যাহারা অন্তত নিম্ন মাধ্যমিক পর্যন্ত পড়ালেখা করিয়াছেন, তাহারা একটি ভাব-সম্প্রসারণের সহিত নিশ্চিতভাবেই পরিচিত। তাহা হইল—‘অন্যায় যে করে আর অন্যায় যে সহে, তব ঘৃণা যেন তারে তৃণসম দহে’। কথাটি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলিয়াছেন। তিনি দ্ব্যর্থহীনভাবে বলিয়া গিয়াছেন, অন্যায়কারী এবং অন্যায় সহ্যকারী সমান অপরাধী। এই কথাটি আমরা সকলেই স্কুলের পাঠ্যপুস্তকের মাধ্যমে নিয়মিত আওড়াইলেও বহুক্ষেত্রে এমন মণিমুক্তাতুল্য প্রবাদটি যেন উলুবনে ছড়ানো হইয়াছে। কথায় বলে, চোরে না শোনে ধর্মের কাহিনি। সেই কারণে করোনার এই অভাবিত মহাদুর্যোগকালেও এখন যেই শব্দদ্বয় বাংলাদেশ জুড়িয়া ধ্বনি-প্রতিধ্বনিত হইতেছে, তাহা হইল—‘চাল চোর’।
বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম হইতে প্রকাশিত সংবাদে জানা গিয়াছে, করোনার কারণে দেশের ১৪ শতাংশ মানুষের ঘরে এখন কোনো খাবার নাই। ২৯ শতাংশের ঘরে আছে এক হইতে তিন দিনের খাবার। চরম দারিদ্র্যের হার আগের তুলনায় ৬০ শতাংশ বৃদ্ধি পাইয়াছে। চার দিন পূর্বে প্রকাশিত এই জরিপে বলা হইয়াছে, সরকারি ছুটি বা সামাজিক দূরত্বের কারণে ৭২ শতাংশ মানুষ কাজ হারাইয়াছেন অথবা তাহাদের কাজ কমিয়া গিয়াছে। ৮ শতাংশ মানুষের কাজ থাকিলেও এখনো বেতন পান নাই। এই পরিস্থিতিতে দেশে তিন ধরনের খাদ্যসহায়তা চালু করিয়াছেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী। সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতায় ভিজিএফ-ভিজিডি, ওএমএস, ১০ টাকায় চাল এবং হতদরিদ্র মানুষের জন্য ত্রাণসহায়তা। জানা গিয়াছে, এই তিনটি ক্ষেত্রেই অনিয়ম আর চুরির অভিযোগে এখন দেশ সয়লাব। এই সকল প্রকল্পের চাল ও ত্রাণ নানাভাবে চুরি করা হইতেছে বিচিত্র উপায়ে। ওজনে কম দেওয়া, তালিকা অনুযায়ী না দিয়া বিক্রি করিয়া দেওয়া, গায়েবি লোকজনের নামে বরাদ্দ দেওয়া, স্বজনপ্রীতির মাধ্যমে বরাদ্দ দিয়া সেইখান হইতে একটি অংশ নেওয়া ইত্যাদি ইত্যাদি। দেখা যাইতেছে, করোনার জন্য যেই মানবিক সহায়তা দেওয়া হইতেছে, সেইখানে চুরির সুযোগ সবচাইতে বেশি। কারণ ইহা আকস্মিক এবং সরকার এখনো সুনির্দিষ্ট কোনো ক্যাটাগরি করিয়া দেয় নাই। চুরি কী পরিমাণ হইয়াছে, সেই তথ্য যে কাহারো মন বিষাইয়া দিতে পারে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী গত দুই সপ্তাহে দেশের বিভিন্ন গরিব মানুষের জন্য সরকারের বরাদ্দের চুরি হওয়া ২ হাজার ১৭৪ বস্তা চাল উদ্ধার করিয়াছে। চুরি যাওয়া আরো ৫৫০ বস্তা চালের কোনো খোঁজ এখনো করিতে পারে নাই তাহারা। এই প্রকারের চুরির ঘটনায় বিভিন্ন নেতা ও চেয়ারম্যান, মেম্বারসহ ২৮ জনকে গ্রেফতার করা হইয়াছে। প্রধানমন্ত্রী ইতোমধ্যেই ত্রাণ চুরির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের কথা বলিয়াছেন। চাল চুরি রোধে মাঠে নামিয়াছে মোবাইল কোর্ট, পুলিশ ও র্যাব।
কিন্তু আমাদের প্রশ্ন অন্যায় সহ্যকারীদের বিরুদ্ধে। যাহারা দেখিতেছেন তাহাদের চোখের সামনে চাল চুরির ঘটনা ঘটিতেছে, তাহারা কেন নীরব থাকিতেছেন? কীসের জন্য নীরব থাকিতেছেন? তাহারাও কি এক অর্থে অপরাধী নহেন? সকলেই স্ব স্ব দায়িত্ব পালন করিলে চোরদের সাধ্য নাই চুরি করিয়া উহা হজম করা।
