. আবদুল্লাহ আরো বলেন, এ রোগ যদি আরো ছড়ায় তাহলে মানুষ যেখানেই চিকিত্সক এবং স্বাস্থ্যকর্মী পাবে সেখানেই ছুটবে। তাই, অবিলম্বে এই চিকিত্সকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা জরুরি। চিকিত্সকদের জন্য পিপিই ও নিরাপদ মাস্ক সরবরাহ করতে হবে। এর সঙ্গে প্রয়োজন তাদের স্বাস্থ্যসম্মত বাসস্থানের ব্যবস্থা করা। যেহেতু চিকিত্সকরা করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত রোগীদের চিকিত্সা করছেন কিংবা হাসপাতালে কর্তব্যরত অবস্থায় তারা যে কোনোভাবেই এই ভাইরাসের সংক্রমণের শিকার হতে পারেন। তাই এই চিকিত্সকদের পরিবার থেকে আলাদা করে ভালো বাসস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে। বিশ্বের উন্নত দেশগুলো বড়ো বড়ো হোটেলগুলো চিকিত্সকদের বাসস্থান হিসেবে ব্যবহার শুরু করেছে। আমাদেরও সংক্রমণ ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ার আগেই চিকিত্সকদের সুস্থতা নিশ্চিত করতে নজর দেওয়ার সময় এসেছে।